ধান কাটা শ্রমিকদের বাড়তি সরকারি প্রণোদনা দরকার

আপডেট: April 25, 2020, 12:09 am

জাহাঙ্গির শাহ্


এবার রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর জেলায় মোট তিন লক্ষ পাঁচ হাজার সাতশত পঁচাশি হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ মাত্রা উনিশ লক্ষ ছয়শত দুই মেট্রিক টন। গত বছরের চেয়ে ৬ হাজার ২২০ হেক্টর কম। গত দুই বছর বোরো ধান কাটার সময় আসলেই বিরূপ আবহাওয়ার খপ্পরে পড়েছে কৃষকরা। ফলে বিগত দুই বছরে ধান কাটা, মাড়াই-ই দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একদিকে বিরূপ আবহাওয়ায় অধিক খরচ, অপরদিকে ধানের যথাযথ মূল্য না পাওয়া সত্ত্বেও ধান চাষিরা এ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি এবং মনোবলও হারায়নি। বরং ক্ষতির কথা মেনে নিয়েও অনান্য বছরের ন্যায় তারা ধান চাষ করে মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে ব্যস্ত। বরেন্দ্র এ অঞ্চলে বোরো চাষ পুরোটাই সেচ নির্ভর ফসল। লেখকের গবেষণায় প্রাপ্ত গত বছর এ বছরের চেয়ে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি ছিল (১ মার্চÑ২০ এপ্রিল)। এ সময় গত বছর বৃষ্টি হয় ১৫ দিন কিন্তু একই সময় এ বছর বৃষ্টি হয় মাত্র ৮ দিন। যার পরিমাণ খুবই কম। সংবাদ মাধ্যমেও জানা যায়, এবারে মার্চে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬০ শতাংশ বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। ফলে বোরোতে এ বছর বেশি সেচ দিতে হয়েছে। তাই চাষিদের গুণতে হবে বিঘা প্রতি ২০০-৩০০/- টাকা বাড়তি বিদ্যুৎ খড়চ। রোগ-পোকা দমনে চাষিরা বেশি সতর্ক থাকতে গিয়েও রাসায়নিক বালাইনাশকে অন্য বছরের চেয়ে এবার খরচ কিছুটা বেশি হয়েছে। তবে এ বছর ধানের অবস্থা এখন পর্যন্ত ভালো।
বিছিন্নভাবে ধান কাটা শুরু হলেও আগামী ৮/১০ দিন পর ব্যাপকভাবে কাটা শুরু হবে। তাই এই মুহূর্তে ধান কাটার স্বপ্ন দেখছে চাষিরা। সংশ্লিষ্ট কৃষি দপ্তর এবং কৃষকরা এবারের বোরা ফসল সঠিকভাবে তোলার বিষয়ে বেশ চিন্তিত। এই তিন জেলায় ধান কাটতে অন্য জেলা থেকে বেশ কিছু শ্রমিক এসে ধান কাটে। কিন্তু দুশ্চিন্তা এই করোনাভাইরাসের কারণে বেশিরভাগ এলাকা বিচ্ছিন্ন থাকায় শ্রমিকরা এইসব এলাকায় ধান কাটতে আসতে পারবে কিনা? এ পরিস্থিতিতে কৃষক-কৃষি চিন্তাবিদ-শিক্ষাবিদ এবং কৃষিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ মনে করেন, শুধুমাত্র ধান কাটা-মাড়াই শ্রমিকদের মধ্যে সরকারি বাড়তি প্রণোদনা হিসেবে প্রতি কেজি ১০/- টাকায় চাল দেয়া যেতে পারে।
এতে করে ধান কাটার কাজে শ্রমিকরা উৎসাহিত হবে। খবরে প্রকাশিত সংবাদ মাধ্যমেও জানা যায় মাননীয় কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ধান কাটা শ্রমিকদের যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছে তা বাড়ানো উচিৎ।
রাজশাহী জেলার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক সামছুল হক মনে করেন, ধান কাটা শ্রমিকদের আলাদা করে সরকারি এরকম প্রণোদনা দিলে তারা লাভবান হবে এবং সুষ্ঠুভাবে ধান- চাষিরা ঘরে তুলতে পারবে। বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর সংবাদ পাঠক আব্দুর রোকন মাসুম বিষয়টা জেনে বলেছেন, ভালো আইডিয়া। নাটোর সিংড়া এলাকার অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ও কৃষক মীর্জা মোস্তফা কামাল মনে করেন, এতে করে ধান চাষী এবং শ্রমিক উভয়ই লাভবান হবে। প্রকাশিত সংবাদপত্র থেকে জানা যায়, দেশের উল্লেখযোগ্য কৃষি অর্থনীতিবিদ, ইমেরিটাস অধ্যাপকসহ অন্যান্য জ্ঞানীজনদের একই অভিমত সরকারের সর্বোচ্চ শক্তি-ক্ষমতা ও প্রণোদনা দিয়ে ধান কেটে ঘরে তোলার সহযোগিতা করা উচিৎ। কারণ এই মুহূর্তে বোরোর আবাদ চাষিরা ঘরে তুলতে পারলেই তাদের সম্ভব হবে আগামীতে সময়মত আউশ মৌসুমের ধান রোপন করা। ফলে ধান উৎপাদনে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে।
গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এ মুহূর্তে গ্রামে যে সকল চিকিৎসা এবং চিকিৎসাকর্মী দিয়ে কৃষকদের চাষের উন্নয়নে কৃষি যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন বা কাজ করতে আগ্রহী তাঁদেরও সরকারি পর্যায়ে নানামুখি প্রণোদনার আওতায় আনা জরুরি। বিশেষ সাক্ষাৎকারে শিক্ষাবিদ হোসেন জিল্লুর রহমানও মনে করেন স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ অর্থনীতি দুটোই সামাল দেয় জরুরি। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনিস্টিটিউটের মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীরও বলেছেন দেশের উৎপাদিত ধান সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নষ্টের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে- না পারলে অনেক মূল্য দিতে হবে
বরেন্দ্রভূমির শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যক্ষ তসিকুল ইসলাম রাজা মনে করেন, কৃষির সকল খাত উপখাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি জরুরি প্রণোদনা দিলে ভালো প্রভাব পড়বে ভবিষৎ অর্থনীতিতে এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
আর্ন্তজাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ জেড আই ফারুক মনে করেন, এ মুহূর্তে যে কোনো মূল্যে এবারের বোরো ফসল ঘরে তোলার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া উচিত। অন্যথায় যে দুর্ভিক্ষের আশংকা সকলে করেছে সেটা অনেক আগেই এসে যাবে।
লেখক: কৃষক