নববর্ষ দেশে দেশে

আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০১৯, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

হাবিবুর রহমান স্বপন


এই উৎসব শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া, হালখাতা খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হল “শুভ নববর্ষ”। নববর্ষের সময় বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ২০১৬ খ্রিস্টব্দে, ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃক আয়োজিত এই উৎসব শোভাযাত্রাকে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে ঘোষণা করে।
বাংলা দিনপঞ্জির সাথে হিজরি এবং খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরি সন চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সন আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এ কারণে হিজরি সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় আকাশে নতুন চাঁদ দৃশ্যমান হওয়ার পর আর খ্রিস্টীয় সনে নতুন দিন শুরু হয় ইউটিসিক্ট ০০:০০ অনুযায়ী। পহেলা বৈশাখ রাত ১২ টা থেকে শুরু না সূর্যোদয় থেকে শুরু এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, ঐতিহ্যগত ভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমি এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২ টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু করে।
সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বার মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত।
ভারতবর্ষে মুঘল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স¤্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য হত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। স¤্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
আকবরের সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। ‘হালখাতা’ বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।
আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দেও অনুরূপ কর্মকা-ের উল্লেখ পাওযা যায় পরবর্তীকালে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।
নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটামুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোন খোলা মাঠে অয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি একসময় প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে, যা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত।
ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণি-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখ উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের পর পর ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ (পকড়) গাছ। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।
ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে ব্যতিক্রমি এক মেলা বসে যার নাম বউমেলা, এটি স্থানীয়ভাবে “বটতলার মেলা” নামেও পরিচিত। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় এক’শ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপি চলে। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজার জন্য এখানে সমবেত হয়। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনস্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করেন। সন্দেশ-মিষ্টি-ধান দূর্বার সঙ্গে মৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা। পাঁঠাবলির রেওয়াজও পুরনো (আগে মহিষ বলি হতো)। বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন কপোত-কপোতি উড়িয়ে শান্তির বার্তা পেতে চায় ভক্তরা দেবীর কাছ থেকে।
এ ছাড়া সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আরেকটি মেলার আয়োজন করা হয়। এটির নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন এবং তিনি মারা যাওয়ার পর ওই স্থানেই তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং এখানে মেলার আয়োজন করা হয়। এ কারণে লোকমুখে প্রচলিত মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয় এবং আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই কলাপাতায় আনন্দের সঙ্গে তা ভোজন করে। সকাল থেকেই এ স্থানে লোকজনের আগমন ঘটতে থাকে। শিশু-কিশোররা সকাল থেকেই উদগ্রীব হয়ে থাকে মেলায় আসার জন্য। এক দিনের এ মেলাটি জমে ওঠে দুপুরের পর থেকে। হাজারো লোকের সমাগম ঘটে। যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কারণে এ মেলার আয়োজন করা হয়। তথাপি সব ধর্মের লোকজনেরই প্রাধান্য থাকে এ মেলায়। এ মেলায় শিশু-কিশোরদের ভিড় বেশি থাকে। মেলায় নাগরদোলা, পুতুল নাচ ও সার্কাসের আয়োজন করা হয়। নানারকম আনন্দ-উৎসব করে পশ্চিমের আকাশ যখন রক্তিম আলোয় সজ্জিত উৎসবে, যখন লোকজন অনেকটাই ক্লান্ত, তখনই এ মেলার ক্লান্তি দূর করার জন্য নতুন মাত্রায় যোগ হয় কীর্তন। এ কীর্তন হয় মধ্যরাত পর্যন্ত। এভাবেই শেষ হয় বৈশাখের এই ঐতিহ্যবাহী মেলা।
চট্টগ্রামের ডিসি হিল প্রাঙ্গনে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের জন্য মূল অনুষ্ঠানিট হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে প্রতিবছর এখানে পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য দুইদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। মুক্ত মঞ্চে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থাকে নানা গ্রামীণ পণ্যের পশরা। এছাড়াও থাকে পান্তা ইলিশের ব্যবস্থা। এছাড়াও নগরীর বহু স্থানে বৈশাখ বলণ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্তা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি উৎসব। এই উৎসবের নানা দিক রয়েছে, এর মধ্যে একটি হলো মারমাদের পানি উৎসব।
এছাড়াও বর্তমানে বাংলাদেশের সকল উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে নববর্ষ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান হয়। মেলা, শোভাযাত্রা, গান, নাটক, খেলা হয়ে থাকে। এসব অনুষ্ঠানে আবাল বৃদ্ধ বণিতা অংশ গ্রহণ করে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গে মহাসমারোহে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষারম্ভ পয়লা বৈশাখ। বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটিতে বিপুল উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সাথে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে সমগ্র পশ্চিম বাংলায়। বাংলার গ্রামীণ এবং নাগরিক জীবনের মেলবন্ধন সাধিত হয়ে সকলে একসূত্রে বাঁধা পড়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দে। সারা চৈত্র মাস জুড়েই চলতে থাকে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি বা মহাবিষুব সংক্রান্তির দিন পালিত হয় গাজন উৎসব উপলক্ষ্যে চড়ক পূজা অর্থাৎ শিবের উপাসনা। এইদিনেই সূর্য মীন রাশি ত্যাগ করে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে। এদিন গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় চড়ক মেলা। এই মেলায় অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসী বা ভক্তগণ বিভিন্ন শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন করে আরাধ্য দেবতার সন্তোষ প্রদানের চেষ্টা এবং সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করে থাকেন।
এছাড়া, বহু পরিবারে বর্ষশেষের দিন টক এবং তিতা ব্যঞ্জন ভক্ষণ করে সম্পর্কের সকল তিক্ততা ও অম্লতা বর্জন করার প্রতীকী প্রথা একবিংশ শতাব্দীতেও বিদ্যমান। পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ প্রতিটি পরিবারে স্নান সেরে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করার রীতি বহুলপ্রচলিত। বাড়িতে বাড়িতে এবং সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে মিষ্টান্ন ভোজন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশই এদিন থেকে তাদের ব্যবসায়িক হিসেবের নতুন খাতার উদ্বোধন করে, যার পোশাকি নাম ‘হালখাতা’। এই উপলক্ষ্যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিতে মঙ্গলদাত্রী লক্ষ্মী ও সিদ্ধিদাতা গণেশের আরাধনা করা হয়। নতুন খাতায় মঙ্গলচিহ্ন স্বন্তিক আঁকা হয়ে থাকে।
গ্রামাঞ্চলে এবং কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে বিভিন্ন মন্দির ও অন্যান্য প্রাঙ্গনে পয়লা বৈশাখ থেকে আরম্ভ হয় বৈশাখী মেলা। এই মেলা সমগ্র বৈশাখ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়।
ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা পয়লা বৈশাখ উদযাপনে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। নববর্ষারম্ভ উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন পাড়ার অলিতে গলিতে নানা সংগঠনের উদ্যোগে প্রভাতফেরি আয়োজিত হয়। পূর্ববর্তী বছরের চৈত্র মাসে শহরের অধিকাংশ দোকানে ক্রয়ের উপর দেওয়া হয়ে থাকে বিশেষ ছাড়া, যার প্রচলিত কথ্য নাম ‘চৈত্র সেল’। তাই পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে এবং এই ছাড়ের সুবিধা গ্রহণ করতে অর্থনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে কলকাতার অধিকাংশ মানুষ একমাস ধরে নতুন জামাকাপড়, ইত্যাদি ক্রয় করে থাকে।
১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সুপারিশে চালু হয় ‘শকাব্দ’। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি বা জনগণের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার বাংলা একাডেমিকে বাংলা ক্যলেন্ডার সংস্কার করে লিপ ইয়ার-এর বিষয়টি বিজ্ঞানসম্মত করার দায়িত্ব প্রদান করে। এই মর্মে ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে। এতে বছরের প্রথম ৫ মাস ৩১ দিনে। পরের ৭ মাস ৩০ দিনে যে বছর লিপ ইয়ার হবে সে বছর ফাল্গুন মাস একদিন বেড়ে ৩১ দিন হবে। এ কারণেই দুই বাংলার নববর্ষ কোনো কোনো বছর একদিন আগে-পিছে হয়।
ইয়েমেনে নববর্ষ ৬ এপ্রিল। নেপালে ১৪ এপ্রিল (এ কারণে আমাদের সঙ্গে একই দিনে নববর্ষ পলিত হয়ে থাকে)। মায়ানমার এবং থাইল্যান্ডে ১৩ এপ্রিল। নববর্ষের সঙ্গে চলে ‘মহাথিঙ্গন’ উৎসব। চলে জলক্রীড়া। পানিতে একে অপরকে ভিজিয়ে উৎসব চলে। তবে পানি হতে হবে বিশুদ্ধ বা পানের উপযোগী। নোংরা পানি এই উৎসবে ব্যবহার করা অপরাধ। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও চিনে নববর্ষ ফেব্রুয়ারিতে। তিব্বতিদের নববর্ষ ‘লোসার’ উদযাপিত হয় ১৮ জানুয়ারি। পাকিস্তান ও মালদ্বীপে নববর্ষ পালিত হয় ১৭ এপ্রিল। তুরস্ক, কুয়েতসহ মুসলমান প্রধান বেশ কয়েকটি দেশে নববর্ষ পালিত হয় গ্রেগারিয়ান বা ইংরেজি ক্যলেন্ডার অনুসারে অর্থাৎ জানুয়ারিতে।
পশ্চিম বাংলা ও ত্রিপুরায় বাংলা নববর্ষের সঙ্গে হিন্দুদের পুজা-পার্বণ অনুষ্ঠিত হয়। সারা চৈত্র মাস জুড়েই চলে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। প্রতিটি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে মিষ্টান্ন ভোজন। কলকাতার বিভিন্ন পাড়ায় অলিতে-গলিতে নানা সংগঠন প্রভাত ফেরি করে থাকে। তবে বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে ব্যাপ্তি বিশাল। রমনা বটমূল, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পুরাতন ঢাকাসহ সারাদেশের গ্রাম-শহরে আবালবৃদ্ধবণিতা এই দিন সকাল থেকে মেতে ওঠে নাচ-গান, কবিতা, নাটক ও হালখাতা উৎসবে। মোগল স¤্রাট আকবরের সময় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয়তা পায়নি।
ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, ঝাড়খ-, উরিষ্যা, বিহারের বাঙালি পরিবারগুলোও এই দিন উৎসবে মেতে ওঠে। তারা তাদের শিকড়ের সন্ধান খোঁজে এই দিনটিতে। শ্রীলঙ্কায় নববর্ষ উৎসবকে বলা হয় ‘পাথান্ডু’। ভারতের তামিলরাও ওই দিন নববর্ষ পালন করে। এই দিন মন্দিরে মন্দিরে পঞ্জিকা (পঞ্চঙ্গম) পাঠ করা হয়।
ফেব্রুয়ারিতে চিনের চান্দ্র-নববর্ষ। এই উৎসবকে বলা হয় ‘চুন জি’, ইংরেজিতে ‘স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল’ বা স্প্রিং ফেস্ট। বেজিংয়ের হোইহাই হ্রদে মন্দিরের মেলায় ভিড় জমান উৎসাহীরা। চিনের প্রাচীরের একটি অংশ এই দিন বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পর্যটকদের জন্য থাকে বিশেষ প্যাকেজ। প্রতি বছর চিনের নববর্ষে থাকে বিশেষ থিম। গত বছর ছিল সাপ। এ বছর ড্রাগন। লাল পোশাক, লাল সন্ধ্যাবাতিতে সেজে ওঠে চিনের জনজীবন। আগে চিন এবং জাপানে একই দিন নববর্ষ উদযাপন হতো। এখন জাপানিরা ইংরেজি নববর্ষ বা গ্রেগারিয়ান ক্যলেন্ডার অনুসারে নববর্ষ পালন করে ১ জানুয়ারি।
নববর্ষের সন্ধ্যা স্পেনে পরিচিত ঠরংঢ়বৎধ ফব অৎরড় হঁবাড় হিসেবে। ১ জানুয়ারিতে কোরিয়াতে ‘সিওনাল’, ১১/১২ সেপ্টেম্বর ইথিওপিয়ায় ‘এঙ্কুটাটাশ’-এর মতো হল্যান্ডে (নেদারল্যা-) ঘরবাঁলিধধৎ ঝফধম উৎসব, বেলজিয়ামে ঝরহঃ ঝুষাবংঃবৎ ঠড়ড়ৎড়াড়হফ, ফ্রান্সে খধ ঝধরহঃ ঝুষাবংঃবৎব, ইতালীতে ঠরমরষরধ ফর ঈধঢ়ড়ফধহহড় অথবা ঘড়ঃঃব ফরংধহ ঝরষাবংঃৎড় পালিত হয় জাঁকজমকের সঙ্গে। ওয়াশিংটন থেকে প্যারিস, মাদ্রিদ থেকে নিউ ইয়র্ক-পশ্চিমি প্রধান প্রধান শহরগুলো রাতভর জেগে ঘটা করে নববর্ষ উৎসব পালন করে। নাচ-গান-বাজনায় মাতোয়ারা হয় শহরগুলোর মলসমূহ এবং রেস্তোরাঁসমূহ।
পশ্চিমি দেশগুলোর গির্জা ও জাহাজের ঘণ্টাধ্বনি জানায় নববর্ষকে স্বাগতম। গির্জায় গির্জায় ঝুলানো হয় প্রভু যিশুর জন্ম বৃত্তান্ত। চলে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় পর্ব। আবালবৃদ্ধবণিতার বিশাল একটি অংশ মেতে ওঠে আতশবাজিতে। চলে নাচ-গান। জার্মানির নববর্ষের প্রধান উৎসব হয় বার্লিন প্রাচীরের মূল ফটক ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে। লন্ডনে বিগ বেন এবং ওয়েস্টমিনিস্টার প্রাসাদের ঘড়ি ঘরের সামনে ঘটা করে উৎসব করে জনতা। এই অনুষ্ঠান বিবিসিসহ বিভিন্ন মিডিয়া সরাসরি সম্প্রচার করে থাকে।
বাংলাদেশে পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো বছরের নতুন দিনে উৎসব পালন করে। মারমাদের সাংগ্রাই, চাকমাদের বিজু এবং ত্রিপুরাদের বৈষ্ণব উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্তা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসবি। উৎসবের নানা দিক রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো মারমাদের পানি উৎসব যার সঙ্গে মিল রয়েছে মায়ানমার ও থাইদের মহাথিঙ্গন উৎসবের।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
যৎধযসধহ.ংধিঢ়ড়হ@মসধরষ.পড়স