নওগাঁয় ধান কাটতে ব্যস্ত কৃষক

আপডেট: নভেম্বর ২৭, ২০১৭, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

এমআর রকি, নওগাঁ


নওগাঁয় নতুন ধান কাটতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কয়েকজন কৃষক-সোনার দেশ

গেল দুই মাস আগেও নওগাঁর মাঠগুলো ছিল কৃষকের দুঃচিন্তার কারণ। বন্যার পানি নামবে কিনা তা নিয়ে চরম টেনশনে দিন কাটিয়েছে এ জেলার কৃষকরা। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষক দুই দফা খরচ করে রোপা আমন ধান চাষ করেন। আর অগ্রাহায়নের দুই সপ্তায় জেলার কৃষকদের জন্য ধান কেটে তোলার সময়। বন্যার ধকল কেটে ঘুরে দাঁড়ানো কৃষকের দম ফেলার সময় নেই। স্বপ্নের সেই সোনালী ধান ঘরে তোলার জন্য পড়ে থাকছে মাঠে। আবার অনেকে ধান মাড়াই শেষ করে কেনা কাটার জন্য তুলছে হাটে ।
কৃষকরা জানায়, রোপা আমন চাষে সার, কীটনাশক, জমি প্রস্তুত, খেত মজুর ও বারবার জমিতে কীটনাশক প্রয়োগে যে খরচ হয়েছে তাতে কুলিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে যাবে। সবে হাট-বাজারগুলোয় ধান উঠতে শুরু করেছে। ফলে দাম একটু চড়া। তবে এক সপ্তা বাদেই ওই দামের হেরফের হবে। শুকনো ধানের দামই একটু বেশী পড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর খামার বাড়ি সূত্রে জানা যায়, নওগাঁয় এবার রোপা আমন ধান চাষ হয়েছিল ২ লাখ ১৪০ হেক্টর জমিতে। বন্যায় ধানের ক্ষতির জমির পরিমাণ ৩৮ হাজার ৪৩১ হেক্টর। বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৯৯ হেক্টর। এবার প্রতি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনের পরিমাণ ধরা হয়েছে সাড়ে ১৬ মন। চাল হবে ১১ মন। এ পর্যন্ত ধান কাটার পরিমাণ ছিল শতকরা ২৫ ভাগ।
সরেজমিন জেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, মাঠে এখনো সব ধান পেকে ওঠেনি। তবে কৃষকরা ইতোমধ্যে খলিয়ানসহ নানা আয়োজনে ব্যস্ত নতুন ধান ঘরে তুলতে। এ অঞ্চলের কৃষকেরা যে খেতের ধানগুলো পাকছে সেগুলো কাটতে শুরু করেছেন।
প্রাকৃতিক কারণে এবার পোকা-মাকড়ের উপদ্রব একটু বেশীই ছিলো। ফলে প্রতিটা সময় কৃষকের দুঃচিন্তায় কেটেছে। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোয় পরবর্তীতে চিনি আতপ ধান চাষ করা হয়েছে। মাঠে এখন সেই ধান সবেমাত্র ফলতে শুরু করেছে। চিনি আতপ ধান বিঘাতে সর্বোচ ১২ মন পর্যন্ত উৎপাদন হয়। জেলা জুড়ে জিরাশাইল, পাইজাম, স্বর্ণা-৫, বীনা-৭সহ নানান জাতের ধান চাষ করা হয়েছে এবার রোপা-আমন মৌসুমে।
জেলার মহাদেবপুর উপজেলার উত্তর গ্রামের কৃষক হামিদুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও আমি ৬ বিঘা জমিতে আমন স্বর্ণা-৫ জাতের ধান লাগিয়েছি। ইতোমধ্যে কিছু ধান কেটে বাজারে নিয়ে মাত্র ৯২০ টাকা দরে প্রতি মন বিক্রি করেছি। ধান চাষে যে পরিমাণ খরচ পড়েছে সেই হিসেব কষলে লোকসান গুনতে হবে।
আরেক কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, সার ও বারবার কীটনাশক ব্যবহার করে খরচ বেশী পড়েছে। সেই তুলনায় বাজারে ধানের মূল্য কম হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
জেলার রানীনগরের বেলঘড়িয়া গ্রামের কৃষক তাহের উদ্দিন বলেন, মাঠে আতপ চিকন জাতের ধানে ব্যাপক হারে মরণব্যাধি আক্রমণ করেছে। বিভিন্ন প্রকার কীটনাশক স্প্রে করেও ফল ভাল পাওয়া যাচ্ছে না। ধান পাকার আগ মূহুর্তে পোকার আক্রমণে অনেকেই আতঙ্কে রয়েছেন।
জেলার প্রসিদ্ধ ও বড় ধানের হাট মহাদেবপুরের মাতাজীহাট ও রানীনগর উপজেলার আবাদপুকুর ধানের হাটে গিয়ে দেখা যায়, শুখনো ধানের আমদানি খুবই কম। কৃষক তাদের খরচ চালাতে অনেকটা বাধ্য হয়েই আধা শুকনো ধান হাটে বিক্রির জন্য এনেছেন। তবে ক্রেতার সংখ্য অনেক।
ওই দুটি হাটে জিরাশাইল ১৪০০ টাকা, পাইজাম ১৫৫০ টাকা, স্বর্ণা-৫ প্রকার ভেদে ৯০৫, থেকে ৯১০ টাকা, বীনা-৭ ধান ৯৬০, থেকে ৯৯২ টাকা এবং ৪৯ জাতের ধান ১০১০ থেকে ১০২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
মহাদেবপুরের চাল ব্যবসায়ী উপজেলা চাল কল মালিক গ্রুপের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, হাট-বাজারে সবে নতুন ধান উঠতে শুরু করেছে। ধানের আমদানী তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় চড়া দামেই তারা কিনছেন। এখন ধানের যা আদ্রতা রয়েছে সে অনুপাতে বাজার বেশ চড়া বলা যায়। মন প্রতি মোটা ধান ৯৫০ টাকা থেকে ১ হাজার পর্যন্ত কিনছে মিলাররা। এ ধান শুকানোর পর আরো ১ থেকে দেড়শো টাকা বেশি পড়ে যাবে। তিনি বলেন বর্তমান বাজার কৃষকের জন্য অনুকুল বলা চলে ।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বলেন, গড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এই কয়েক দিনে শতকরা ২৫ ভাগ জমির রোপা-আমন ধান কেটেছে কৃষক। বন্যা এবং বন্যার আগে বৃষ্টিতে রোপা-আমন ধান চাষে কৃষকরা চরম বিড়ম্বনায় পড়েন। বন্যা পরবর্তী অনেক কৃষক চিনি আতপ ধান চাষ করেছেন। ওই ধান উঠতে একটু দেরি হবে।