তাল গাছ ও পুকুর

আপডেট: অক্টোবর ৬, ২০১৮, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

রুহুল আমিন রাকিব


এক গাঁয়ে অনেক বড় একটা পুকুর ছিলো। পুকুরের চার পাশ জুড়ে অনেকগুলো তাল গাছ ছিলো। তাল গাছগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। দূর থেকে সারি সারি তাল গাছ গুলোকে দেখলে ভীষণ ভালো লাগে সবার কাছে। তাল গাছের নিচে সব সময় মানুষের আড্ডা লেগে থাকে। নানা-রকম গল্প করে, পাড়ার ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে। তাল গাছের গায়ে গর্ত করে বাসা বেঁধে অনেক দিন ধরে বস-বাস করে মাথায় ঝুঁটি ওলা কাট-ঠোকরা পাখি। বেশ কয়েক জোড়া পাখি এই গাছগুলোয় বস-বাস করে। এখন আর প্রতি গাঁয়ে-গাঁয়ে এই ঝুঁটিওলা পাখিকে দেখা যায় না বললেই চলে। দিনে-দিনে হারিয়ে যাচ্ছে এই পাখি। তবে এই গাঁয়ের তাল গাছের আশে-পাশে চোখ মেলে তাকালে-ই দেখা পাওয়া যায় এই কাট-মিস্ত্রি পাখিটার।
তাল গাছের শাঁখে সুনিপুণভাবে বাসা তৈরি করে বস-বাস করে, মিষ্টি পাখি বাবুই, আহা! পূবের বাতাসে যখন বাবুই পাখির বাসা গুলো দোলে, দেখে কী যে ভালো লাগে! বেশ কয়েক জোড়া বাবুই পাখি এই তাল গাছের শাখা গুলো দখল করে আছে। সকাল হলে রবির আলো ফুটার আগেই, বাবুই পাখির ঝাঁক কিচির-মিচির শব্দ করে উড়ে চলে আহার খুঁজতে। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে পড়ে গাঁয়ের সবুজ ফসলের ক্ষেতে। এক এক করে খেয়ে ফেলে, ফসলের ক্ষতিকর কীটগুলোকে। হঠাৎ যখন সবুজ ফসলে হিমেল হাওয়া দোল খায়, বাবুই পাখির ঝাঁক ফুড়ুৎ করে উড়ে যায় সে এক অপরূপ দৃশ্য! পুকুর পাড়ে রোজ বিকেলে দেখা মিলে সাদা পালকের বক দাদুর। এক পায়ের উপর ভর দিয়ে এমন গুটিশুটি মেরে বসে থাকে যেন কিছুই বুঝে না বুড়া দাদু! তবে শিকার সামনে এলে তার আর কোন নিস্তার নেই। পুকুর জলের উপর হেলে পড়া বাঁশের শাখে বসে শিকারের অঙ্ক কষে চতুর পাখি মাছরাঙা। জলের উপর সাঁতার কাটে নানা রঙের হাঁস। দল বেঁধে ঝাঁকে-ঝাঁকে, পানির একটু নিচ দিয়ে ঘুরে বেড়ায় মাছের দল। পাড়ার দুষ্ট ছেলেরা হই হুল্লোড়ে মেতে ডুব সাঁতার খেলে, চোখ লাল করে বাড়ি ফিরে যায়। শরতের রাতে দুধে রাঙা চাঁদের আলো এসে যখন পুকুর জলে ঢেউ খেলে, আর তালের পাতায় হাওয়া এসে শন-শন শব্দ করে তখন অন্য রকম একটা ভালো লাগা ছুঁয়ে যায় সবার প্রাণে! পাকা তালের মৌ-মৌ করা ঘ্রাণ মন কেরে নেয় সবার। এই পুকুর আর আকাশ ছোয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি তাল গাছগুলো যেন এই গাঁয়ের সবার মধ্যমণি। তবে সুখের সময়গুলো না কি খুবই অল্প সময়ের জন্য আসে! হঠাৎ একদিন এই পুকুর ও জমির মালিক সবার কাছে বলল, এই পুকুর ভরাট করে এই জায়গায় বাড়ি তৈরি করবে। এই কথা শুনে গাঁয়ের সবার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। গ্রামের বয়স্ক দাদুরা পুকুর মালিককে মানা করল এই পুকুর ভরাট করতে। পুকুর ভরাট করে তাল গাছগুলো কেটে এই জায়গায় বাড়ি তৈরি করলে,অনেক রকম প্রাকৃতিক দূর্যোগের মুখে পড়বে এই গ্রাম। পাখ-পাখালিও চলে যাবে গ্রাম ছেড়ে। হুমকির মুখে পড়বে সবুজ ফসল। গ্রাম হারিয়ে ফেলবে তার সৌজন্য! তবে কে শোনে কার কথা! মালিক তার নিজের কথা মতো চলল। একদিন সকাল বেলা অনেক মানুষ ডাকা হলো,একে একে করাত দিয়ে সমস্ত তাল গাছগুলো কেটে ফেলা হলো। তাল গাছের আশে-পাশে কিছুক্ষণ উড়া-উড়ি করে মনে দুঃখ নিয়ে, দূর থেকে আরও দূরে উড়ে গেল এই গাঁয়ের সকল পাখিগুলো। সেদিনের পর থেকে এই গাঁয়ের কোথাও দেখা যায়নি ঝুঁটিওলা কাট-ঠোকরা,আর বাবুই পাখির ঝাঁক। কারও গোধূলি বেলা কাটেনি সাদা বকের দল দেখে। কয়েক দিনের মাঝে পুকুরও ভরাট করা হলো,মাটি ফেলে তৈরি করা হলো নতুন বাড়ি। এরপর বেশ ভালো চলছিলো কয়েক দিন। হঠাৎ সেদিন রাতে কালো মেঘে ছেয়ে গেল পশ্চিমের আকাশ। একটু পরপর হড়-হড় শব্দ করে আকাশ জানিয়ে দিচ্ছে তার ভয়ঙ্কর রূপের কথা। গাঁয়ের মানুষ ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে গেল। যে যার মতো করে শুয়ে পড়ল আল্লাহর নাম মুখে নিয়ে। দেখতে-দেখতে শুরু হয়ে গেল প্রচ- রকম শিলা বৃষ্টি। ঝড়ো হাওয়ার সাথে,একটু পর-পর বিদ্যুৎ চমকিয়ে গাঁয়ের প্রতিটা ঘর কাঁপিয়ে বজ্র পড়তেছে। সেদিন রাতের ঝড়ের কবলে পড়ে অনেক গবাদি পশু ও পাখি মারা গিয়েছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে সবুজ ফসলের। ঘরের চাল উড়িয়ে নিয়ে গেছে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ওই পুকুর মালিকের সুপারি বাগানের। পর-পর কয়েকটা বজ্র এসে ওই সুপারি বাগানে পড়ার কারণে কিছুদিন পর সমস্ত গাছ মরে গেছে। শুধু কি সুপারি বাগান? পানের বরজও বাদ রাখে নাই, সেদিনের সেই ঝড়ো হাওয়া আর বজ্র পাতের কবলে পড়ে ল- ভ- হয়ে গেছে, কয়েক লাখ টাকার পানের বাগান। সেদিন সেই ঝড়ো হাওয়ার পর,ভুল ভেঙে যায় পুকুর মালিকের। তালের গাছ কেটে পুকুর ভরাট করে সে যে ভুল করছে, সেই ভুলের মাশুল দিতে হলো তাকে, অনেক টাকার সম্পদ হারিয়ে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে বাঁচতে, পশু-পাখি ও সবুজ ফসল রক্ষা করতে,তাই আমাদের সবার উচিত বেশি করে গাছ লাগানো। এবং বড় বড় গাছগুলোকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। পুকুর ভরাট করে বাড়ি তৈরি না করাটা,আমাদের সবার উত্তম কাজ হবে। এসো সবাই মিলে রক্ষা করি এই সবুজ পরিবেশ। বেশি করে গাছ লাগাই, বাঁচতে দেই পশু পাখি। আর ওরা সবাই সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বাঁচলে,তবে-ই বাঁচব আমরা সবাই।