নতুন ঝাঁজে নতুন দক্ষিণ আফ্রিকা

আপডেট: মে ১৮, ২০১৯, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বিশ্বকাপ এলেই দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দলকে ঘিরে কত কিছু মনে পড়ে তাই না?
সেই ১৯৯২ বিশ্বকাপে ১ বলে ২২ রানের ‘প্রহসন’। ’৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অদ্ভুতুড়ে টাই। ৪ বছর পর পরের বিশ্বকাপে ১ রানের হিসাবের গড়মিল। আবার ২০১৫ বিশ্বকাপে ‘ঘরের ছেলে’র কাছে হেরে চোখের জলে বিদায়! বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে দক্ষিণ আফ্রিকার সবকিছুই যেন এলোমেলো। বারবার ‘চোক’ করতে করতে ‘চোকার্স’ শব্দটি জড়িয়ে গেছে প্রোটিয়াদের সঙ্গে।
তাদের সাফল্যের ছোট গল্প অনেক রয়েছে। এবার বড় কিছু পাওয়ার পালা। ফাফ ডু প্লেসির দল কি পারবে পুরোনো ব্যর্থতা ঝেরে ফেলে সাফল্যের নতুন কাব্য লিখতে? উত্তর জানা যাবে কিছুদিনের মধ্যেই।
বেদনাদায়ক অতীত : ১৯৯২ বিশ্বকাপ। ‘বর্ণবাদের’ অভিশাপে ২২ বছর নিষিদ্ধ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার পর প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় যায় নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ। প্রথম বিশ্বকাপে এসেই সেমিফাইনালে তারা। আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে তারা অংশ নেয় শেষ চারের লড়াইয়ে। কিন্তু মর্মান্তিক এক ‘ট্র্যাজেডি’র শিকার হয়ে বিদায় নিয়েছিল প্রোটিয়ারা। বৃষ্টিতে ৪৫ ওভারে নেমে আসা ম্যাচে ইংল্যান্ড আগে ব্যাটিং করে তোলে ২৫২ রান। জবাবে শেষ ১৩ বলে প্রয়োজন ২২ রান। লক্ষ্য ছিল দৃষ্টিসীমায়। কিন্তু বৃষ্টি তালগোল পাকিয়ে দেয়। ১২ মিনিটের বৃষ্টিতে প- ম্যাচ। বৃষ্টি আইনে লক্ষ্য ১ বলে ২২। ও তো আর নেওয়া সম্ভব নয়! দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রায়ান ম্যাকমিলান ও ডেভ রিচার্ডসন শেষ বল খেলে বেরিয়ে পড়লেন বুকের ভেতরে চাপা ক্ষোভ আর চোখের কোনে জল নিয়ে।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ বিশ্বকাপ আরো কষ্ট দেয় প্রোটিয়াদের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ টাই করে মুখোমুখি লড়াইয়ে শেষ দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ স্বপ্ন। অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া ২১৪ রান তাড়া করে জয়ের জন্য শেষ ওভারে মাত্র ৯ রান লাগত দক্ষিণ আফ্রিকার। বিস্ফোরক ব্যাটিং করা ল্যান্স ক্লুজনার প্রথম দুই বলে দুটো চার মেরে ম্যাচটিকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে এসেছিলেন। ৪ বলে মাত্র ১ রান লাগত। কিন্তু ওখানেই সব শেষ। চতুর্থ বল ব্যাটে লাগিয়ে পাগলাটে দৌড় দিলেন ক্লুজনার। ডোনাল্ড প্রথমে রান নিতে মানা করেছিলেন, যখন দেখলেন ক্লুজনার অনেকটাই এগিয়ে এসেছেন তখন বাধ্য হয়ে তিনিও দৌড় দিলেন। কিন্তু প্রান্ত বদল করতে পারলেন না। ফলাফল ম্যাচ টাই, মুখোমুখি লড়াইয়ে এগিয়ে অসিরা ফাইনালে।
২০০৩ বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ প্রোটিয়ারা। শ্রীলঙ্কার কাছে বৃষ্টি আইনে হেরে বিদায়ঘন্টা বাজে তাদের। কিন্তু ভুল তো করেছিল নিজেরাই। শ্রীলঙ্কার দেওয়া ২৬৮ রান তাড়া করতে নেমে বৃষ্টির খপ্পড়ে পড়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। বৃষ্টি আইনে ৪৫ ওভারে তাদের টার্গেট ছিল ২৩০। কিন্তু ড্রেসিং রুম থেকে ‘ভুল’ বার্তা গেল উইকেটে থাকা মার্ক বাউচার ও ক্লুজনারের কাছে। তাদের জানানো হয় ২২৯ রান করলেই হবে। সেই হিসাবে বৃষ্টির আগে কোনো উইকেট না হারিয়ে লাগত ১৩ রান। প্রথম বলে সিঙ্গেল, পরের দুটি ক্লুজনারের ডট। পরের বলে ওয়াইডসহ আসে বাউন্ডারি। চতুর্থ বলে এক রান ক্লুজনারের। পঞ্চম বলে বাউচারের ছক্কা। ওই ছক্কা দিয়ে ১৩ রান পূর্ণ হয় ঠিক। উৎসবে মেতে উঠে বাউচার। পরের বলে উইকেট না দেওয়ার পণ। আরেকটি ডট বল। এরপর বৃষ্টির কবলে ম্যাচ হয়নি। ওই যে ভুল বার্তায় ২২৯ করেছিল ব্যাটসম্যানরা, তাতেই কপাল পোড়ে প্রোটিয়াদের। ২৩০ করতে পারলেই গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারত স্বাগতিকরা। সেদিন থেকে বেরসিক বৃষ্টির সঙ্গে ‘আড়ি’ পাতে দক্ষিণ আফ্রিকা।
২০১৫ বিশ্বকাপে হট ফেবারিটের তকমা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সূচকের মতোই ছিল তাদের পারফরম্যান্স। সেমিফাইনাল ঠিকই পৌঁছায় তারা। এবারও সেমিফাইনালে আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। সেমিতে তাদের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক দেশ নিউজিল্যান্ড। কিন্তু তাদের ঘরের ছেলেই ভাঙে তাদের বিশ্বকাপের স্বপ্ন। বৃষ্টি আইনে নিউজিল্যান্ড ২৯৮ রানের লক্ষ্য পায়। সফরকারী বোলারদের দারুণ বোলিংয়ে নিউজিল্যান্ড ছিল দিশেহারা। কিন্তু দেয়াল হয়ে দাঁড়ান দক্ষিণ আফ্রিকার বংশোদ্ভূত কিউই ক্রিকেটার গ্র্যান্ট এলিয়ট। তার অপরাজিত ৮৪ রানে শেষ এবি ডিভিলিয়ার্স, ডেল স্টেইন, মরনে মরকেলদের স্বপ্ন। চোখের জলে আবার বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা।
আত্মবিশ্বাসী শিবির : চার বছর পর একই মঞ্চে দক্ষিণ আফ্রিকা। শেষবার র্যা ঙ্কিংয়ে শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপে গিয়েছিল তারা। এবার তিনে থেকে। তবুও শিরোপা জিততে আত্মবিশ্বাসী প্রোটিয়ারা। এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডও অভিজ্ঞতায় ভরপুর। প্রোটিয়াদের দলে তেমন কোনো চমক নেই। নিয়মিত পারফরমাররাই দলে জায়গা পেয়েছেন। প্রত্যাশিতভাবেই অধিনায়কের দায়িত্বে থাকছেন ফাফ ডু প্লেসি। উইকেটরক্ষক হিসেবে আছেন কুইন্টন ডি কক। ওপেনিংয়ে তার সঙ্গী হাশিম আমলা। ‘কিলার’ মিলার রয়েছে। রয়েছেন এইডেন মার্করাম। দুজন লেগ স্পিনারকে রাখা হয়েছে স্কোয়াডে। ইমরান তাহির ‘অটোমেটিক চয়েস’ আর তার সঙ্গে রাখা হয়েছে তাবরাইজ শামসিকে। পেস বোলিং আক্রমণ হয়েছে দুর্দান্ত। ডেল স্টেইন, কাগিসো রাবাদা ও লুঙ্গি এনগিডি। বাড়তি পেসার হিসেবে জায়গা পেয়েছিলেন আনরিখ নর্জে। কিন্তু চোট নিয়ে নর্জে ছিটকে যাওয়ায় স্কোয়াডে ঢুকেছেন পেস বোলিং অলরাউন্ডার ক্রিস মরিস। অলরাউন্ডার হিসেবে আরো আছেন জেপি ডুমিনি, আন্দিলে ফিকোয়াও ও ডোয়াইন প্রিটোরিয়াস।
দুর্দান্ত বর্তমান : শেষ ২১ ওয়ানডেতে ৫ পরাজয়ের বিপরীতে ১৬ জয় দক্ষিণ আফ্রিকার। শেষ পাঁচটি ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে প্রোটিয়া। বর্তমান সময়ে দুর্দান্ত ফর্মে তারা। ঘরের মাঠে কিংবা বাইরে ২২ গজে রঙিন পোশাকে দারুণ পারফর্ম করছে দলটি। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর ৭৪ ওয়ানডেতে তাদের জয় ৪৭টিতে। হেরেছে ২৬টি।
দলের ট্রামকার্ড : দক্ষিণ আফ্রিকার এই দলের সবচেয়ে বড় তারকা ফাফ ডু প্লেসি। শেষ বিশ্বকাপেও ছিলেন তিনি। ব্যাটিংয়ে দল তাকিয়ে থাকবে তার দিকে। নেতৃত্বগুণে ডু প্লেসি অসাধারণ। তার সামনে ইতিহাস গড়ার হাতছানি। দলের ট্রামকার্ড পারফর্ম করলে বাকিদের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। বিশ্বকাপ জয়ের জন্য যে সামর্থ্য, আত্মবিশ্বাস, জেদ দরকার, তার সবটাই আছে দক্ষিণ আফ্রিকার। এবার শুধু মাঠে প্রমাণের পালা।