দিনাজপুরে রাস্তার উন্নয়ন কাজে মাদ্রাসার মাঠ ব্যবহার: স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা

আপডেট: জুলাই ৫, ২০১৮, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

দিনাজপুর প্রতিনিধি


দিনাজপুরে মাদ্রাসার মাঠ দখল করে চলছে রাস্তার উন্নয়নের কাজ-সোনার দেশ

দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার ৫ নম্বর সুন্দরপুর ইউনিয়নের গড় মল্লিকপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার মাঠ দখল করে চলছে দশ মাইল-বীরগঞ্জ মহা সড়কের কাজ। মহা সড়ক কাপেটিং ব্যবহৃত বিটুমিন মেসানোর মেশিনের কালো ধোঁয়া, ধুলোবালি, মেশিনের শব্দ ও গরম বাতাসের কারণে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। যে কারণে বিঘিœত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। এসব কারণে মাদ্রাসার ৩ শ ৫০ জন শিক্ষার্থী চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। অন্যদিকে শব্দ দূষণের কারণে দরজা বন্ধ করে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি বলছেন উন্নয়নের জন্য ঠিকাদারকে মাদ্রাসার মাঠ ব্যবহার করতে দেয়া হয়েছে। অপরদিকে স্থানীয়রা বলছেন প্রধান শিক্ষকের রুমে ঠিকাদার এসি লাগিয়ে দিবেন এই শর্তে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা না করেই মাদ্রাসার মাঠ ব্যবহার করতে দেয়া হয়েছে। যেখানে বসে এসির ঠান্ডা খাবেন মাদ্রাসার সভাপতি ।
জানা যায়, দিনাজপুর সড়ক ও জনপদ অধিদফতরের অধিনে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কাহারোল উপজেলার দশ মাইল থেকে বীরগঞ্জ উপজেলার শেষ সীমানা পর্যন্ত মহাসড়কে কাপেটিংয়ের কাজ চলছে। কাজটি করছেন মেসার্স রেপআরসি নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যার মালিক কুড়িগ্রামের সাগর নামে একজন ঠিকাদার।
গত মে মাস থেকে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড় মল্লিকপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার মাঠে পাথর বালি বিটুমিনের ড্রাম, ক্রাসার মেশিন, বিটুমিন মেশানোর মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ফেলে কাজ শুরু করেছে। সড়কে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরুর পর এক মাস থেকে বিটুমিন মেশানোর কাজ শুরু হয়েছে। এর ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে ওই মাদ্রাসায় গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া যায়। এসময় ওই মাদ্রাসায় পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা শেষে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে প্রথমে শিক্ষার্থীরা বিরুপ মন্তব্য করে বলে, এর আগেও কয়েকজন সাংবাদিক গিয়ে ছবি তুলে ভিডিও করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু তারা সংবাদ পরিবেশন করেননি। পরে আমরা খবর প্রকাশ করব এই শর্তে শতাধীক শিক্ষার্থী জানান, ‘কালো ধোঁয়ার কারণে অনেক কষ্ট হয়। এ কারণে আমাদের দরজা বন্ধ করে ক্লাস করতে হয়। পাথর বালি আর মেশিনের কারণে আমরা মাঠে খেলতে পারি না। মাঠে পিটি হয়না। অনেকদিন জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বন্ধ। মাঠে ভারী যানবাহন চলাচল করায় ও মেশিন স্থাপন করায় মাঠটি কাঁদা পানিতে ভর্তি হয়ে গেছে। চলাচল কিংবা খেলাধুলার কোন পরিবেশ নেই। শিক্ষার্থীরা আরো জানায়, ‘ধোঁয়ার গন্ধে আমাদের অনেক কষ্ট হয়, মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা করে কোনও কোনও সময় মাথা ঘুরে। চোখে মুখে ও চুলে ধুলার স্তর জমে যায়। এজন্য মাঝে মাঝে স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যায়’।
এ ব্যাপারে আবদুুল জলিল নামে একজন এলাকাবাসী বলেন, আমার শুনেছি ঠিকাদার মাদ্রাসায় দুটি রুম করে দিবেন এবং সুপারের কক্ষে এসি লাগিয়ে দিবেন। তাই তারা মাঠ ব্যবহার করতে দিয়েছেন মাদ্রসা কর্তৃপক্ষ। তা ছাড়া মাদ্রাসার সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এখন মাদ্রাসায় বসে তার সব কাজ করে থাকেন। তাই এসি লাগালে তিনিও এসির ঠান্ডা বাতাসে আরাম আয়েশে কাজ করতে পারবেন ।
একই কথা বলেছেন সাবেক ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম ও এলাকার যুবক এসএম জিকুরুল। তারা বলেন, এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবগত করা হলেও তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদেরকে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার কে খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি। তবে ল্যাব টেকনেশিয়ান হোসাইনের পাওয়া গেলেও তিনি কোন কথা বলতে রাজি হননি। এমনকি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম জানাতেও অপারগত প্রকাশ করেন।
এ ব্যাপরে মাদ্রাসার সুপার আবদুুল মান্নানকে মাদ্রাসায় না পেয়ে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থ্য জানিয়ে বলেন, তিনি দিনাজপুর ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
পরে সহকারী প্রধান শিক্ষক মোফাজ্জল হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, ঠিকাদার ৫০ হাজার টাকা মাদ্রাসার উন্নয়নে প্রদান করতে চেয়েছেন তাই মাদ্রাসা কমিটি ঠিকাদারকে মাঠটি ব্যবহার করতে দিয়েছেন। শিশুদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঠিকাদারের লোকজন আমাদের কাছে কিছু দিনের জন্য মাঠটি চেয়ে ছিলেন। আমরাও উন্নয়নের স্বার্থে মাঠটি দিয়েছি তবে এতটা ক্ষতি হবে তা আগে বুঝতে পারিনি। তবে এ বিষয়ে আপনারা সভাপতি সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এ ব্যাপরে মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি সাবেক চেয়ারম্যান মো. নাসেরুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য মাঠটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছি।
এ ব্যাপরে নাম জানাতে অনিচ্ছুক মাদ্রাসার একাধীক শিক্ষক বলেন, উন্নয়ন কি হবে তা আমরা জানিনা। কিন্তু পরিবেশ এতটাই খারাপ হয়েছে যে, আমাদেরকে ক্লাসের দরজা জানালা বন্ধ করে অন্ধকারে ক্লাস ও পরীক্ষা নিতে হচ্ছে। শিশুরা পড়েছে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।
এ ব্যাপের জানতে চাইলে কাহারোল উপজেলা নির্বাহী অফিসার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মাদ্রাসা কমিটি সব কিছু করার পর আমাকে জানানো হয়েছে। তা ছাড়া এ বিষয়ে অনেক কিছু বলা সম্ভব নয়। আমি বিষয়টি দেখছি।
দিনাজপুর এম. আবদুুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মশিউর রহমান জানান, ‘বিটুমিনের কালো ধোঁয়ায় কার্বনডাইঅক্সাইড থাকায় এটা খুবই ক্ষতিকর। এছাড়া বয়লারের শব্দ শব্দদূষণের অন্যতম কারণ। এর ফলে শিশুদের মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট ও শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়াসহ নানা রোগ হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়া এটা তাদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।