দেশে শিক্ষার এ কী হাল! শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ একটু ভাবুন

আপডেট: নভেম্বর ১৫, ২০১৯, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। পিতা-মাতার পরই শিক্ষকের স্থান। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। ইত্যকার নানা অভিধায় শিক্ষকগণ অভিষিক্ত। সমাজের মূল্যবোধই শিক্ষকদের সম্পর্কে এমন ধারণা তৈরি করেছে। এই ধারণা এমনি এমনি হয়নি। অভিজ্ঞতা ও অনুভব থেকে মানুষ বুঝতে শিখেছে- সমাজে শিক্ষকের কী ঘনিষ্ঠ প্রয়োজনীয়তা।
কিন্তু ইদানিং পরিস্থিতি বড্ড হেরফের হয়ে যাচ্ছে। হাজার বছরের লালিত-প্রতিপালিত মূল্যবোধে বড়ই ধাক্কা লেগেছে। শিক্ষকগণ এখন বড়ই প্রশ্নবিদ্ধ। তারা ভীষণভাবে বিতর্কিত হচ্ছে। না, তারা তাদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়ার আদায়ের আন্দোলনের জন্য নয়Ñ এই বিতর্ক হচ্ছে তাদের শিক্ষকসুলভ আচরণের তিব্র ঘাটতির কারণে। অর্থ, প্রতিপত্তি, পদ ও পদবির জন্য উদগ্র বাসনা ও তৎপরতায় মূল শিক্ষার আলো জ্বালানোর কাজটিই বিঘ্ন ঘটেছে। শিক্ষকদের এখন অনেক অভীধায় সিক্ত করা হচ্ছে। আর এসব অভীধা শিক্ষকতা পেশার জন্য বড়ই বেমানান। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক পর্যন্ত স্বার্থান্ধের মত আচরণ করছে। তাঁরা ঘুষ, দুর্নীতি, দলবাজি ও মস্তানির মত কর্মকাণ্ডেও অভিযুক্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি ১৩ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপউপাচার্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছেÑ এসব অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। এখনো কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উপচার্যদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত আছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের নিয়ে বিরক্ত। এসব কিছু দেখে আগামীতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারালে তা অসম্ভব কিছু নয়। শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তি কোন তলানিতে এসে ঠেকেছে- সেটা কি শিক্ষকগণ উপলব্ধি করছেন?
কেন এমন পরিস্থিতি? শিক্ষক অপর শিক্ষককেই সম্মান করে না। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা লাল, নীল, সাদা, হলুদÑ নানা রঙে বিভক্ত। এরা শিক্ষাকতার চেয়ে নোংরা রাজনীতি করতেই অধিক স্বচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও একই পরিস্থিতি। সেখানেও শিক্ষকরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অবস্থান নিয়ে আছে। তারাও শিক্ষা প্রদানের চেয়ে নিজেদের আখের গোছানোর কাজেই ব্যস্ত থাকেন। যারা প্রকৃত শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলো জ্বালাতে চানÑ তাঁরা ইচ্ছে থাকলেও দলবাজ শিক্ষকদের জন্য সেটা করতে পারেন না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক একে অপরের বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেছেন। এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জিডিতে উভয় শিক্ষকই একে-অপরের বিরুদ্ধে ভয় দেখানো ও ক্ষতি করার অভিযোগ তুলেছেন। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুই শিক্ষককের সামান্য ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে আইনের দারস্থ হওয়ার মধ্যে তাঁদের সম্মান কি বৃদ্ধি পেয়েছে? শিক্ষার্থীরাই বা তাদের কাছ থেকে কী শিখছে? শিক্ষকতা হওয়ার জন্য শুধুই কি কোয়ালিফিকেশন যথেষ্টÑ ব্যক্তি শিক্ষকতা পেশার জন্য কতটুকু যোগ্য সে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষক যদি কাউকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়, কিংবা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মে উস্কানি দেয়, সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়Ñ তা হলে শিক্ষা-উন্নয়ন যে গতি হারাবে তা বলাই বাহুল্য। পেশা যার সেই যদি পেশার প্রতি যত্নবান ও মর্যাদাবান না হোন, পেশাদারিত্বের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতেই থাকেন তা হলে সে দিন হয়ত বেশি দূরে নয়, যেদিন দুর্বৃত্ত ও শিক্ষকের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা সেই দিন দেখতে চাই না। বিষয়টি শিক্ষদেরই ভাবতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ