দুর্গতিনাশে ঐক্যবদ্ধ হোন দেশবাসী

আপডেট: অক্টোবর ৮, ২০১৯, ১:১০ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


সত্যজিৎ রায়ের “হীরক রাজার দেশে” চলচ্চিত্রে অমর পালের কণ্ঠে একটি লোকসঙ্গীত সবাই উপভোগ করেছেন, অন্ততঃ যারা চলচ্চিত্রটি দেখেছেন তারা সবাই বুঝেছিলেন ওই গানে সত্য সঙ্গীতের সুরেও অকাট্যভাবে প্রকাশিত ও পরিবেশিত হয়। ‘কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, বলি ভাইরে, ও ভাই’…আজকে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত কতিপয় কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সেই রঙ্গ অব্যাহত রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেই সব রঙ্গালয় ভেঙে তার মালিকদের ধরে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এদের অধিকাংশই সরকারি দলে আশ্রয় নিলেও তারা কখনোই দেশের ও মানুষের কল্যাণের পক্ষে নয়। ছিলো দুর্বৃত্তদের নেতা-কর্মী। আওয়ামী নেতাদের বিপুল অঙ্কের অর্থ দিয়ে তার পদ-পদবি কিনে নিয়ে অবৈধ ব্যবসা এবং ভূমি দখল করে নিঃশঙ্ক চিত্তে সমাজ বিরোধী দুষ্কর্ম করে বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলেছে। এখান থেকেও সরকার দলীয় নেতারা বখরা নিচ্ছে। র‌্যাব-পুলিশের কাছে গ্রেফতারকৃতরা সে রকমই তথ্য পরিবেশন করেছে। অথচ তারা সভা-সেমিনারে নিজেদের বঙ্গবন্ধুর অনুসারী এবং ভক্ত হিসেবে পরিচয় দেয় সাড়ম¦রে। এরা যতোই সে রকম দাবি করুক না কেনো, প্রকৃত প্রস্তাবে এরাই দেশের উন্নয়ন, সরকারের ক্লিন ভাবমূর্তি ধ্বংসের মূল হোতা। দেশকে “হীরক রাজার দেশে” পরিণত করতে সদা তৎপর।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হয়ে মানুষ চোরও হতে পারে, সৎও হতে পারে- এমনটা গ্রহণযোগ্য নয়। হাফেজ-ইমাম-পুরোহিত-যাজক ধর্ষকও হয়, কিন্তু ঠেলায় পড়লে মুখে তারা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে পরিত্রাণ পেতে চায়। তবে দলে অনেকেই আছেন, যারা আওয়ামী লীগের সংকটকালে ত্রাতার ভূমিকা পালন করেছিলেন। সংখ্যায় কম হয়েও তারা সাহস নিয়ে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। আজকে তাদের অবদান দলে পুনর্বাসিত নেতাদের দাপটে কার্যালয়ে বসার ঠাঁইই পান না। তারা থাকেন দূরে, হাইব্রিড বসে নেতার পাশে। ক্যাসিনো পরিচালক হন দলের অর্থ ও সমর্থক জোগানদাতা। তাদের ওপর দল কি নির্ভরশীল? মনে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সে ভরসায় থাকেন না। কারণ ১৯৯৩ সালে যখন শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী বিচারের আয়োজন করা হয় সোহ্রোওয়ার্দী উদ্যানে, তখন আজকের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নানা শ্রেণি-পেশার হাজার হাজার মানুষ বিএনপি-জামাতের অনুগত পুলিশ-বিডিআর আর তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বাধা অতিক্রম করে বিচারস্থলে পৌঁছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তুলেছিলো। সেই সংকটকালে অর্থাৎ খালেদা-নিজামী-গোলাম আযমের দুঃশাসনামলে যদি লক্ষ জনতার সমাবেশ ঘটে, তাহলে বর্তমান সরকার উন্নয়নমূলক এতো কাজ করেও কেনো সেদিনের সেই জনসমর্থন পাবেন না? তখন তো ক্যাসিনো আর মাদক ব্যবসায়ীরা চারদলীয় জোটেরই নেতা-কর্মী ছিলো। তারা আজকে আওয়ামী লীগে আশ্রয় নিয়ে হবে জনসভার ও ভোটারের জোগানদাতা? ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে খালেদা-নিজামীর ভোটারবিহীন ভোট করে ক্ষমতায় থাকতে পারেন নি। মানুষ সত্য ও ন্যায়ের পথে। মানুষ শান্তি চায়, চায় নিরাপত্তা এবং সুস্থ জীবন। জনগণ কখনোই মাদক পাচারকারী ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ীকদের অসামাজিক ও পকেট লুটকারীর ডাকে সাড়া দিতে পারে না। মানুষ চায় চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা। বাজার মূল্যের শতগুণ বেশি দিয়ে বই-বালিশ-যন্ত্রপাতি ক্রেতার আধিপত্য ও প্রাধান্য কোনো দেশের মানুষই সমর্থন করে না। বরং তাদের শাস্তি দাবি করে। সে লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়। বাংলাদেশ সেটা যদি মহাথির মোহাম্মদের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারতো, পারতো যথাসময়ে আপন-পর না দেখে বিচারের মুখোমুখি করতে, তাহলে তারা দলে ও সরকারে দৌরাত্ম করার সুযোগ পেতো না। দলের কিছু নেতা ও মন্ত্রীর সহায়তায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে দলে অনুপ্রবেশকারীরা তারা সে সুযোগ পাচ্ছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, বিশ^বিদ্যালয়ের কত্তাদেরও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা অনস্বীকার্য। তাদের কর্মকাণ্ড, কথাবার্তা, ফোনালাপও অপরাধের সাক্ষ্য দেয়।
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপ-উপাচার্য একজনকে চাকরি দেয়ার জন্যে ফোনে টাকার কান্ট্রাক্ট করে। ইতোমধ্যে সামাজিক মিডিয়ায় তা ভাইরাল হয়ে গেছে। তারপরও উপাচার্য তার প্রতি অন্ধ সমর্থন পরিত্যাগ করেন নি। এটা প্রত্যাশিত নয়। এমনি করে ত্রিশ লাখ শহিদের দেশে দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। প্রশাসনে মেধাবী হিসেবে খ্যাতদের অধিষ্ঠিত করা হয়েছে, তারাই সব লুটেপুটে নেবে আর সংবাদ সম্মেলন করে লাগামহীন মিথ্যেচার করবে, সেটা উচ্চশিক্ষিত মানুষের কাছে প্রত্যাশিত নয়। নির্দিষ্ট সময়ে এ দেশের কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না। ফলে বৃদ্ধি পায় ব্যয়। তারপরও ৬৫ হাজার টাকায় বালিশ, পাঁচ হাজার টাকা মূল্যের বই আশি হাজার টাকা, পঞ্চাশ লক্ষ টাকার যন্ত্রপাতি পাঁচ কোটি টাকায় কেনা হয়। দুদক কি এই লুটপাটের তথ্য অবহিত? অবহিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কেনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেনো দেশবাসী জানে না। সম্প্রতি এক চিকিৎসকের প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায়, তাদের জন্যে যে সব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, সেগুলো বাজার মূল্য থেকে দশ গুণ বেশি দাম দিয়ে কেনা হয়েছে। তাও আবার ডুপ্লিকেট মাল। পরিচালক বলেছেন, এ নিয়ে কোনো কথা হবে না। এখানে থাকতে হলে বিলে স্বাক্ষর দিতে হবে। নতুবা বদলি। মিথ্যা বিলে স্বাক্ষর না দেয়ায় ওই চিকিৎসককে তিন দিনের মধ্যে বদলি করা হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তার অপরাধ চিহ্নিত হলে গণরোষ সৃষ্টি হয়। তখন তাকে হয় বদলি, নয় ওএসডি করা হয়। কেউ কেউ পদোন্নতিও পেয়ে যায়। কিন্তু তারা এখন সকলেই বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। তাঁর আদর্শের অনুগামী হিসেবে দাবিদার।
আসলে আদর্শের সঙ্গে নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক নেই বোধ হয়। শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গেও নয়। অনেক শিক্ষক বড় বিদ্বান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিও নিজ উঠোনে দক্ষ ও প্রভাবশালী, তারাও সর্বাংশে কি নীতিবান? আস্ফালন তো নানা আঙ্গিকে দেখা যায়। তার অন্যতম পরীক্ষায় অবিচার করা, গভীর রাতে ছাত্রিকে ফোন করে তার লোলুপ আবেদন পেশ, অধঃস্তন কর্মচারীদের ওপর জুলুম চালানো। বরেন্দ্র রিসার্স মিউজিয়ামের তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা (?) পরিচালকের বাড়িতে অফিসের ৪র্থ শ্রেণির এক নারী কর্মীকে বাড়ির কাজের মেয়ে হিসেবে কাজ করিয়ে নিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। অফিসের কাজ না করিয়ে বাড়ির কাজ করিয়ে নেয়া কি সমর্থন যোগ্য? মেয়েটি পরিচালকের বাড়িতে কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। সে তখন তার অ্যাসোসিয়েশনে গিয়ে অভিযোগ করলে পরিচালক নাকি ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন। বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিলো ওই পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষক, যিনি বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেসা হলের প্রাক্তন প্রাধ্যক্ষা, তিনিও বিভাগের ছাত্র-ছাত্রিদের ডেকে বাড়িতে কাজ করিয়ে নিতেন। শিক্ষকদের হাতে নম্বর। ভয়ে অনেকেই কাজ করতে বাধ্য হয়। ইংরেজি বিভাগের এক ছাত্রিকে ডেকে তার উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে অধ্যয়নরতা মেয়েকে পড়ানোর জন্যে নিয়োগ দেন। তিনি ঠিকমতো তার সম্মানীটাও দিতেন না বলে নির্যাতিতা মেয়েটি জানিয়েছেন। সেই মেয়েকে তার অবিবাহিত ভণ্ড সন্ন্যাসী ভাই যৌন নিপীড়ন করেছে বলে মতিহার থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। সব জেনেও মেয়েটির পক্ষে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বঙ্গমাতা হলেও প্রাধ্যক্ষকে কেবল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তাহলে শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক থাকলো কোথায়? এরাই দেশের গৌরব অর্জনের প্রতিবন্ধক। বস্তুতঃ শিক্ষা ও আদর্শ হচ্ছে সমাজবদ্ধ প্রাণীদের নিজেদের প্রয়োজনের কিছু লিপিবদ্ধ দলিল, তার বেশি নয়। ও-সব নিজেদেরই সুবিধার জন্যে সৃষ্টি করা কিছু বিধি, যাকে নৈতিকতা বলে আমরা মনে করি। শিক্ষা মানুষের ভেতরে অন্ধকারকে দূর করে। করে আলোকিত। দেশের দুর্বৃত্তায়নের চিত্র দেখে মনে হয়, আমাদের সে দায়বদ্ধতার বালাই নেই। নিজেদের স্বার্থে নীতি-আদর্শের বুলি কপচাই।
দেশভেদে এই নৈতিকতা খানিকটা কাল্পনিকও। সৌদি আরবে নারী-পুরুষ প্রকাশ্যে চুমু খেলে শাস্তির বিধান আছে। ইউরোপে চুমু কেনো, যৌন সংযোগ করলেও তাদের মা-বাবার কিছু বলার নেই, যদি ওই যুবক ও যুবতী নিজের সম্মতিক্রমে তা করে। এই যে নৈতিকতার স্তম্ভ স্বাতন্ত্র্য চিত্র সৃষ্টি করে, তখন বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে নৈতিকতা সমাজ ভেদে স্বতন্ত্র এবং অনেকটাই কাল্পনিক। সমাজে চোর-ধর্ষক-ঘুসখোর-দুর্নীতিবাজ নিজেদের সুবিধা মতো নৈতিকতার মাপকাঠির হিসেব মেলায়। এই প্রক্রিয়ায় অবশ্যই ধূর্ত-দুর্বৃত্তায়নের খতিয়ান নির্মাণ করে, এতে যারা স্বার্থমগ্ন তারা বেশি লাভবান হয়। কয়েকটা ক্যাসিনোর সন্ধান পেয়ে পুলিশ-র‌্যাব তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিয়েছে, কিন্তু অন্তরালে আরো কতো শত শত ক্যাসিনো বাণিজ্য নির্বিবাদে চলছে। নেটেও ক্যাসিনো চলছে। এরাই রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরোক্ষভাবে দখলে নেয় বলেই তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে তাদের অবৈধ ব্যবসা ও কার্যক্রম পরিচালনা করে। ঘুস খায়। দুর্নীতি করে। করে অনৈতিক কর্ম। যারা ঘুস নেয়, তারা তো উচ্চ শিক্ষিত। মেধাবী ছাত্র। বিসিএস পাস করে উচ্চপদে আসীন হয়। তারা কেনো দুর্বৃত্তায়ন-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত? উচ্চ শিক্ষিত হয়েও তারা যদি অপরাধপ্রবণ হয়, তাহলে নৈতিক শিক্ষা, ধর্মের নির্দেশ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তার বাইরে তারা দুর্জন। ইমাম-পুরোহিত যদি ধর্ষক হয়, পুড়িয়ে কিংবা গলা টিপে মারে নিষ্পাপ শিশু-কিশোরীকে এবং বলে ‘অরে জি¦নে নিয়া গ্যাছে’। তাহলে কার আশ্রয়ে আমাদের নারী ও শিশু-কিশোরী নিরাপদ? রাষ্ট্রের দায়িত্ব জীবন ও সম্পদ-সম্মানের নিশ্চয়তা দেয়া।
সারা দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলো আজ নানা অনিয়ম, দুর্বৃত্তায়ন, ঘুস-দুর্নীতিতে আক্রান্ত। দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণ বিরোধী এই দুষ্কর্ম সেখানে ছাত্র-কৃষক কেউ করছে না, করছে দেশের উচ্চশিক্ষিত কত্তারা। একজন উপ-উপাচার্য কী করে প্রার্থীর স্ত্রীর কাছে বলতে পারেন, শিক্ষকতা চাকরি দিলে তারা কতো টাকা দিতে পারে? শিক্ষকেরা তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ৩ অক্টোবর প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেছেন। তারপরও উপ-উপাচার্য বিরতিহীন মিথ্যেচার করছেনই। তিনি পারিবারিক সূত্রে মুক্তিযুদ্ধ পরিবার থেকে আগত। পদ-পদবি আর লুটপাটের জন্যে “জয় বাংলা” আর “বঙ্গবন্ধু” প্রেমিক সেজেছেন। কাকের ময়ূরপুচ্ছ পরিধানের মতো। তার সঙ্গে কিছু শিক্ষকও জুটেছেন, যাদের পারিবারিক পরিচয় উপ-উপচার্যের মতো, “কাকের ময়ূর পুচ্ছ ধারণে”র মতো। “হীরব রাজার দেশে”র মন্ত্রীদের মতো। রাজা যা-ই বলেন, মন্ত্রীরা সবকিছুতেই, তা যতো মানবতা বিরোধী হোক আর দেশ বিরোধী হোক, সায় দিয়ে যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজা বন্ধ করে দিচ্ছেন, মন্ত্রীরা তাতেই সানন্দে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছেন। বিশ^বিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও তা-ই। উপাচার্য নিয়ন্ত্রিত। তিনি ইচ্ছে করলে কারো পদোন্নতি-নিয়োগ দিনের পর দিন বন্ধ রাখতে পারেন, কাউকে আবার বিধি ভঙ্গ করে নিয়োগ দিতে পারেন। অ্যাডহক হলেও পারেন। যোগ্যদের নয়, যারা ঘুস দিতে সম্মত কেবল তাদের। বিভাগের প্রার্থী দুই লাখ টাকার চেক আইন জাকারিয়া সাহেবের ভাগ্নে, যিনি সহকারী প্রক্টর এবং ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক, তার মাধ্যমে হস্তান্তর করেছেন। সামাজিক প্রচার মাধ্যমে জাকারিয়ার সাহেবের ফোনালাপের মতো এই তথ্যও সচিত্র ভাইরাল হয়েছে। রশিদ নম্বর, ফোনে কথা বলার ডিউরেশন ইত্যাদি সব এসেছে। তারপরও লজ্জার মাথা খেয়ে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি মিথ্যেচার করে পদে অধিষ্ঠিত থাকেন, লজ্জা পান না। এমন বেহায়ার বিরুদ্ধেগণরোষ বাড়বে বৈ কমবে না। উপাচার্যেরও তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিলো। তারওপর কেনো উপাচার্যের কেনো সাফাই গাওয়া? অপরাধীর পক্ষালম্বন করা? তিনি কি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে অনিবার্য? তার মতো দক্ষ প্রশাসকের এবং বিদ্বানের কি দেশে আকাল পড়েছে? ২০১৭ সালে বর্তমান প্রক্টরও অপরাধ করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে তখনো কেনো উপাচার্য ব্যবস্থা নেননি, তা দেশবাসীর অজানা নয়। তার কথাবার্তা আর আচরণও গ্রহণযোগ্য নয়। এরা, এই অপরাধীরাই কি কেবল মাননীয় উপাচার্যের পছন্দনীয় ব্যক্তি? এ ভাবে দেশের আরো অনেক বিশ^বিদ্যালয়ে “হীরক রাজার দেশে”র রাজার মতো আচরণ করছেন। তাদের এ থেকে বিরত থাকলে দেশের উন্নতি দ্রুততর হবে। তারাও যদি ক্যাসিনো আর মাদক ব্যবসায়ীদের মতো অবিবেচক হন, দেশের মানুষ তাহলে কার কাছে আশ্রয় নিবে? কার ওপর আস্থা রাখবে? আমরা একটি দেশ চাই, যে দেশ হবে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ ভেঙে গড়ে ওঠা উন্নয়নের অনুকরণীয় মডেল। প্রবৃদ্ধির ৮.১ শতাংশ। বাংলাদেশ বর্তমান সরকারের আমলে চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করেছে। তবে বাংলাদেশ-ভারতের সম্মিলিত অনুষ্ঠানে উপাচার্য “জয়হিন্দ্” বলে বাংলাদেশের সম্মান ভূ-লুণ্ঠিত করেছেন বলে আমি মনে করি না। ভারতের প্রধানমন্ত্র নরেন্দ্র মোদী গত পাঁচ দিন আগে শেখ হাসিনার সামনে “জয় বাংলা” বলেছেন। তাতে ভারতের সম্মান লুণ্ঠিত হয়েছে বলে তারা মনে করেন নি। করলে ভারতে এ নিয়ে আন্দোলন গড়ে উঠতো, সংবাদপত্রে লেখালেখিও হতো। দুই দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনা করে মাননীয় উপাচার্য “জয়হিন্দ্” বলে বাংলাদেশকে ছোট করেন নি বলেই অনেকে মনে করেন।
‘বাংলাদেশ বুমিং অ্যান্ড হেয়ার ইজ হোয়াই’ শিরোনামের লেখায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সমৃদ্ধি ও মানুষের আকাক্সক্ষা সমান্তরালে গতিশীল।’ তাদের সহনশীলতা এবং নেতৃত্বের প্রতি অবিচল থাকার প্রতি তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। রাতারাতি সবকিছু মেলে না। আকাক্সক্ষাও পূরণ হয় না। পূরণ করতে হলে নিজেরও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে কাজের ও চিন্তার স্বচ্ছতা। সেখানে আমরা কতোটা সফল আত্মজিজ্ঞাসায় সে উত্তরটিও বেরিয়ে আসবে। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮৮ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ ডলারের বেশি। প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘কৃষিতে বাংলাদেশ এখন আর কেবল নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য উৎপাদন করছে না। স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে আমরা এখন বিশে^র চতুর্থ বৃহত্তম; দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাট উৎপানে; চাল ও সব্জি উৎপাদনে যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম এবং মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ। উৎপাদন বৃদ্ধি লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রধান শস্য ও ফলের জিন বিন্যাসও করছে সফলভাবে। এই সাফল্য তো কতিপয় দুর্বৃত্ত-দুর্নীতিবাজ আর অসৎ-অবিবেচক শিক্ষিতের কুৎসিৎ করতলে সোপর্দ করা যায় না। এই সাফল্যের সঙ্গে দুর্বৃত্তদেরও সমূলে উৎপাটন করতে হবে সম্মিলিতভাবে।
আশা করি, আমরা যে যেখানে যে দায়িত্ব পালন করছি, সবাই স্বচ্ছতা এবং সততার বিষয়টিতে দেশের উন্নয়ন কর্মের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করতে হবে। দেশটাকে “হীরক রাজার দেশে” পরিণত করতে দেয়া যাবে না। তাতে আমাদেরই সমূহ ক্ষতি। একটি জনপদকে বিপন্ন করার অশনিসংকেত। তাই সকলে মিলে এই দেশের কল্যাণে-উন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া জরুরি। দেশটা আমাদের। ত্রিশ লক্ষ শহিদের আত্মদানে অর্জিত। এটা স্মরণ রেখেই নিরন্তর কাজ করতে হবে। সম্মিলিতভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে জয় আমাদের নিশ্চিত। আজকের দুর্গতি নাশ হবে। জ¦লবে নতুন আলোর শিখা। একাত্তরে এই সম্মিলিত চিন্তা ও কাজের মধ্যে দিয়েই বিজয় নিশ্চিত হয়েছিলো।