নরকে সুন্দর বানান যিনি

আপডেট: মার্চ ৫, ২০১৯, ১:১২ অপরাহ্ণ

তাসনিয়া তারান্নুম


শ্রী প্রদীপ চন্দ্র প্রামানিক (৪৪), পেশায় নাপিত। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি কাজ শেখেন বাবা শ্রী বিরেনচন্দ্র প্রামানিকের কাছে। বংশ-পরম্পরায় এই কাজকে তিনি ও তাঁর দাদা প্রভাত চন্দ প্রামানিক ধরে রেখেছেন। বাবা-মা বর্তমান। বাবা বয়সের ভারে এই কাজ আর করতে পারেন না। ৬ ছেলেমেয়ের মধ্যে ৫ম সন্তান তিনি ।
শ্রী প্রদীপ চন্দ্র প্রামানিক সপ্তাহে ৪ দিন সাইকেলে গিয়ে হাটে হাটে চুল-দাঁড়ি কেটে দেন। বড়গাছি, নওহাটাহাট ছাড়াও অন্যান্য হাটে বসেন। তিনি জানান, আগে অনেকেই এই পেশায় ছিলেন, এখন তাঁদের অনেকেই বেঁচে নেই। অনেকে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ায় আর কাজ করতে পারেন না। বড়গাছিহাটে এখন তিনি একাই কাজ করেন। নওহাটা হাটে তিনি এবং নজরুল আমিন (৪৮) কাজ করেন।
দাঁতপুর স্কুল মোড়ে একটি দোকানে তিনি সপ্তাহে ৩ দিন কাজ করেন। মাসে ৩০০ টাকা ভাড়া । শুক্রবার, বুধবার ও রোববার দোকানে থাকেন। প্রদীপচন্দ্র জানান, ৩০ বছর পূর্বে কাজে নামেন। ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। স্ব-ইচ্ছেই এই পেশা বেছে নেন। সকাল ৮ টায় কাজে বেরোন, বাসায় ফেরেন মাগরিবের আযানের অনেক পরে।
চুল কাটতে নেন ২০ টাকা, দাঁড়ি কামানোতে নেন ১০ টাকা। এছাড়াও মাথা মুড়িয়ে দিতে নেন ২৫-৩০ টাকা। বাসায় গিয়ে চুল-দাঁড়ি কাটতে নেন, ৭০-৮০ টাকা। দরিদ্রদের তিনি কম পয়সায় কাজ করে দেন। অসুখ-বিসুখেও তিনি কাজে বেরোন, কাজের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই।
যারা চুল কাটাতে আসেন তাঁদের আচরণ কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভালো ব্যবহার না হলে কাজকাম করা যায়? যার সাথে যে বয়সের সম্পর্ক সে ভাবেই সম্বোধন করে। ব্যবহারও খারাপ না।’
প্রদীপচন্দ্র ২০১০ সালে বিয়ে করেন লীমা রাণী সরকারকে (২২)। সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনা স্ত্রীই করেন। তাঁদের একটি সন্তান রয়েছে। শ্রী প্রশান্ত কুমার প্রামাণিক (৮) । প্রথম শ্রেণিতে পড়েন। ছেলেকে তিনি কখনোই এই পেশায় আনবেন না বলে জানান। সন্তানকে নিয়ে বড়কিছু স্বপ্ন দেখেন।
শ্রী প্রদীপ চন্দ্র প্রামাণিক জানান, শ্রমিক থেকে ছাত্র সব শ্রেণির লোকজনই আসে তাঁর কাছে। প্রতিদিন œ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় হয়। কাজ বেশি পেলে আয় হয় ৩০০-৩৫০ টাকা। এই কাজের পাশাপাশি তিনি বিঘা চারেক জমিতে সবজি ও শস্য ফলান। দাঁতপুর হিন্দুপাঁড়ায় ওই জমির মধ্যে কাঠা দশেক জমিতে আধা-পাকা বাসায় থাকেন বাবা-দাদার সাথে। একান্নবর্তী পরিবার। বাকি জমিতে ফসলের আবাদ করেন। অন্যের জমি ও বন্ধক নেন। প্রতি হাটের দিনে তার দুপুরের খাবারের খরচ হয় ৩০-৪০ টাকা । এছাড়াও চা পান সিগারেটের খরচ হয় ৪০ -৪৫ টাকা। প্রদীপচন্দ্র বলেন, ‘স্ত্রী ছেলেসহ ৩ জনের খরচ ওতেই চলে যায়। ৫০০ টাকা আমার ইনকাম হলে ১০০০ টাকা খরচ করলে তো চলবে না।’
টাকা জমিয়ে আগে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেন। ভারতের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানসহ বাংলাদেশের টেকনাফ, সিলেট, চিটাগাং সহ অন্যান্য এলাকায় ঘুরেছেন। বিয়ের পর আর তেমন ঘোরা হয় না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ