নজরুল : এক অনন্য সঙ্গীত প্রতিভা

আপডেট: জুন ১, ২০১৯, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ড. কানাই লাল রায়


নজরুলকে মূলত আমরা কবি হিসেবে জানলেও তিনি শুধু কবিতার কবি নন, তিনি সঙ্গীতকার কবি। নজরুল নিজেকেও স্বয়ং তাই বলেই জানতেন। তিনি বলেছেন, আমার দুঃখ যে লোকে আমাকে কবি হিসেবে জানে। কিন্তু আমি কবিতা রচনার জন্য বেশি পরিশ্রম করিনি। আর আমি যে শিল্পের জন্য জীবনপাত করেছি লোকে সে সম্বন্ধে খুব কম জ্ঞান রাখে বা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আর সেই শিল্প হল সঙ্গীত।
বাংলা-সঙ্গীত জগতে প্রধান পাঁচ স্তম্ভ হলেনÑ রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ ও নজরুল। এঁদের প্রথম চার জন বাংলা সঙ্গীতকে অন্যান্য নানা দিক দিয়ে বহুতরভাবে সমৃদ্ধ করেছেন বটে, কিন্তু নজরুল এক জায়গায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সংখ্যা প্রাচুর্য তো বটেই, বৈচিত্র্যেও তিনি অনন্য সাধারণ। এতো বিচিত্র ধরনের ও রসের গান বাংলার আর কোনো গীতিকার ও সুরকার আজ পর্যন্ত সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন বলে আমার জানা নেই। রবীন্দ্র-সঙ্গীত যখন ধ্রুপদ ও ধামারের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়েও মানুষের মনকে ভিন্ন জগতে নিয়ে যেতে শুরু করেছে, দ্বিজেন্দ্রলাল যখন পাশ্চাত্যের সঙ্গীত রীতি বাংলা গানে সংমিশ্রণে প্রয়াসী, সাথে এগিয়ে এসেছেন অতুলপ্রসাদ তাঁর আধ্যাত্মিক ভাব ও রজনীকান্ত তাঁর ভক্তিমূলক ও স্বদেশ-প্রেমমূলক গান নিয়েÑ এরই মাঝে নজরুলের দৃপ্ত সদর্প আবির্ভাব বাংলা-সঙ্গীত জগতে তাঁর বিচিত্র ধর্মিতা- তাঁর স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে।
নজরুলের প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মতো গানের কথা জানা যায়, যদিও মাত্র পনেরশ’র মতো গানের সন্ধান এ যাবত পাওয়া গেছে। অবশিষ্ট প্রায় দু-আড়াই হাজার গান আজ অবজ্ঞায় অবহেলায় অবলুপ্ত বা প্রায় বিনষ্ট হতে চলেছে। কিন্তু তা সত্বেও এখনও যা আছে তারও সংখ্যা-প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্যও বড় কম নয়। তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার ও সুকণ্ঠ গায়ক। স্বদেশি গান, জাতীয় স্বাধীনতার গান, শ্রমিকের গান, কৃষকের গান, ছাত্রদের গান, প্রেমগীতি, ভক্তিগীতি, ভজন, কীর্তন, গীত, শ্যামাসঙ্গীত, ইসলামীসঙ্গীত, গজল, কাউআলি, ভাটিয়ালি, বাউল, ঝুমুর, রাগ-প্রধান, খেয়াল, লুপ্ত বা অর্ধলুপ্ত রাগ রাগিণী অবলম্বনে বাংলা গান, বিদেশি সুরের ঢংয়ে বাংলা গান, হাসির গান, নারী জাগরণের গান, শিশু-সঙ্গীত প্রভৃতি বহু বিচিত্র বিষয়ের গানে নজরুল ঋদ্ধ করেছেন বাংলা সঙ্গীত ভুবনকে। কর্মোন্মাদনা, মাধুর্য, ওজস্বী বাক্ প্রতিমা, ভক্তিময় আত্মনিবেদনের আবেগ, বৈচিত্র্যময় সুর-সংযোজন, বাণীর সৌন্দর্য, বিষয়ের বিচিত্রতাÑনজরুলের সঙ্গীতকে করে তুলেছে এক অনাস্বাদিতপূর্ব রসবস্তু।
খুব ছোট বেলায় লেটোর দলের জন্য গান রচনার মধ্য দিয়ে নজরুলের গান লেখার পালা শুরু হয়েছিলÑবাক রুদ্ধ হয়ে যাবার আগে পর্যন্ত (১৯৪২ খ্রি.) আর সে পর্বে ছেদ পড়েনি। ‘সৃষ্টি-সুখের-উল্লাস’ ছাড়া আর কোনো কারণ দিয়েই বোধ করি এই সৃষ্টিশীলতার ব্যাখ্যা চলে না।
নজরুল ছিলেন প্রবল প্রসন্ন প্রাণের পরিপূর্ণ প্রতীক। তাঁর দুর্বার প্রাণশক্তি তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকে প্রণোদিত করেছে। ভাষায় এনেছে তীক্ষèতা, ছন্দে এনেছে জীবন স্পন্দন, ভাবে এনেছে বল-বীর্য ও তেজের উদ্দীপ্তি। শুধু স্বাধীনতা আন্দোলনেই সে বেগ সঞ্চার করেনি, সমস্ত বাংলা সাহিত্যের নির্জীব ¯œায়ুশিরায় নতুন রক্তের প্রবাহ সঞ্চার করেছে।
কাব্য-জগতে নজরুল যেমন এক নতুন প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিলেন, বাংলা-সঙ্গীত জগতেও তিনি করে গেছেন এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন। আগে বাংলা গান ছিল অত্যন্ত নির্জলা ধরনের এক ঘেয়েমিতে ভরা। নজরুল সেই বৈচিত্র্যহীন বাংলা গানকে প্রধানত এদেশের রাগ-সঙ্গীতের প্রভাবাধীন রেখেই স্বীয় প্রতিভাবলে তাতে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সুর সংযোজন করে অপূর্ব সুর-মাধুর্যের সৃষ্টি করেছেন। বাংলা গানের আধুনিক পর্যায়ের সূচনা, বিকাশ ও উন্নয়নের কৃতিত্ব তাই এককভাবে তাঁরই প্রাপ্য বলা যায়। বাংলা গানের ছন্দ প্রকরণ ও শব্দের সাঙ্গীতিক ধ্বনিময়তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রেখেই তিনি এসব নতুন গান ও সুর সৃষ্টি করেছেন।
শোনা যায়, তিনি বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক গীত রচনা করেন। এটা গবেষণা সাপেক্ষে হলেও একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যে তাঁর মত নানাধর্মী গীত আর কেউ রচনা করেন নি। ধ্রুপদি থেকে লোক, দেশজ থেকে বিদেশি, ইন্দ্রিয়জ থেকে অতীন্দ্রিয়, শ্যামা থেকে মুর্শেদি, মারফাতিÑ কত বিচিত্র ধরনের সঙ্গীতই যে তিনি রচনা করেছেন!
নজরুলের গানের ছন্দ সম্পর্কে অবশ্য অনেকে নানা রকম মত পোষণ করেন। তাঁদের অভিযোগ নজরুল সব সময় গানের প্রচলিত রীতি-নীতি মেনে চলেন নি। এমন কী, তাঁর বেশির ভাগ গানের ছন্দ যেন কেমন অবিন্যস্ত – অনিয়ন্ত্রিত। কিন্তু সুর-সংযোজনার প্রক্রিয়ার সাথে যাঁরা অল্প-বিস্তর পরিচিত তাঁদের কাছে ছন্দের এই সামান্য অনিয়ম তেমন গুরুতর ঠেকবে না। তাছাড়া, তাঁর গানের সুরের মাদকতা এত বেশি যে সুরের বিশুদ্ধির কথা ভাববারও সময় পাওয়া যায় না। এ ছাড়াও আমাদের একটা কথা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, জীবিকার তাগিদে নজরুলের অধিকাংশ গানই দ্রুত বা তাৎক্ষণিক রচনা। এত ভেবেচিন্তে আট-ঘাট বেধে সঙ্গীত রচনা বা সুরযোজনার তাঁর সময়ই বা কোথায়? তাছাড়া, তাঁর ভিতরের অস্থিরতাও তাঁকে কোনো এক বিষয়ে বেশি সময় স্থির থাকতে দেয়নি। এসব সত্বেও, বাংলা সঙ্গীত-জগৎ এই মহান গীতিকার ও সুর¯্রষ্টার হাতে যেভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে সে তুলনায় এই সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না।
নজরুলের গানে বহু বিচিত্র ভাব ও রসের সমাবেশ ঘটলেও উত্তর ভারতীয় মুসলমানি সঙ্গীত-সুলভ রং-রস-মাধুর্যের উপাদান তাতে খুব বেশি। তিনি ধ্রুপদ-সঙ্গীতের আদর্শের দ্বারা যত না প্রভাবিত হয়েছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবিত হয়েছেন টপ্পা, ঠুমরী, কজরী, হোরি, নাত, গজল, গীত, কাউয়ালী প্রভৃতি বর্গের গানের দ্বারা। রবীন্দ্রসঙ্গীতে এর ঠিক বিপরীত জিনিস লক্ষ্য করা যায়। কারণ, রবীন্দ্রসঙ্গীত ধ্রুপদের আদর্শে গঠিত। এই মৌলিক পার্থক্যটি মনে না রাখলে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীতের ভিন্নতা ঠিক বোঝা যাবে না। দু’য়ের রস সম্পূর্ণ আলাদা। নজরুল এক জীবনে প্রায় তিন সাড়ে তিন হাজার গান রচনা করেছিলেন। এটা আমাদের দেশে সঙ্গীত রচনার সর্বোচ্চ রেকর্ড – সম্ভবত পৃথিবীর গানের ইতিহাসেও এটাই সর্ব বৃহৎ সংখ্যা। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই সুবিপুল সংখ্যক গান নজরুল মাত্র ঊনিশশ’ বিশ থেকে ঊনিশশ বিয়াল্লিশ এই বাইশ-তেইশ বছরের পরিধির মধ্যে সৃষ্টি করেছিলেন। অবশিষ্ট জীবন যদি তিনি সুস্থ ও সক্রিয় থাকতে পারতেন তাহলে সে-সৃষ্টি আরও কত অজ¯্রতা ও বৈচিত্র্য ম-িত হতে পারত তা সহজেই অনুমান করা যায়। সংখ্যার বিপুলতা যদিও সব সময় শ্রেষ্ঠত্বের পরিমাপক নয়, কিন্তু সৃষ্টির স্বতোৎসার উচ্ছ্বলতার প্রমাণ তো বটেই – সেটাও বড় কম শক্তি নয়।
তিনি স্বদেশি গানকে স্বাধীনতা ও দেশাত্মবোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বহারা শ্রেণির গণসঙ্গীতে রূপান্তরিত করেন।
নজরুল ছিলেন বাংলা গজল গানের ¯্রষ্টা। নজরুল গজল-আঙ্গিক সংযোজনের মাধ্যমে বাংলা গানের প্রচলিত ধারায় বৈচিত্র্য আনয়ন করেন। তাঁর অধিকাংশ গজলের বাণীই উৎকৃষ্ট কবিতা এবং তার সুর-রাগভিত্তিক। আঙ্গিকের দিক দিয়ে সেগুলি উর্দু গজলের মতো তালযুক্ত ও তাল-ছাড়া গীত। তাঁর বাংলা গজল গানের জনপ্রিয়তা সমকালীন বাংলা গানের ইতিহাসে তুলনাহীন। নজরুল ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত এইচ.এম.ভি গ্রামোফোন কম্পানির সঙ্গে সঙ্গীত-রচয়িতা ও প্রশিক্ষক রূপে যুক্ত ছিলেন।
এইচ.এম.ভি.-তে নজরুলের প্রশিক্ষণে প্রথম রেকর্ডকৃত তাঁর দুটি গান ‘ভুলি কেমনে’ ও ‘এত জল ও কাজল চোখে’ গেয়েছিলেন বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আঙ্গুরবালা।
১৯৩৯ সালের অক্টোবর মাস থেকে নজরুল কলকাতা বেতারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে অনেক মূল্যবান সঙ্গীতানুষ্ঠান প্রচারিত হয়। অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘হারা মণি’, ‘মেল-মিলন’ ও ‘নবরাগমল্লিকা’। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তীর সহযোগিতায় তিনি কলকাতা বেতার থেকে অনেক রাগভিত্তিক ব্যতিক্রমধর্মী সঙ্গীতানুষ্ঠান পরিবেশন করেন। যা ছিল নজরুলের সঙ্গীত-জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৩৯ সালে নজরুল কলকাতা বেতারের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এইচ.এম.ভি., মেগাফোন, টুইন, কলম্বিয়া, হিন্দুস্থান, সেনোলা, পাইওনিয়ার, ভিয়েলোফোন প্রভৃতি গ্রামোফোন কম্পানি থেকে তাঁর সহ¯্রাধিক গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। যে-সব কম্পানি থেকে তাঁর সবচেয়ে বেশিসংখ্যক গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয় সেগুলি হলোÑ এইচ.এম.ভি, টুইন, মেগাফোন, কলম্বিয়া প্রভৃতি থেকে।
সংখ্যা প্রাচুর্য্য, প্রাণ-শক্তির অজ¯্র লীলার প্রকাশ তার সঙ্গে, গুণ-ম-িত হলে তো কথাই নেই – অবশ্যই কোনো কবি বা সঙ্গীতকারের এটাই সর্বোচ্চ গুণবত্তা তথা শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। নজরুলের গানে এ সবেরই যুগপৎ সাক্ষাত মেলে। এ জন্যেই তাঁর গান অনন্য – নজরুল অনন্য সাধারণ।
লেখক: প্রফেসর (অবসরপ্রাপ্ত), ভাষা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।