নওগাঁয় গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের ঝুঁট কাপড় দিয়ে দড়ি তৈরি || ভাগ্য ফিরছে গ্রামীন নারীদের

আপডেট: জানুয়ারি ৩১, ২০১৮, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

আবদুর রউফ রিপন, নওগাঁ


নওগাঁয় ঝুঁট কাপড় দিয়ে দড়ি তৈরির কাজ করছেন গ্রামীণ দরিদ্র নারীরা-সোনার দেশ

অভাব-অনটনের সংসারে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় বড় মেয়েকে কলেজে পড়াশোনা করাচ্ছিলাম। পাঁচ সদস্যের পরিবারে স্বামী বক্ষব্যাধী রোগে আক্রান্ত। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলাম আমি। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে বড় মেয়ে মারা যাওয়ায় দুঃখের সাগরে ভাসতে থাকি। অভাবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যখন দিশেহারা ঠিক তখনই এক নিকট আত্মীয়ের পরামর্শে ঝুঁট কাপড় দিয়ে দড়ি তৈরির কাজ শুরু করি। এরপর থেকেই পরিবার নিয়ে অনেক সুখে আছি।
এভাবেই বলছিলেন নওগাঁ সদর উপজেলার ইলশাবাড়ি গ্রামের জীবনযুদ্ধে সফল গৃহবধূ ফেরদৌসী আকতার। গত ৬ বছর থেকে দড়ি তৈরি এবং বিক্রি করে বেশ ভালো লাভ আসতে থাকে। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। দড়ি তৈরির আয় দিয়ে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা, ওষুধপত্র ক্রয়, সংসারের যাবতীয় খরচ এবং এক ছেলে ও এক মেয়েকে পড়াশোনার খরচ সংকুলান সম্ভব হচ্ছে। সংসারে ফিরে এসেছে স্বচ্ছলতা।
শুধু ফেরদৌসি আকতার নয় এরকম শত গ্রামীণ গৃহবধূ ঝুঁট কাপড় দিয়ে দড়ি তৈরি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। নওগাঁ সদর উপজেলার ইলশাবাড়ী, মাদারমোল্লা, চকবুলাকী, শিমুলিয়া, বলিরঘাট এবং রাণীনগর উপজেলার এনায়েতপুর, পূর্ব বালুভরা, রাজাপুর ও বাহাদুরপুর, দড়িয়াপুরসহ প্রায় ১০/১২টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার গ্রামীণ নারী গার্মেন্টসের এই ঝুট কাপড় থেকে দড়ি তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এ যেন এক জীবনযুদ্ধে জয়লাভের সফল কাহিনী।
দড়ি তৈরিতে যুক্ত নারীরা জানায়, ঝুঁট কাপড় (গার্মেন্টেসের পরিত্যক্ত কাপড়) দিয়ে বিশেষভাবে দড়ি তৈরি করে গ্রামীণ অনেক নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছেন। নওগাঁ সদর ও রাণীনগর উপজেলার ১০ থেকে ১২টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার নারী এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দারিদ্রতার কষাঘাত মুছে ফেলে তাঁরা তাদের সংসারে ফিরে এনেছেন সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ। এসব নারী সংসারের কাজ শেষ করে বাড়তি আয়ের জন্য দড়ি তৈরিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এই ঝুঁট কাপড় থেকে আকর্ষণীয় শিকা, গরু ও ছাগল বাঁধার জন্য দড়ি তৈরি করছেন তারা। এ কাপড় থেকে তৈরি দড়ি মজবুত ও টেকসই বলে পানের বরজে বেশি ব্যবহার উপযোগী হওয়ায় এসবের চাহিদাও বেশি। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো থেকে ঋণ নিয়ে অনেক নারী এই দড়ি তৈরির কাজ করছেন। পরে দড়ি বিক্রি করে তাদের ঋণ শোধ করেও লাভের মুখ দেখছেন। তবে তারা বলেছেন সরকারি সহযোগীতা ও স্বল্প সুদে ঋণ পেলে তাদের এই কাজের প্রতি আরও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিটি ঝুঁট কাপড়ের বস্তার ওজন ৮০-৮৫ কেজি। প্রতিকেজি ঝুঁট কাপড়ের দাম ৪৫ টাকা। সেই হিসেবে এক বস্তা ঝুঁট ক্রয় করতে তাদের খরচ হয় সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। একটি বস্তা ঝুঁট থেকে তৈরি দড়ি বিক্রি হয় সাড়ে ৪ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। একজন নারী প্রতি সপ্তায় ২ বস্তা ঝুঁটের দড়ি তৈরি করতে সক্ষম। কাজেই এক বস্তা ঝুঁট থেকে তৈরি দড়ি বিক্রি করে লাভ করতে পারেন প্রায় ৭শ টাকা। এভাবে প্রতিমাসে একজন নারী গড়ে ৮ বস্তা ঝুঁট থেকে দড়ি তৈরি করতে পারেন। সহজেই একজন নারী প্রতিমাসে ৫ হাজারের বেশি টাকা নীট লাভ করে থাকেন। যেহেতু সংসারের অন্যান্য সকল কাজের ফাঁকে এই কাজগুলো তারা করে থাকেন কাজেই এটি অত্যন্ত লাভজনক। এমনকি কোন কোন পরিবারের সকল সদস্য মিলে এই কাজ করে থাকেন। সেসব পরিবারে লাভের পরিমান আরো বেশি।
সদর উপজেলার ইলশাবাড়ী গ্রামের ফেরদৌসি আকতার ও রেবেকা বিবি, মাদারমোল্লা গ্রামের আকলিমা বেগম ও জরিনা আকতার, শিমুলিয়া গ্রামের আয়শা বেগম, দড়িয়াপুর গ্রামের কুলসুন, রাজাপুর গ্রামের আকলিমা আক্তারসহ অনেকেই বলেন, প্রতি সপ্তায় দড়ি বিক্রি করে প্রায় দেড় হাজার টাকার মতো লাভ থাকে। আর এখান থেকে পরিবারের ওষুধপত্র, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ সংকুলান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সংসার খরচ সহজেই মেটানো সম্ভব হচ্ছে। আল্লাহর রহমতে আগের চেয়ে এখন অনেক ভালভাবে জীবনযাপন করতে পারছি।
এই পেশাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একশ্রেণির দড়ি কেনার দল। নওগাঁ সদর উপজেলার ঝুঁট কাপড় ব্যবসায়ী আসলাম হোসেন বলেন, বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসে ঝুঁট কাপড় কিনে নিয়ে যায় নারীরা। এরপর তারা দড়ি তৈরি করে আবার আমার কাছে বিক্রি করে। আর এসব দড়ি বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যায়।
নওগাঁ শিল্প সহায়ক কেন্দ্রের (বিসিকি) উপব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম বলেন, দরিদ্র জনগণকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিসিক কাজ করে যাচ্ছে। জেলায় যারা শিল্প উদ্যোক্তা আছেন তাদেরকে বিসিক থেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঋণ এবং শিল্পকারখানা সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করে থাকে। যেসব উদ্যোক্তা আছেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ