নজরুল সাহিত্যে দেশপ্রেম

আপডেট: জুন ৯, ২০১৮, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

ড. মোহা. আজমল খান


কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ মোতাবেক ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কাজী ফকির আহমদ, মাতা জাহেদা খাতুন, পিতামহ কাজী আমানুল্লাহ এবং মাতামহ তোফায়েল আলী। তিনি পিতা-মাতার ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন। পরিবারের অভাব অনটনের মধ্যে জন্ম হওয়ায় মা আদর করে নাম রেখেছিলেন দুখু মিঞা। দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে বেড়ে ওঠা। নজরুল ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রাম্য মক্তবে পাঠ শুরু করেন। মক্তবে লেখা-পড়া শেষ হওয়ার পূর্বে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে আকস্মিকভাবে পিতা কাজী ফকির আহমদের মৃত্যু ঘটে। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নি¤œমাধ্যমিক পাশ করে সংসার পরিচালনার কথা ভেবে মক্তবে শিক্ষক হিসেবে যোগদান থেকে পীর পুকুরের মাজার শরিফে খাদেমগিরি, মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। এসবের মাঝে ফাঁকে ফাঁকে পিতৃব্য কাজী বজলে করিমের কাছে আরবি, ফারসি পাঠের তালিম গ্রহণ করেন। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে লেটো দলে যোগদানের মধ্য দিয়ে নজরুলের সাহিত্য জগতে বিচরণ শুরু হয়। লেটো দল থেকে ফিরে এসে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানে মাথরুন গ্রামে নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউটে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ওই সময়ে ইন্সটিটিউটের প্রধান শিক্ষক কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের সান্নিধ্যে এসে লেটো দলের সাথে নজরুলের সম্পর্ক আরো গভীর হয়ে ওঠে। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ শেষ হওয়ার পূর্বেই তিনি আর্থিক অনটনের কারণে লেখা-পড়া ছেড়ে দিয়ে পালা গানে অংশগ্রহণ করেন এবং অনেক পালা গান লেখেন। সে সময়ে নজরুল ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। এরপর রাণীগঞ্জে রেলওয়ে গার্ড সাহেবের বাবুর্চিগিরি, আসানসোলে এমএ বখস্ এর রুটির দোকানে চাকরি করেন। এমএ বখস্ এর রুটির দোকানে চাকরিকালীন কাজী রফিজুল্লাহ নামে এক পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ময়মনসিংহের ত্রিশালে গমন করেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ত্রিশালের দরিরামপুর হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পরীক্ষার ফল বের হওয়ার আগেই আকস্মিকভাবে রাণীগঞ্জে প্রত্যাবর্তন করেন। সেখানে ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে শিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ফলাফল ভাল হওয়ায় ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ডবল প্রমোশন পেয়ে নবম শ্রেণিতে উন্নীত হন। শিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে অধ্যয়নকালে লেখায় তাঁর হাতেখড়ি। সে সময় তিনি ‘চড়ুই পাখির ছানা’, ‘করুণগাথা’, ‘করুণ বেহাগ’, ‘রাজার গড়’, ‘রাণীর গড়’ কবিতা রচনা করেন। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে দশম শ্রেণিতে প্রিটেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে ৪৯, বেঙ্গলি পল্টনে যোগদান করে নৌশেরায় প্রশিক্ষণে যান। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯১৮-১৯ খ্রিস্টাব্দে করাচিতে গাজা-আবিসিনিয়া লাইনে অবস্থান করেন। এখানে তিনি ব্যাটালিয়ান কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে পদোন্নতি পান। করাচিতে অবস্থানকালে তিনি ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ নামে ছোটগল্প রচনা করেন। যা কলকাতার মাসিক পত্রিকা ‘সওগাত’ এবং ‘ক্ষমা’ নামে একটি কবিতা রচনা করেন যা ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় ‘মুক্তি’ নামে প্রকাশিত হয়। এভাবেই তিনি বাংলার সাহিত্যাকাশে জ্যৈষ্ঠ্যের ঝড়ের মত অনুপ্রবেশ করেন। নজরুলের সাহিত্য জগত প্রায় ২৩ বছর (১৯১৯-১৯৪২) এ স্বল্প সময়ের মধ্যে কবি অশেষ অমূল্য সাহিত্য সম্পদ জাতিকে উপহার দিয়েছেন। যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর সাবলিল বিচরণ বাংলা সাহিত্যকে পুষ্পম-িত করেছে। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সংগীত, চলচ্চিত্র এবং পত্রিকা সম্পাদনা এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চির ভাস্বর হয়ে রয়েছে। সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্র নানদনিকতায়, বিষয় বৈচিত্রে প্রেম, বিপ্লব ও জাগরণের সৃষ্টিশীলতায় উজ্জ্বল করে রেখেছেন। এ অসাধারণ প্রতিভার কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনার দিকে নজর ফেরালে দেখা যায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ব্যথার দান’ যা একটি গল্প গ্রন্থ। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ২২ মার্চ কলকাতার মুসলিম পাবলিশিং হাউজ থেকে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে। সে বছরই একই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয় প্রবন্ধগ্রন্থ ‘যুগবাণী’। এটি প্রকাশের পর তৎকালীন বৃটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেন। এরপরও কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা থেমে থাকেনি। লিখে গেছেন অবিরামভাবে দেশের জন্য, নিপীড়িত মানুষের জন্য। বাংলা সাহিত্যে নজরুলের রচনা প্রকাশের ক্রমধারার দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাই প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ব্যথার দান’। নজরুল সাহিত্যের এ গল্পগ্রন্থের আলোকপাত করতে গিয়ে দেখতে পাই প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর কালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এদেশের মানুষের বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অবক্ষয় ও সংকটকে নিরীক্ষণ করেছেন। যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে সে সময়ের মানুষের বিপর্যয় ও অসহায়ত্বকে নজরুল পর্যবেক্ষণ করেছিলেন ফলে তাঁর লেখনিতে খুব সহজেই সাবলীলতা ফুটে উঠেছে। তাই দেখা যায় নজরুল সাহিত্যে এক বিশেষ অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে দেশপ্রেম নিয়ে। যার অর্থ সাম্যবাদ, তিনি সর্বস্তরের মানুষের জন্য যেমন সাহিত্য রচনা করেছেন তেমনি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা তথা বৃটিশদের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর লিখনী সর্বদায় গর্জে উঠেছে।
তাই তিনি তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বলেছেন-
“আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শশ্মান
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রানী-যুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য,
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরি, আর হাতে রণ-তূর্য।”

কবির এ বক্তব্য থেকে সহজেই বোঝা যায় তাঁর দেশপ্রেমের দ্বৈতরূপ।
নজরুলের দেশপ্রেমের স্বরূপ নানাজনে নানাভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি রাজনৈতিক পরাধীনতা এবং অর্থনৈতিক পরবশতা থেকে দেশ ও জাতির মুক্তি চেয়েছিলেন। এর পথ তরান্বিত করার নির্দেশনাও রয়েছে তাঁর লেখনিতে। তাঁর নির্দেশিত পথকে কেউ কেউ ভেবেছেন সস্ত্রাসবাদ। কারণ তিনি দেশমাতৃকতার জন্য ক্ষুদিরামের আত্মহত্যার উদাহরণ দিয়ে তরুণদের অগ্নিমন্ত্রে আহবান জানিয়ে ছিলেন। আবার কেউ ভেবেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কিংবা শেরে-বাংলা একে ফজলুল হকের নিয়মতান্ত্রিকতার কথা। কারণ দেশবন্ধুর প্রয়াণে তিনি লিখেছেন ‘চিত্তনামা’। আবার কেউ ভেবেছেন প্যান ইসলামিজ্যুমের কথা। কেননা, তিনি গেয়েছেন আনোয়ার পাশার প্রশস্তি। কিন্তু এসবের কোনোটাই নজরুলের দেশপ্রেমের সত্যরূপ উদঘাটনের সহায়ক নয়। প্রকৃতপক্ষে নজরুল তাঁর সাহিত্য জীবনের প্রারম্ভে ছিলেন কামালপন্থী। কামাল আতাতুর্কের সুশৃঙ্খল সংগ্রামের পথই স্বদেশের স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য সবচেয় উত্তম পন্থা। নজরুল এ ধারণাতেও অবিচল থাকতে পারেননি। সাম্য, শান্তি ও মুক্তির দিশারী নজরুল ফিরে এসেছেন ইসলামের পথে। এ ইসলামী আদর্শই নজরুলকে দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছে। ইসলামী জাগরণী মন্ত্রেই তিনি প্রভাবিত হয়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আরেক জায়গায় বলেছেন-
“বল বীর-
আমি চির উন্নত মম শির !
আমি চির দূর্দম, দূর্বিনীত নৃশংস,
মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর।”

তিনি তাঁর এক অভিভাষণে বলেছেন- “ইসলামের কাছেই তিনি প্রকৃত সাম্য, শান্তি এবং মুক্তির মন্ত্রণা পেয়েছেন।” নজরুলের দ্রোহই ছিল দেশপ্রেম। আর এ দেশপ্রেমিকের সত্তাই তাঁকে করেছে বিদ্রোহী। আসলে দেশপ্রেমই ছিল নজরুলের লেখনির মূলমন্ত্র। দেশপ্রেমই কবিকে ‘ভাঙার গান’ লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছে। সেখানে তিনি বলেছেন-

“কারা ঐ লৌহ কপাট
ভেঙে ফেল কররে লোপাট
রক্ত জমাট
শিকল পুজোর পাষাণবেদী !
ওরে ও তরুণ ইশাণ,
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ !
ধ্বংস নিশাণ
উড়–ক প্রাচী’র প্রাচীর ভেদি।”
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই কবি উদ্দীপনামূলক গান লিখেছেন- ‘শিকল পরার গান’-
“এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল,
এই শিকল প’রেই শিকল তোদের করব রে বিকল।”

নজরুলের ‘ব্যাথার দান’ গল্পগ্রন্থেও দেশপ্রেমের দ্বৈতরূপ দেখতে পাওয়া যায়। এ গ্রন্থের প্রতিটি গল্পে যেমন প্রেম আছে পাশাপাশি দেশপ্রেমও জড়িয়ে রয়েছে। মূলত প্রেম-কাহিনীকে আশ্রয় করে প্রতিটি গল্পে দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ‘ব্যথার দান’ গল্পে নজরুল কখনো দেশকে মা, আবার কখনো প্রেমিকারূপে দেখেছেন। গল্পের শুরুতে তিনি লিখেছেন- “গোলেস্তান ! অনেকদিন পরে তোমার বুকে ফিরে এসেছি ! আ ! মাটির মা আমার, কত ঠান্ডা তোমার কোল।”
আবার আরেক জায়গায় লিখেছেন- “হয়তো মায়ের এই অন্ধ ¯েœহটাই আমাকে আমার এই বড় মা- দেশটাকে চিনতে দেয়নি।” এ উক্তিগুলো থেকেই সহজেই অনুমেয় যে, একদিকে তাঁর মায়ের প্রতি ভালোবাসা যাকে দেশমাতৃকার প্রেমের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ গল্পে নজরুল তাঁর জন্মভূমির মাটিতে প্রেমিকা বেদৌরার প্রেম-ভালোবাসার স্পর্শ খুঁজে পেয়েছেন। সেখানে বলেছেন- “আবার সেই গুলিস্তানে ফিরে এলুম ! যেখানে আমার মাটির কুঁড়ে মাটিতে মিশে গিয়েছে, কিন্তু তাঁরই আর্দ্রবুকে যে তোমার ঐ পদচিহ্ন আকাঁ রয়েছে- তাই আমায় জানিয়ে দিল যে, তুমি এখানে আমায় খুঁজতে এসে না পেয়ে শুধু কেঁদে ফিরেছো।” এ উক্তিতে প্রিয়ার প্রেম এবং দেশের প্রেম একাকার হয়ে গেছে। প্রিয়ার স্পর্শকে তিনি খুঁজে পেয়েছেন। জন্মভূমির আর্দ্রমাটিতে।
‘ব্যথার দান’ গল্পগ্রন্থের অপর গল্প ‘হেনা’ তেও বীর সৈনিক সোহরাবের দেশপ্রেম এবং হেনার প্রতি মানবীয় রূপটি ফুটে উঠেছে। যুদ্ধের ময়দান থেকে সৈনিক সোহরাব কখনো কখনো প্রেমিক সোহরাব বোনে যায়। যুদ্ধের তাঁবুতে অবস্থান করে মনে পড়ে প্রেমিকা হেনার কথা, সোহরাব লেখে- “আমি যাচ্ছি মুক্ত আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে। যার ভিতরে আগুন, আমি চাই তাঁর বাইরেও আগুন জ্বলুক। আর হয়তো আসবো না। তবে আমার সম্বল কি ?” এ বক্তব্য থেকে সহজেই অনুমেয় দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সোহরাবের সম্বল প্রেম।
‘ব্যথার দান’ গল্পগ্রন্থের গল্প ‘বাদল বরিষণে’ প্রেমের গল্প মনে হলেও এর সাথে জড়িয়ে আছে দেশপ্রেম। কেননা কাজরীকে না পেয়ে নায়ক ব্যথাতুর হৃদয়ে কাজরীর রূপ দেখেছেন এদেশ ও প্রকৃতির মাঝে। এখানেই বলেছে ‘ঐ ঘননীল মেঘের বুকে, এ সবুজ-কচি দুর্বায়, ভেজা ধানের গাছের রঙে তোমায় পেয়েছি। ওগো শ্যামলী ! তোমার এ শ্যামশোভা লুকাবে কোথায় ?”
এ বক্তব্যের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে নায়ক তাঁর প্রিয়াকে দেখছেন তাঁর দেশের অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে। এখানে মানবপ্রেম ও দেশপ্রেম একাকার হয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান নজরুলের রচনায় ছোট গল্পগুলোর মধ্যে মানবপ্রেম ও দেশপ্রেম অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে আছে।
‘ঘুমের ঘোরে’ গল্পেও আজহার ও পরীর প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়ায় দেশপ্রেম। প্রেমেই আজহারকে যুদ্ধে নিয়ে গিয়েছে। তাইতো পরী বলছে- “আমার ভালোবাসাই হয়তো তাঁর কর্তব্যের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তাঁর সুখের জন্য তাঁর তৃপ্তির জন্য। আমি কেন তবে সে পথ হতে সরে দাড়াই না ?” আজহারের দেশপ্রেমের কাছে পরীর প্রেমও হার মানাতে পারেনি। তেমনিভাবে ‘অতৃপ্তি কামনা’ গল্পেও মাটির প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নায়ক চলে যায় যুদ্ধে এখানে নায়ক নারী প্রেমকে ভালোবেসে তাঁর হৃদয়ের প্রেমকে নিগুঢ়ভাবে উপলব্ধি করে। এ গল্পেও দেশপ্রেম ও হৃদয়ের প্রেম এক হয়ে গেছে। সেখানে নায়ক বলছে- “এই কথা কয়টি ভাবতে গিয়ে আমার বুক কান্নায় ভরে এলো, আমার যে বাইরে দীনতা তাই মনে পড়ে, তখন আমাকে আমার অন্তরের সত্য প্রেমের গৌরবের জোরে খাড় হতে হলো।” এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়- নারীর প্রেমই নায়ককে দীপ্ত এবং সাহসী করেছে। প্রেমিকার প্রেমের জন্যই দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতে পেরেছে।
‘ব্যথার দান’ গল্পগ্রন্থের শেষ গল্প ‘রাজবন্দীর চিঠি’। এ গল্পের নামকরণেই বিষয়বস্তু সহজেই অনুমেয়। এ গল্পে বন্দি সৈনিকের হৃদয়ের ব্যথা-বেদনার কথা ফুটে উঠেছে তাঁর প্রেমিকার কাছে। দেশপ্রেমের টানে দেশকে পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে প্রেমিকাকে রেখে দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে বন্দি হয়ে প্রেমিকাকে লেখা চিঠিই এ গল্পের বিষয়বস্তু। তাই এ গল্পেও দেশপ্রেমই নারী প্রেমের চেয়ে অগ্রাধিকার পেয়েছে। অতএব, দেখা যায় নজরুল সাহিত্যে ‘ব্যথার দান’ গল্পগ্রন্থে মানবতা ও দেশপ্রেমই প্রধান বিষয়। নজরুল সাহিত্যে বেশিরভাগ রচনাই মানবপ্রেম ও দেশপ্রেমের সমন্বয় ঘটেছে। দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকার জন্য তাদের দুঃখ-দুর্দশা, লাঞ্ছনা, প্রবঞ্চনা যখন ব্যথিত করে চলেছে তখনই নজরুল দেশপ্রেমের কথা ভেবে প্রতিবাদমুখি হয়ে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, কবিতা, গান রচনা করে দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন অধিকার আদায়ের। প্রতিবাদের ভাষাকে বিদ্রোহী মনে করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এ বিদ্রোহের চেতনা জাগ্রত হয় দেশপ্রেম থেকে।
তাই কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ও লাঞ্ছনায় ব্যথিত হয়ে তাদের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন লেখনি। আর এ লেখনি দিয়ে ঝরণা ধারার মত বাক্শক্তি স্তব্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ঝরেছে বিদ্রোহের তথা দেশপ্রেমের অমরবাণী। যা মানবপ্রেম ও দেশপ্রেমের সম্মিলিত রূপ। সুতরাং নজরুল সাহিত্যের মুখ্য বিষয়ই হচ্ছে দেশপ্রেম।
লেখক: নজরুল গবেষক