দুর্বৃত্ত দমনে আসুন একত্রিত হই

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯, ১:৪৫ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


মানুষের নির্ভরশীলতার জায়গাটা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে কি? দেশবাসী সে রকমই বলছে। কারণ ক্ষমতাধরদের ঘুস-দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নে মানুষ অতিষ্ঠ এবং সরকারের এতো সাফল্যের পরও আস্থাহীনতায় ভুগছে জনগণ। আমি বেশ কয়েকবার লিখেছি, বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে এ রকম ভীতি জাগানিয়া পরিবেশ সৃষ্টিতে দেশবিরোধী-সাম্প্রদায়িক চক্র সফল হয়েছিলো। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের কাজের অস্বচ্ছতা, জবাবহীনতা এবং পর্বততুল্য দুষ্কর্ম দেশবাসীকে নিরাশ করছে। প্রত্যাশিত মানুষকে বিব্রতও করেছে। যারা অতি সাধারণ, তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্তির প্রতি আস্থাহীনতা প্রকাশ করতে আর দ্বিধা করছে না। কারণ নেতারা এতোটাই ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছে, তাদের ধারে-কাছে সাধারণের যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রীকেও সুযোগ সন্ধানী ও স্বার্থান্বেষীরা ঘিরে রেখেছে। এই ঘেরোয়ারা মানুষকে গণ্যই করে না। তারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। সেই অহমিকায় ধরাকে সরা মনে করছে। তাদের সঙ্গে নিবিড় যোগ রয়েছে প্রজাতন্ত্রের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের। না হলে কী করে একজন রেজিস্ট্রার বা ট্রেড ইউনিয়নের কর্মচারী কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার সুযোগ পেলো! কী করে চিকিৎসা শাস্ত্রের ৫ হাজার টাকা মূল্যের গ্রন্থ ৮৫ হাজার টাকায় কেনে? অনেক কলামিস্ট-বুদ্ধিজীবী বলেছেন, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় ক্রয়ে এবং বিক্রয়ে। সংবাদপত্রে এই নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে। ভাবতে আমাদের কষ্ট হয়, এই দেশের মানুষের জীবন-সম্মান-সম্পদের বিনিময়ে একটা দেশ স্বাধীনতা পেলো, অথচ সেই দেশের মানুষ আজকে নানা প্রক্রিয়ায় নেতা-আমলাদের করুণা নিতে হয়। হতে হয় দুর্বৃত্তদের ওপর নির্ভরশীল। এর থেকে দুর্ভাবনা আর কী হতে পারে! নির্বাচনের সময় ব্যতীত তারা জনগণের মুখাপেক্ষি নন। এমনটা প্রত্যাশিত নয়। নেতা আর প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের কাজ সর্বজনীন উন্নয়ন। তাদের কাছে অবস্থান নেয়া। এ দেশে সেটা না হয়ে হয় উল্টোটা।
আজকে দেশময় কিশোর অপরাধীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাবা-মা কি সন্তানদের আয়ত্তে রাখতে পারছেন? অথচ বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষিত সময়ে এমন হওয়ার কথা ছিলো না। মোবাইলে সার্চ দিলেই যাবতীয় তথ্য পাওয়া যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীরা আর শিক্ষকদের উপদেশ শোনে না। যতো দিন কোচিং-প্রাইভেট কেন্দ্রে মা-বাবার সঙ্গে যাতায়াত করে, ততোদিন খানিকটা তাদের মান্য-গণ্য করে। তারপর একা চলাফেরা করার মতো নির্ভরশীলতা অর্জন করলেই তারা নিজেদের মতো কথা বলে, চলাফেরাও করে। পুলিশ দিয়ে কি এদের মূল্যবোধ অর্জন করানো সম্ভব? এই বোধ অর্জিত হয় পরিবারে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। মা-বাবা সন্তানকে কী করে গোল্ডেন ফাইভ পাবে সেটারই স্বপ্ন দেখান। সন্তান সেটা অর্জন করতে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর মানসিক পীড়ন নেমে আসে। ফলে সন্তান হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ এবং স্বপ্ন ভঙ্গের হতাশায় নিমগ্ন। অধিকাংশ মা-বাবা সন্তানকে সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় উৎসাহিত করেন না। দেশপ্রেম, প্রকৃতি এবং মানুষকে ভালোবাসার গুরুত্ব সেই সঙ্গে তার আচরণ প্রায় কেউ শেখান না। আর প্রতিষ্ঠানের গুরুমশাইয়েরা ব্যস্ত থাকেন কোচিং বাণিজ্যের আরো প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে। তাদের কাছে না পড়লে নম্বর কম পাবে শিক্ষার্থী। মেধাবী ও দরিদ্র ছাত্রটি হবে উপেক্ষিত। শিক্ষকেরা তাদের কোনো আচরণ, পরীক্ষায় ভালো লেখার অনুশীলন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করেন না। তাহলে সেই শিক্ষার্থী গোল্ডেনের শক্তিতে যখন উচ্চপদে আসীন হবে, তখন একটা বালিশ ৬৫ হাজার টাকায় কিনতে ভয় পাবে না। ভয় পাবে না অসুস্থ রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে আটকে রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরি বন্ধ রাখতে। অথচ দেশবাসীর চলাচলের সুবিধার জন্যেই ওই ফেরির ব্যবস্থা করেছিলেন সরকার। অপরাধী শাস্তি পেলো না। দেশ উন্নয়নের সোপান নির্মাণ পরিশুদ্ধভাবে এগোচ্ছে না এবংবিধ কারণে। দেশের নেতারাও রাজনীতি করেন ওই একই আঙ্গিকে। অধিকাংশই পড়ালেখা করেন না, নানা বিষয় নিয়ে করে কাল ক্ষেপণ এবং নতুন প্রকল্প তৈরির। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি তারা ভীষণ অনীহা প্রকাশ করেন। বরেন্দ্র রিসার্স মিউজিয়াম থেকে মহামূল্যবান প্রত্ননিদর্শন কেউ চুরি করলে কিংবা ঐতিহ্যবাহী কোনো ভবন ভেঙে নতুন করে আগের মডেলে নির্মাণেও আন্তরিক নন। এই যে বিরতিহীন হযবরল কারবার একটি জাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন অপরাজনীতি। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন। এ থেকে উদ্ধারের উপায় কি নেই? একটি দেশে নানা প্রান্তে কী করে তিন বছরের শিশু থেকে ষাট বছরের বৃদ্ধা নিগৃহীতা হতে পারে? তাদের অপরাধের দৃশ্যমান বিচার নেই। পুলিশ ক্রসফায়ারে অনেককে হত্যা করছে। একই নাটক সাজানো হচ্ছে সেই হত্যাকে বৈধতা দেয়ার জন্যে। তাতেও কি কমছে ঘুস-দুর্নীতি, মাদক পাচার আর ধর্ষণ-নিপীড়ন? কমছে না বলেই সংবাদপত্রে দৈনিক সে সব খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করবেন বলে ঘোষণা দিলেও তা অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে ইশকুল-কলেজের শিক্ষকেরা দিব্বি কোচিং করাচ্ছেন, প্রাইভেটও পড়াচ্ছেন। ওই শিক্ষকদের শাস্তির কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তাহলে কেনো এই আস্ফালন? আই ওয়াশ? অপরাধীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানোর ঘোষণাও সরকার দিয়েছেন। কিন্তু মাদকে দেশ ভরে যাচ্ছে। কে এই পাচারকারী, তাদের অধিকাংশই সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় দিব্বি দুষ্কর্ম চালাচ্ছে। বিশ^বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সৌন্দর্যের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সৌন্দর্য বর্ধনে লক্ষ্যে যে কাজ হচ্ছে, তা কত্তাদের বেতন বহির্ভুত অর্থ অর্জনের একটি কৌশল। একে উন্নয়ন না বলে বলা যায়, দুর্বৃত্তায়ন। একজন উপাচার্য দিনের পর দিন তার কর্মক্ষেত্রে থাকেন না, তার এই অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারের কোনো মাথা ব্যথা নেই। তিনি ছাড়া কি দেশে আর কোনো মানুষ নেই যে তাকে উপাচার্যের দায়িত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সুস্থ ধারায় পরিচালনা করা? তিনি কি অনিবার্য? এমনটি অসুস্থ রাজনীতি কিংবা সরকারের দৈন্যেরই বহির্প্রকাশ। যারা বালিশ আর বই-পর্দার ক্রেতা তাদের নেতারা বলছেন ছিঁচকে চোর। ছিঁচকে চোরকে আদালতও অতিমাত্রায় শাস্তি দেন না। এই ছিঁচকে চোরেরাই এক সময় ডাকাত হবে, হবে হলমার্কের মতো ব্যাংক ডাকাত, সেটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। সরকার ছিঁচকে চোরের শাস্তি নিশ্চিত করলে, তাদের আর ডাকাত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আসলে সব কি একা প্রধানমন্ত্রী করবেন? তাঁর মন্ত্রী-মেয়র-নেতা-উচ্চপদস্থদের তাহলে প্রয়োজন কি? প্রধানমন্ত্রী জনগণকে নিয়ে একাই সব করবেন। ওদের অর্থ-ক্ষমতা দিয়ে পুষে দেশের লাভ কি? কৃষক ধান-পাটের মূল্য পেলো না। সব মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা লুপেপুটে খেলো। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, ‘দুর্নীতির আগ্রাসনে বাড়ছে আয় বৈষম্য’। কেবল তা-ই নয়, সামাজিক বিচ্ছৃঙ্খলাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার নমুনা নির্বিচারে ধর্ষণ আর মাদক পাচার। উপরন্তু রোহিঙ্গাদের উৎপাত। শোনা যাচ্ছে, আসামে প্রাথমিক তালিকায় যে ১৯ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারাচ্ছে, তাদেরও নাকি পুশব্যাক করবে বাংলাদেশে। কথায় আছে, ‘গরীবের সুন্দরী স্ত্রী সবার ভাবী।’ বাংলাদেশ সবে উন্নয়নের সোপান বেয়ে সামনে এগোতে শুরু করেছে, অমনি প্রতিবেশী অনেকের সেটা চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে। তাদের মনোভাব এমন, বাংলাদেশ কেনো এগোবে, এগোবো আমরা। বাংলাদেশ হবে তাদের করুণাপ্রার্থী। নতজানু। তারা এক হাতে একমুঠো দেবে, নেবে শত মুঠ। এমন বৈষম্যের প্রেম-বন্ধুত্ব কি টেকে? দেশবাসীও তা চায় না। তারা বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু করুণা নয়। ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তর পর্যন্ত বাঙালি তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে। দেশবাসী দুর্নীতিমুক্ত একটি সরকার চায়। চায় জীবন-সম্পদের শান্তি-নিরাপত্তা আর সমৃদ্ধি। কর্মের নিশ্চয়তা।
আগামী বছর বাংলাদেশ সুবর্ণজয়ন্তি স্পর্শ করবে। তারপরও এই দেশ বিরোধী ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িকেরা প্রকাশ্যে এবং অন্তরালে প্রায় সকল সেক্টর দখলে রেখেছে। আওয়ামী লীগ প্রায় পনেরো বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ধারণ করে বলে দাবি করে। কেবল বিএনপি আর জাতীয় পার্টির পৃষ্ঠপোষকতায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের সন্তান-সন্তুতি দলে ও রাষ্ট্রে পুনর্বাসিত হয়। কেনো এবং কোথায় তাদের এই প্রতিষ্ঠা-পুনর্বাসনের সুবিধা মেলে। মেলে। মেলে যারা দিনের আলোয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে চিৎকার করে, তারাই রাতের অন্ধকারে ওই দেশ বিরোধী সাম্প্রদায়িকদের চেতনায় শান দেয়। দেয় আশ্রয়-পরামর্শ আর পৃষ্ঠপোষকতা। তাদের দলের নেতৃত্বের দিকে দৃষ্টি দিলে এ কথা প্রমাণিত হবে। চারিদিকে বালিশ-বই আর পর্দা ক্রেতার সরব উপস্থিতি। দম্ভ। এক হাসিনা আজকে বঙ্গবন্ধুর মতো উন্নত-স্বাবলম্বী দেশের স্বপ্ন দেখেও পদে পদে হোঁচট খাচ্ছেন। বিশ^বিদ্যালয়ে সৌন্দর্য বর্ধনের যে আয়োজন, সেটাও অপচয় এবং দুর্নীতি সমতুল্য। তাহলে দেশের মানুষ কোথায় কার কাছে আশ্রয় নিয়ে তাদের প্রত্যাশা পূরণের নিশ্চয়তা পাবে। এমন করে দেশ গড়া যায় না। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় “চোরের খনি” তৈরি করা যায়। মানবতাবাদী ও দেশপ্রেমিকদের নেতৃত্ব চায় দেশবাসী। চায় উন্নয়নের প্রতীক হতে। চায় স্বাবলম্বী এবং কর্মদক্ষ প্রজন্ম গড়তে। সে লক্ষ্যে শেখ হাসিনার পাশে দেশবাসীকে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানাই।