নবান্নের খুশি সবার জন্য

আপডেট: নভেম্বর ২, ২০১৯, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

সালাম হাসেমী


জিয়ারত মুন্সী কাঁকন ডাঙ্গা গ্রামে স্বচ্ছল চাষি। এবার নবান্নে প্রচুর ধান পেয়েছে। ধানে ধানে তাঁর গোলা ভরে গিয়েছে। যে পরিমান ধান পেয়েছে তাতে তাঁর প্রায় তিন বছর খাওয়া চলে যাবে। সারা বছর খেয়ে দেয়ে তার অবশিষ্ট ধান বিক্রি করে প্রচুর টাকা পাবে। তাঁর সাংসারিক জীবনে কোন অভাব অনটন নেই।
ফসলে ধানে ধনে তাঁর সংসার সুখে টইটুম্বর। তাঁর সংসারে তাঁরা স্বামী স্ত্রী ও দু’টি ছেলেমেয়ে। ছেলেটির নাম সবুজ ও মেয়েটির নাম দোলন। সবুজ সপ্তম শ্রেণিতে ও দোলন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। জিয়ারত মুন্সীর এক সহোদর ভাই আছে। তার নাম জাভেদ মুন্সী। তার বাড়ি ব্যতীত অন্য কোন জমি জমা নেই। সে দিন মজুর দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। তার দুটি ছেলে। তাদের নাম সোহাগ ও সজল। সারা গ্রামে নবান্নের ধুম পড়েছে। বাড়ি বাড়ি নতুন চালের পিঠা ও পায়েস রান্না করা হচ্ছে। গ্রামে রাতের বেলায় কারো কারো বাড়িতে জারিগান , কবিগান ও গাজীগানের আসর বসেছে। সারা গ্রাম যেন মহা আনন্দে মেতে উঠেছে। সবুজ ও দোলন তার ছোট কাকা-কাকি ও তার ছেলে দুটিকে নবান্নের নিমন্ত্রণ করার জন্য বলল তাদের বাবা জিয়ারত মুন্সীকে। জিয়ারত মুন্সী তাঁর ছেলে মেয়ের মুখে এই আমন্ত্রণের কথা শুনে লজ্জা বোধ করলেন। তাঁর ছেলেমেয়েদেরকে এই আমন্ত্রেনের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পূর্বে তাঁরই উচিত ছিল তাঁর ছোট
ভাই জাভেদ মুন্সীকে আমন্ত্রণ করা। ছেলেমেযেরা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে জিয়ারত মুন্সী চলে গেল তাঁর গ্রামের উত্তর পাড়ায় তাঁর ভাইয়ের বাড়ি তাদেরকে সপরিবারে দাওয়াত করতে। সবুজ ও দোলনের কাকার পরিবারের লোকজন দুপুরের সময় তাদের বাড়িতে এসে পোছিল। তাদেরকে মাছ, মাংস ও পিঠা পায়েস দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন করানো হল। বিকেল বেলা সবুজ ও দোলন তাদের কাকাতো ভাইদের সাথে খেলা করার জন্য চলে গেল বাড়ির পাশের মাঠে। সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত তারা মাঠে খেলাধুলা করল। রাতে আহার সমাপ্তে করে তারা চলে গের মাতুব্বর বাড়ি জারিগান শোনার ূজন্য। অনেক রাত পর্যন্ত তারা জারি গান শুনে চাঁদিনী রাতে জোছনার আলোতে বাড়ি ফিরে এলো। রাতের বেলা তারা চার ভাইবোন এক ঘরে ঘুমালো। পরের দিন তারা সকালের নাস্তা সেরে চলে গেল বন বাদারে ও মাঠে ঘুরে বেড়াতে। এভাবে সবুজ ও দোলনের ছোট কাকার পরিবারের লোকজন সাত দিন তাদের বাড়ি বেড়াল। সপ্তম দিনে যখন তারা বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে সবুজ ও দোলন তারদের বাবা জিয়ারত মুন্সীর দুপাশে গিয়ে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে বলল,‘আচ্ছা আব্বু এখন তো ছোট কাকু ও তার পরিবারের লোক জন বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, এখন তোমার এই গরীব ভাইযের পরিবারের প্রতি কর্তব্য কি ? বলতে পারেন ?’ জিয়ারত মুন্সী কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বলল,‘ তাদের হাসি মুখে বিদায় দেওয়া ছাড়া তো অন্য কোন কর্তব্য আছে বলে মনে পড়ছে না !’ সবুজ ও দোলন সমস্বরে বলল,‘ কিছুই মনে পড়ছে না ! তোমার ছোট ভাইয়ের অবস্থা স্বচ্ছল নয়। তিনি নিত্যন্তই গরীব মানুষ। ভালো ভাবে তার সংসার চলে না। তুমি এবার নবান্নে প্রচুর ধান পেয়েছো। তা থেকে কিছু ধান তাদের দেওয়া তোমার কর্তব্য নয় কি ? ’ জিয়ারত মুন্সী তাঁর ছেলেমেয়েদের কথায় লজ্জিত হয়ে বলল, ‘ বড় ভুল হয়ে গেছে। একথা বলে তিনি ঘরে গিয়ে কয়েক বস্তা ধান ভ্যানগাড়ি করে তাঁর ছোট ভাইযের বাড়িতে দিয়ে আসল এবং বাড়িতে ফিরে এসে তাঁর ছেলেমেয়ের মাথায় তাঁর দু’হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলল,‘ তোমরা বড় হয়ে এমনি ভাবে আত্মীয় স্বজন, দেশ ও দশের কল্যাণের কথা ভাববে। তাতে আমাদের দেশ ও দশে তোমাদের সেবায় উপকৃত হয়ে উন্নত দেশ হয়ে পৃর্থিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে।’