দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টি, ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা || দুর্ভোগে নগরবাসী

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৯, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


বসন্তের দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিতে নগরবাসি দুর্ভোগে পড়লেও বৃষ্টিতে ভিজে শিক্ষার্থীদের উল্লাস-সোনার দেশ

রাজশাহীতে গতকালের বৃষ্টিপাতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। বৃষ্টিপাতে বিশেষ করে আলু, গম ও আমের মুকুলের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তবে কৃষি বিভাগ বলছেন, আজকে (বুধবার) পর্যন্ত যে বৃষ্টিপাত হয়েছে তাতে ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না। তবে এই আবহাওয়া যদি বজায় থাকে তাহলে ফসলের কিছুটা ক্ষতি হবে। বিশেষ করে আলু ও আমের মুকুলের ক্ষতি হবে।
কৃষকরা বলছেন, বৃষ্টিতে তাদের আলু, গম, পিঁয়াজ ও আমের মুকুলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আলুর গোড়ায় পানি জমে গেছে। সেই পানি বের করে দেয়ার কোনো সুযোগ নাই। জমিতেই পানি জমে থাকায় আলুর ব্যাপক ক্ষতি হবে। আলু পচে যাবে। ঝড়ে গম ও পেঁয়াজ পড়ে মাটির সাথে লেগে গেছে। আবার বৃষ্টিপাত ও বাতাসের কারণে আমের মুকুল ও ফুল ঝরে গেছে।
তানোরের কৃষক লুৎফর রহমান জানান, তিনি ৬০ বিঘা জমিতে আলুর চাষ করেছেন। ৪০ বিঘা জমির আলুর গাছ কেটে নিয়েছেন যাতে রোববারে কাটাগাছের আলু তুলতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে আলুর পানি শুকিয়ে ঝরঝরে হয়ে যাবে এজন্য। এসব আলু থেকে তিনি বীজ তৈরি করবেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বৃষ্টিতে খেতে পানি জমে যাওয়ায় তার সব আলুই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। নষ্ট হয়ে গেলে তিনি ১০ লাখ টাকার মতো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
আড়ানীর আমচাষি বাদশা হোসেন বলেন, দু/এক দিনের মধ্যে রোদ না হলে আমের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তবে প্রস্তুত রয়েছি, রোদ হওয়ার সাথে সাথে স্প্রে করার জন্য। স্প্রে করতে পারলে তেমন ক্ষতি হবে না।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শামসুল হক জানান, এখন পর্যন্ত যে বৃষ্টিপাত হয়েছে তাতে ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না। তবে ভারী বৃষ্টিপাত হলে এবং রোদ বের না হয়ে আবহাওয়া যদি এইরকম বজায় থাকে তাহলে আলু ও আমের মুকুলের কিছু ক্ষতি হবে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল সারাদিনে প্রায় ১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে ভোর ৫টা ১০ মিনিট থেকে ৫টা ২০ মিনিট পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ রেকর্ড করা হয় শূন্য দশমিক দুই মিলিমিটার। দুপুর ২টা ২০ মিনিট থেকে ৩টা ২২ মিনিট পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ রেকর্ড করা হয় ১৬ মিলিমিটার এবং বিকেল ৫টা ১০ মিনিট থেকে ৫টা ২০ মিনিটও বৃষ্টিপাত হয়েছে। নগরীর আশেপাশের এই বৃষ্টিপাত হলেও জেলার বিভিন্ন থানায় আরো ব্যাপক বৃষ্টিপাত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যদিও আবহাওয়া অফিস শুধুমাত্র তার কেন্দ্রের আশেপাশের বৃষ্টিপাত রেকর্ড করতে পারে।
তবে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বসন্তকালে আবহাওয়ার এই ভিন্নতা সচরাচর দেখা যায় না। এইবার আবহাওয়ার ধরনই অন্যরকম। কয়েকদিন আগেও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। আজকেও এইরকম আবহাওয়া থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বাতাসের বেগও ছিলো অন্য সময়ের চেয়ে বেশি। বুধবার বাতাসের বেগ ছিলো ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। ফলে বসন্তকালেও শীতের পোশাক পরে মানুষদের ঘুরতে দেখা গেছে। দিনেও বেশ শীত ছিলো।
বুধবার সকাল থেকেই আকাশ ছিলো মেঘাচ্ছন্ন। সূর্যের দেখা একবারের জন্যও মেলেনি। দুপুরে বৃষ্টিপাতের সময় চারদিক কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ায় অনেককে গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে দেখা গেছে। বৃষ্টির পর নগরীর অনেকস্থানে পানিও জমে থাকতে দেখা গেছে। তবে সকাল থেকেই আবহাওয়ার এই গুমোটভাবে স্বস্তিতে ছিলো না নগরবাসী। তারপর দুপুরে টানা এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে বেশ দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে তাদের। অনেককে বাধ্য হয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়িতে ফিরতে হয়েছে।
দুপুরের বৃষ্টিপাতের সময় এই প্রতিবেদক ছিলো নগরীর তেরোখাদিয়ায় সেনানিবাস ক্যান্টমেন্টের সামনে চায়ের স্টলে। সেখানে বৃষ্টির কারণে অনেককেই আটকা পড়তে হয়। দীর্ঘসময় বৃষ্টিতেও ভিজতে হয় তাদের। সায়েম শান্তনু নামের এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক সাহেববাজারে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছেন। বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় তিনি চায়ের স্টলের ছাউনিতে দাঁড়ান। কিন্তু জোরে বৃষ্টিপাতে তিনি ভিজে যান। পরে বাধ্য হয়ে বাসায় ফিরে যান তিনি।
বিকেলে আলুপট্টি মোড়ের দোকানে এক বয়স্ক নারী আবার বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় স্বগোতক্তি করেন, এই সময় তো এইরকম আবহাওয়া আমার জীবনে দেখিনি। এটা কী রকম আবহাওয়া শুরু হলো। মনে হচ্ছে বর্ষাকাল চলছে।
বাঘা প্রতিনিধি জানান, বাঘায় বৃষ্টিতে আম, লিচু আলু, গম, সরিষাসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হওয়ায় নিচু জমিতে পানি জমে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলার নিচু এলাকার আম, লিচু, আলু, গম, সরিষাসহ শীতকালীন ফসলের জমিতে পানি জমে গেছে। পানি না সরাতে পারলে এসব জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
বাঘার পদ্মার চকরাজাপুর চরের আলু চাষী শেখ আবুল হোসেন বলেন, মুলার লোকসান পুষিয়ে নিতে এক লাখ টাকা খরচ করে ছয় বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছি। বৃষ্টিপাতের কারণে আলুর জমিতে পানি জমে গেছে। এ পানি দু/এক দিনের মধ্যে জমি থেকে নেমে না গেলে আলুর ব্যাপক ক্ষতি হবে।
আড়ানী পৌর এলাকার উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা দিলিপ কুমার সরকার বলেন, বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার পর থেকে উপজেলা কৃষি অফিসের নির্দেশমতে সকাল থেকে কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাষিদের কথা শুনে পরামর্শ দিচ্ছি। তবে এ পরামর্শ মতে কৃষকরা কাজ করলে উপকৃত হবে।
বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লা সুলতান বলেন, দুই/এক দিনের মধ্যে রোদ হলে ফসলের উপকার হবে। তবে গতকাল সোমবার থেকে প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ব্লকে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেয়ার জন্য কৃষকদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
বাগমারা প্রতিনিধি জানান, বাগমারায় গতকাল বুধবার দুপুরের দিকে বয়ে যাওয়া ঝড় ও বৃষ্টিতে ফসল ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চলতি মৌসুমে লাগানো ধানের কিছুটা উপকার হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আলু ও পেঁয়াজ চাষিদের। অনেক কৃষক খেত থেকে আলু উঠানোর প্রস্তুতিকালেই এমন বৃষ্টিতে আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এখনো নির্ধারণ করতে পারে নি উপজেলা কৃষি অফিস।
মাড়িয়া ইউনিয়নের বলিদাপাড়া গ্রামের আব্দুর রশিদ জানান, তিনি এবার তিন বিঘা জমিতে আলুর আবাদ এবং তিন বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছেন। খেত থেকে আলু উঠানোর জন্য শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে রেখেছেন। দু’এক দিনের মধ্যেই আলু উঠিয়ে বাজারজাত করবেন। কিন্ত গতকালের বৃষ্টির কারণে তার খেতের সব আলু কাদা পানিতে তলিয়ে গেছে। অপরদিকে ঝড়ের কারণে খেতের পেঁয়াজ মাটির সঙ্গে হেলে গেছে। এতে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এছাড়া বৃষ্টিপাতের কারণে একই গ্রামের আবু তালেবের তিন বিঘা জমির আলু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। বালিয়া গ্রামের জেকের আলী জানান, খেত থেকে কোনো আলু তুলতে পারেননি। এখন খেতের আলু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি। ফসলের পাশাপাশি আমসহ বিভিন্ন ফল ও কাঠের গাছেরও ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় ভুট্টাসহ মুকুল ধরা আম গাছ ভেঙে পড়েছে। উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই বিভিন্ন ফসল ও গাছপালার কম বেশি ক্ষতি হয়েছে।
বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিবুর রহমান জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারন করা যায়নি। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। আগামিকাল বোঝা যাবে ক্ষতির পরিমাণটা। ঝড়ে কিছু গাছপালা ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে কৃষকরা ফসল রিকোভারি করতে পারবে নাকি নষ্ট হয়ে যাবে তা কালকের (বৃহস্পতিবার) আবহাওয়া দেখে বোঝা যাবে।
দুর্গাপুর প্রতিনিধি জানান, হঠাৎ বৃষ্টিতে দুর্গাপুরে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কাও করছেন কৃষকরা। গতকাল বুধবার দিনভর থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে ফসলের মাঠে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার কৃষকদের চাষ করা বিভিন্ন সবজি ফসল এবং আমের মুকুলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ উপজেলায় এবার প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে সবজির ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গতকাল বুধবার উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার দেবীপুর এলাকার আলু খেতে এবং পেঁয়াজের ফসলে পানি জমে আছে। কোনো কোনো আলু খেতে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে থাকায় কেউ কেউ ওই জমি থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন, অনেকে আবার পানির ভেতর দিয়ে আলু উত্তোলন করতে দেখা গেছে।
দেবীপুর গ্রামের আব্দুর রহিম বলেন, তীব্র ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, আমরার অবস্থা খারাপ হইয়া গেছে, আর আফনেরা রঙ্গে আছেন, সমায় পান না কাজের সময় এসে ভানতারার প্রশ্ন করে বসেন। এসব দিয়ে আর কি হবে? আমার ফসলের যা ক্ষতি তা তো হয়েছে।
এদিকে ওই গ্রামের কৃষক সাত্তার বলেন, হঠাৎ বৃষ্টিতে আমার পিঁয়াজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জমিতে পানি জমে আছে। যার ফলে পিঁয়াজ মাটির সাথে পড়ে গেছে। পিঁয়াজের গাছগুলো আর উঠবে না।
এ ব্যাপারে দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মসিউর রহমান বলেন, এ মৌসুমের বৃষ্টি আলুর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। বৃষ্টিতে ফল ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। তবে ফসলের জমি থেকে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরাতে পারলে কিছু ক্ষতির পরিমান কম হতে পারে এবং বৃষ্টি যদি স্থায়ী না হয় তাহলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ