নওগাঁর হরিজন কলোনীর বাসিন্দাদের মানবেতর জীবন-যাপন: প্রকট আকার ধারণ করেছে আবাসন সঙ্কট

আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৮, ১:১১ পূর্বাহ্ণ

নওগাঁ প্রতিনিধি


নওগাঁর হরিজান পল্লীতে এ রকম ঘিঞ্জি পরিবেশে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন হরিজন জনগষ্ঠি-সোনার দেশ

হরিজন বা সুইপার সম্প্রদায় আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। আমাদের সমাজের অনেক নিচু মানের কাজ মূলত এই সম্প্রদায়ের লোকেরা করে থাকে। বর্তমানে আবাসন সঙ্কটের কারণে মানবেতর জীবন-যাপন করছে নওগাঁর হরিজন পল্লীর বাসিন্দারা। জনসংখ্যা বাড়লেও নওগাঁর হরিজন সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের জন্য গত ৩০ বছরে নতুন করে একটি ঘর কিংবা এক ইঞ্চি জমিও বাড়ানো হয় নি। বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরে এক একেকটি কক্ষে পরিবারের ছয়-সাতজন সদস্য নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করে আসছেন তারা।
পৌরসভা সূত্রে জানা, প্রথম দিকে শহর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কাজে নিয়োজিত সুইপারদের জন্য স্থায়ী কোনো আবাসন ব্যবস্থা ছিল না। সুইপারদের অধিকাংশই হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। সুইপারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৫ সালে নওগাঁ পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল জলিল শহরের হাট-নওগাঁ এলাকায় মাছ বাজারের কাছে দুই একর জায়গার ওপর সুইপারদের জন্য একটি কলোনী গড়ে তোলেন। সেখানে তিনি সুইপারদের বসবাসের জন্য ২৫টি আধাপাকা ঘর তৈরি করে দেন। এটি বর্তমানে হরিজন পল্লী হিসেবে পরিচিত। এরপর থেকে গত ৩৩ বছরে পৌরসভা থেকে জনসংখ্যা বাড়লেও সুইপারদের জন্য নতুন করে কোনো ঘর কিংবা আলাদা কোনো জমি নির্ধারণ করে দেয়া হয় নি।
হরিজন পল্লীতে বসবাসরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে নওগাঁ হরিজন পল্লীতে ৮০টি পরিবার রয়েছে। জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ শতাধিক। পৌরসভার নির্মিত ২৫টি ঘরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বিভিন্ন সময় সেখানকার বাসিন্দারা কলোনীর ফাঁকা জায়গায় আরো ৩০টি আধাপাকা ঘর গড়ে তোলেন। এতেও আবাসন সঙ্কট নিরসন দূর হচ্ছে না। আর জায়গা না থাকায় নতন করে ঘর নির্মাণ করতে পারছেন না তারা। ফলে কোনো কোনো পরিবারকে ছয়-সাত জন সদস্য নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করতে হচ্ছে।
হরিজন কলোনীর বাসিন্দা কার্তিক বাঁশফোড় বলেন, ‘আমার নানী পৌরসভা থেকে একটি থাকার (শয়নকক্ষ) ও একটি রান্নাঘর পেয়েছিল। নানী মারা যাওয়ার পর ওই ঘরে আমি স্ত্রী নিয়ে উঠি। বর্তমানে আমার তিনটি মেয়ে ও একটি ছেলে। ওই এক ঘর ও বারান্দায় গাদাগাদি করে আমাদের থাকতে হয়। বিয়ের উপযুক্ত মেয়েকে নিয়ে এক ঘরে থাকতে হয়। কতোটা অসহায় হলে এভাবে থাকতে হয় মানুষকে।’
বিমলা রাণী নামের আরেক বাসিন্দা জানান, তার পরিবারে পাঁচজন সদস্যের জন্য মাত্র একটি ঘর। একমাত্র ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ছেলে ওই ঘরটিতে থাকেন। থাকার জায়গা না থাকায় বিমলা ও তার স্বামী রান্না ঘরে থাকেন।
নওগাঁ হরিজন কলোনীর বাসিন্দাদের প্রায় সবার কাহিনী কার্তিক ও বিমলার মতোই। আবাসন সঙ্কটের কারণে তারা মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
হরিজন সম্প্রদায়ের সিবিও সভাপতি (সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন) ভানু বাঁশফোড় বলেন, ‘আবাসন সঙ্কট নিরসনের জন্য আমরা একাধিকার মানববন্ধন করেছি। পৌরসভার মেয়র ও সাংসদরা বার বার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো কাজ করেন নি। আমাদের দিকে কেউ তাকায় না। শুধু ভোটের সময় কদর বাড়ে। তখন নানান প্রতিশ্রুত দেন নেতারা। বর্তমান মেয়র গত নির্বাচনের আগে কলোনীর আবাসন সঙ্কট নিরসনে পাঁচ তলা ভবন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখনও সেই মুলা ঝুঁলছে।’

হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবনমান উন্নয়ন ও মূলধারার মানুষদের সঙ্গে সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য ২০০৯ সাল থেকে নওগাঁ হরিজন পল্লীতে কাজ করেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পল্লী সহযোগী বিষয়ক সংস্থা (আরকো)। সংস্থাটি ২০১৬ সাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করে। আরকোর অর্থায়নে ২০১০ সালে হরিজন পল্লীতে দুটি টয়লেট ও দুটি গোসলখানা নির্মাণ করা হয়। এছাড়া কলোনীর শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠদানের জন্য একটি স্কুলও চালু হয় আরকোর উদ্যোগে। যদিও পরবর্তীতে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়।
আরকোর নির্বাহী পরিচালক সজল চৌধুরী বলেন, ‘নওগাঁর হরিজন পল্লীর বাসিন্দাদের নানা সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আবাসন সঙ্কট। জরুরি ভিত্তিতে এই আবাসন সঙ্কট নিরসনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’
এ বিষয়ে নওগাঁ পৌরসভার মেয়র নজমুল হক বলেন, ‘হরিজনদের আবাসন সঙ্কট নিরসনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাদের জন্য একটি আধুনিক আবাসন কলোনী গড়ে তোলার জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করি, আমার এই মেয়াদের মধ্যেই হরিজনদের আবাসন সঙ্কট দূর হয়ে যাবে।’