দই খেতে গিয়ে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৭, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

মীম জুবায়ের


মায়ের অজান্তেই রান্নাঘরে ঢুকে তুহিন এই কাণ্ড করল। তখন তার বয়স প্রায় ছয় বছর হবে। তাদের একটি গাভী ছিল। সেই গাভী থেকে প্রতিদিন দুধ দোহন করে, দই বানিয়ে তুহিনের মা সখিনা বিবি তুহিনকে খাওয়াতেন। ছোটবেলা থেকে দই ও দুধ খেয়ে তুহিন বড় হয়েছে। তাই তো দই খেতে ছেলেটা অনেক পছন্দ করে। সেদিন সকালে সখিনা বিবি তাকে যতটুকু দই খেতে দিয়েছেন, ততটুকু খেয়ে তার তৃপ্তি মেটে নি। মায়ের হাতের দেয়া দইটুকু খেয়ে অপেক্ষা করছিল। মা রান্নাঘর থেকে বের হলেই সে চুপিচুপি চোরের বেশে রান্নাঘরে ঢুকে ইচ্ছেমতো দই খাবে। অথচ বেশ সাহসী, বুদ্ধিমান চালাক চতুর ছেলে ও নয়। মা জানতে পারলে উত্তম মধ্যম খেতে হবে তাও বেশ ভালো করে জানা ছিল। কিন্তু দই খাওয়ার লালসায় তুহিন এসব চিন্তা করে নি। এদিকে পুবের ঘরের বারান্দায় বসে তার চাচিরা গল্প করছেন। আর সেখানে যাওয়ার জন্য তারা সখিনা বিবিকে ডাকছেন। তুহিন মনে মনে খুশি এখন বুঝি দই খাওয়ার সাধ মিটবে। রান্নাঘরের কাজ সেরে বারান্দায় চলে গেলেন সখিনা বিবি, তখনই তুহিন তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে শুরু করল। পেছনের দরজা দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ করে দইয়ের পাতিল হাতে নিয়েছিল মাত্র। কিন্তু বেচারার দুর্ভাগ্য, খাওয়ার সুযোগ পায় নি। কারণ রান্নাঘরের কোণে বসে থাকা কালো বিড়ালটা মিয়াউ করে ডাক দিতেই চমকে ওঠে তুহিন। আর ঠিক তখনি তার হাত থেকে দইয়ের পাতিল মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল।
ছেলেটার হাত কপালে উঠে গেল। সর্বনাশ সব দই মাটিতে পড়ে গেল এখন কি হবে?
মায়ের ভয়ে ছেলেটা কাঁপতে থাকে। সবগুলো বাসন তার পায়ের ওপর পড়তে শুরু করল। বাসনপত্রের ট্যাং টুং শব্দ কানে তালা লাগার মতো। বাসনের নিচ থেকে পা বের করে আনার শক্তিও নেই। অতএব মাকে ডাকা ছাড়া উপায় নেই। মা, মাগো তাড়াতাড়ি এস। আমি শেষ। পা যে আমার ভেঙে যাচ্ছে। তখনই সখিনা বিবি বারান্দা থেকে এক দৌড়ে রান্নাঘরে এসে দেখেন ঘরের মেঝে দইয়ে একাকার। তুহিনের হাত মুখেও কিছুটা ছিটকে পড়েছে। রাগান্বিত মায়ের চেহারা দেখে ছেলেটা তরতর করে কাঁপছে। তার অবস্থা দেখে সখিনা বিবির বুঝতে বাকি নেই ছেলেটা দই খেতে এসে এই কাজ করেছে। তাই সখিনা বিবি রাগান্বিত কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন ‘বেয়াদব ছেলে তোর এত্ত বড় সাহস, আমি কাজ করতে করতে শেষ করতে পারছি না, আর তুই শুধু শুধু আমার জন্য কাজ বাড়িয়ে রাখিস। আজ তোরে এমন উত্তম মধ্যম দেব যাতে আর জীবনে এমন কাজ করতে না যাস। দাঁড়া আমি বেত নিয়ে আসছি।’ বেত আনার জন্য যখন সখিনা বিবির চোখটা ফিরিয়ে নিয়েছেন, ততক্ষণে তুহিন পেছনের দরজা দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে কই লুকিয়েছে কে জানে?
মা বেত নিয়ে এসে দেখেন ঘরে কেউ নেই কাকে পেটাবে? তখন কি আর করা। বেত হাত থেকে ফেলে বাসনপত্র সব কিছু গুছিয়ে রাখলেন। কিন্তু সারাদিন যায় সখিনা বিবি তুহিনের দেখা পায় নি। তাই চারদিকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। কোথাও তাকে পাওয়া যায় না। এদিকে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। অথচ ছেলেটা ঘরে ফিরছে না। সখিনা বিবি মনে মনে হতাশায় ভুগছেন। কেন আমি ছেলেটাকে এমন ভয় দেখাতে গেলাম। বাড়ির আশেপাশে পুকুর পাড়ে সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খোঁজার পরও কোথাও নেই। হঠাৎ খড়ের ঘরের দিকে চোখ পড়লে সখিনা বিবি চেয়ে দেখেন তার ছেলেটা খড়ের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে। দৌড়ে গিয়ে ছেলেটাকে কোলে নিয়ে ঘরে আসেন। অনেক আদর করে দুই গালে চুমু দিয়ে বলেন, তুই আমার কলিজার টুকরো ছেলে। মা একটু ভয় দেখিয়েছি বলে এমন কাজ করতে গেলে কেন। এই দিলাম এক পেয়ালা দই খেয়ে নে, আর কোনোদিন মায়ের অজান্তে রান্নাঘরে ঢুকবি না।