ত্রিপুরার আগুনের আঁচ লাগতে পারে বাংলাদেশেও

আপডেট: মার্চ ১০, ২০১৮, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত


বামফ্রন্ট হেরে যাওয়ার পর গোটা ত্রিপুরা সন্ত্রাসের আগুনে ধিকিধিকি জ্বলতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে উপজাতি অধ্যুষিত জেলাগুলিতে গরিব মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছে। বিচ্ছিন্ন জাতি সংঘর্ষ বলে ঘটনাগুলি চালানোর চেষ্টা করা হলেও আসলে কিন্তু বামকর্মীদের একেবারে ধনে-প্রাণে শেষ করে দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে শাসক বিজেপি-আইপিএফটি জোট।
বিলোনিয়া শহরে বিজেপি কর্মীরা একটি বিশাল বুলডোজার এনে লেনিনের মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেছে। এই কীর্তি চলার সময় চারদিক থেকে স্লোগান দেয়া হয় ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘জয় শ্রীরাম’। শুধু যে ভাঙাভাঙি, আগুন লাগানোতে বিষয়টি শেষ হয়েছে তা নয়, এই সংবাদ ছবিসহ দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তুলেও ধরা হচ্ছে। আসলে বিজেপি বোঝাতে চাইছে নয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় যেমন গোটা বিশ্বজুড়ে ছবি ছড়িয়ে পড়েছিলো, এটাও সেই ধরনেরই একটা আন্তর্জাতিক মানের কমিউনিস্ট উৎখাতের ঘটনা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বলেছেন, যাঁরা জিতেছেন তাঁদের উচিত উন্মুক্ত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা।
বিলোনিয়া পার্টি দপ্তরে হামলা চালায় বিজেপি কর্মীরা। সেখানে মানুষজন বাধা দিলে উন্মত্ত জনতা চলে আসে বিলোনিয়া কলেজের সামনে লেনিন মূর্তির কাছে। বুলডোজার দিয়ে মূর্তিটি উপড়ে ফেলা হয়। এদিনই আগরতলায় বনমালিপুরে বিজেপি কর্মীরা শহিদ ক্ষীরগোপাল দে’র মূর্তি ভেঙে দেয়।
১৯৭২ সালে তিনি কংগ্রেসের হাতে শহিদ হয়েছিলেন। সিপিআই (এম) রাজ্য সম্পাদক বিজন ধর বলেছেন, গোটা রাজ্যে বিজেপি, আইপিএফটি জোট সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। দুইদিনে মোট ৫১৪ জন সিপিআই (এম) কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। বাড়ি লুটপাট হয়েছে এক হাজার ৫৩৯টি। ১৯৬টি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে ২০৮টি পার্টি অফিস দখল করা হয়েছে। ২২টি কলেজের ছাত্র সংসদ জোর করে দখল করা হয়েছে। সিপিআই (এম) নেতা খগেন দাশের বাড়িতে আক্রমণ চালানো হয়েছে। জোর করে দলত্যাগ করানোর মতো ঘটনা আকছার ঘটছে। কোথাও বা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আক্রমণ হয়েছে বিশালগড়ে। এখানে সিপিআই (এম) ও সহযোগী গণসংগঠনগুলি সমস্ত দপ্তর দখল করে নেয়া হয়েছে। বক্সনগরে হামলার জেরে তাহের মিয়া নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার থেকে তার আগে বহু পরীক্ষার্থীর বই খাতা জ্বালিয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতিকারীর দল। বিজেপি একটি ঘটনারও দায় স্বীকার করেনি। উল্টো বিজেপি আইপিএফটি কর্মীরা বিভিন্ন শিল্প তালুকে গিয়ে শিল্পপতিদের কাছ থেকে টাকা চাইতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে নতুন সরকার শপথ নেয়ার আগেই ত্রিপুরার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাতে শুরু করেছেন।
ত্রিপুরায় নতুন সরকার শপথ নেয়ার আগেই জোট শরিকের সঙ্গে বিরোধ বেঁধে গেলো। বিজেপির নির্বাচনী সঙ্গী ইন্ডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট বা আইপিএফটি নেতা এন সি দেববর্মা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁদের দুটি দাবি রয়েছে।
প্রথম দাবি, বিজেপি নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁরা ত্রিপুরা ভাগ করে ক্রুপল্যান্ড তৈরি করার ক্ষেত্রে মদত দেবেন। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষজনের জন্য স্বাধীন রাজা চাই। দ্বিতীয়ত, উপজাতি অধ্যুষিত ত্রিপুরায় আপাতত একজন উপজাতিকে মুখ্যমন্ত্রী করতে হবে। বিরোধীদের দাবি পাকেপ্রকারে মুখ্যমন্ত্রী হতে চাইছেন এনসি দেববর্মা স্বয়ং। তাই তাঁরা বিজেপির ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। তবে চাপ দিযে বাড়তি কেনো লাভ হবে না বলে বিজেপি নেতৃত্ব মনে করেন । বিজেপি রাজ্যে এমনিতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাজেই রাজনৈতিকভাবে তাঁদের মোকাবিলা করাটা এতো সহজ হবে না।
ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনী প্রচার পর্বে কিন্তু বিজেপি আগাগোড়া বলে গিয়েছে তারা রাজ্যভাগের বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ থেকে শুরু করে দলীয় নেতৃত্ব প্রচারে কখনো উপজাতিদের এই দাবিকে মান্যতা দেননি। তাহলে এই দাবি এখন তোলা হচ্ছে কেন? নরেন্দ্র দেববর্মা সরাসরি বলেছেন, নির্বাচনী প্রচার পর্বের সময় বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা ছিলো তাই সব কথা বলা যায়নি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে কথা হয়েই রয়েছে।
তাদের বক্তব্য, ২০০৯ সাল থেকে স্বশাসিত জেলা পরিষদ গড়ঠন করা হলেও তাতে জনজাতির আর্থিক ও অন্যান্য চাহিদা মেটেনি। তাই ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত এলাকাকেই এবার আলাদা রাজ্যে উন্নীত করতে হবে। অন্যদিকে ত্রিপুরায় ভারপ্রাপ্ত বিজেপি নেতা সুনীল দেওধর এ দিনই বলেন, “উনি আলাদা রাজ্যের দাবি করেন করবেন। কিন্ত আমাদের যে পরিকল্পনা আছে, যে ইচ্ছা আছে তা হলো ‘সব কা সাথ সবকা বিকাশ’। তবে আমরা এই দাবির সঙ্গে সহমত নই।”
তবে তিনি বলেন, “কেন আলাদা রাজ্যের দাবি হচ্ছে তা আমি খতিয়ে দেখব।”
এনসি দেববর্মা কিন্তু স্পষ্টই বলেছেন, তিনি কোনো অজুহাত শুনবেন না। তাঁর বক্তব্য, হঠাৎ করে একদিনে এই দাবি তোলা হচ্ছে তাতো নয়। ২০০৯ সাল থেকে ধারাবহিকভাবে এই দাবি তোলা হচ্ছে।
সিপিআই (এম) স্পষ্ট জানিয়েছে, তাঁরা ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিলেন। তাঁরা জানতেন রাজ্যভাগের দাবিতেই আইপিটিএফকে সঙ্গে জুটিয়েছে বিজেপি। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী দাবি পুরণ করতে গিয়ে তারা রাজ্যে বিভাজনের রাজনীতি শুরু করে দেবে। এতে পরিস্থিতি ক্রমশ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠবে।
ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনী প্রচার পর্বে কিন্তু বিজেপি আগাগোড়া বলে গিয়েছে তারা রাজ্য ভাগের বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ থেকে শুরু করে দলীয় নেতৃত্ব প্রচারে কখনো উপজাতিদের এই দাবিকে মান্যতা দেননি। তাহলে এই দাবি এখন তোলা হচ্ছে কেন?
নরেন্দ্র দেববর্মা সরাসরি বলেছেন, নির্বাচনী প্রচার পর্বের সময় বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা ছিলো তাই সব কথা বলা যায়নি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে কথা হয়েই রয়েছে। তাদের বক্তব্য, ২০০৯ সাল থেকে স্বশাসিত জেলা পরিষদ গঠন করা হলেও তাতে জনজতির আর্থিক ও অন্যান্য চাহিদা মেটেনি। তাই ষষ্ঠ তফশিলভুক্ত এলাকাকেই এবার আলাদা রাজ্যে উন্নীত করতে হবে।
অন্যদিকে ত্রিপুরায় ভারপ্রাপ্ত বিজেপি নেতা সুনীল দেওধর এ দিনই বলেন, “উনি আলাদা রাজ্যের দাবি করেন করবেন। কিন্তু আমাদের যে পরিকল্পনা আছে, যে ইচ্ছা আছে তা হলো ‘সব কা সাথ সকবা বিকাশ’। তবে আমরা এই দাবির সঙ্গে সহমত নই।“ তবে তিনি বলেন, ‘কেন আলাদা রাজ্যের দাবি হচ্ছে তা আমি খতিয়ে দেখব।’ এনসি দেববর্মা কিন্তু স্পষ্টই বলছেন, তিনি কোনো অজুহাত শুনবেন না। তাঁর বক্তব্য হঠাৎ করে একদিনে এই দাবি তোলা হচ্ছে তাতো নয়। ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এই দাবি তোলা হচ্ছে।
শুক্রবার গেরুয়া মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের কথা রয়েছে। তার আগেই লেনিনের মূর্তি গুড়িয়ে দেয়া এবং সিপিআই (এম) সাতশ’ নেতাকর্মীর বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় ভারতজুড়েই নিন্দার ঝড় উঠেছে।
বাংলাদেশের লাগোয়া এই রাজ্যের আগুনের আঁচ বাংলাদেশেও পৌঁছাতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। দেখা যাক কী হয়!
লেখক: আনন্দবাজার পত্রিকার সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি; কলামিস্ট
(বিডিনিউজটুয়েন্টিফরডট কম এর সৌজন্যে – প্রকাশ ৭ মার্চ ২০১৮)