নাটোরে এক বছরে চার শিশুসহ ৩৩টি হত্যা ও ৩৯টি অস্ত্র উদ্ধার

আপডেট: জানুয়ারি ১, ২০১৮, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

সুফি সান্টু, নাটোর


নাটোরের গুরুদাসপুরে পারিবারিক অথবা পূর্ব বিরোধের জের ধরে শিশুর ওপর নৃশংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি তিন শিশুকে হত্যা করা হয়। নৈতিক অবক্ষয়, পাড়া-প্রতিবেশী, স্বামী-স্ত্রী এমনকি এলাকাভিত্তিক শত্রুতার শিকারও হয়েছে এসব শিশুরা। দু-একটি ঘটনার দ্রুত বিচারের রায় হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
নাটোর জেলা পুলিশ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নাটোরে গত এক বছরে ৩৩টি হত্যা মামলা, এর মধ্যে চারটি শিশু হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। গত বছর এ হত্যা মামলার সংখ্যা ছিল ৪৩টি। এছাড়া ১৭ সালের (নভেম্বর মাস পর্যন্ত) ৩৯টি অস্ত্র এবং মাদক ও চোরাচালান মামলা মামলা হয়েছে দুই হাজার ৪১৬ টি। আর গত এক বছরে অপমৃত্যু মামলা হয়েছে ১৯১টি।
গত ২০ ডিসেম্বর নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বিলশা দাখিল মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী খাদিজা খাতুন প্রতিদিনের মতো বাড়ির পাশে খেলাতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় পরদিন শিশুটির চাচা মোর্শেদ আলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। নিখোঁজের দুই দিন পর বাড়ির পাশের পুকুরে বস্তাবন্দি খাদিজার মৃহদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় খাদিজার বাবা মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে প্রতিবেশী বাদল ভক্তি ও তার স্ত্রী নাজমা বেগম, বাদলের ভাতিজা নজরুল ইসলামসহ ছয় জনকে আসামি করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ওই মামলায় বাদল ভক্তি তার স্ত্রী নাজমা বেগম ও বাদলের ভাতিজা নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়। পুলিশ ধারণা করছে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে খাদিজাকে।
এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর উপজেলার জুমাইনগর মোল্লাবাজার এলাকায় মমতাজ উদ্দিনের দেড় বছরের শিশু আহম্মদ আলী নিখোঁজ হয়। এর দুইদিন পর নিজ বাড়ি থেকে মাত্র তিনশ গজ দূরে ডোবা থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর নিহত শিশুর বাবা বাদী হয়ে চার প্রতিবেশী লিপি খাতুন, মকুল, মজিবর ও কোহিনুরকে আসামি করে আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করলে পুলিশ চারজনকে আটক করে। এছাড়াও চলতি বছরের ৫ মে একই উপজেলার চাঁচকৈড় বাজারপাড়া মহল্লার মোহন কুমার ঘোষের মেয়ে দৃষ্টি ঘোষ নিজ বাড়ির সামনে খেলাধূলার একপর্যায়ে নিখোঁজ হয়। এর পরদিন প্রতিবেশী প্রদীপ সরকারের বাড়ি থেকে শিশুটির বস্তাবন্দি মৃতদেহ ট্যাংকের মধ্যে উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় দৃষ্টির বাবা বাদী হয়ে প্রদীপ সরকার, তার স্ত্রী সন্ধ্যা রানী এবং তাদের ছেলে হৃদয় সরকারকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত তিনজনকে আটক করে পুলিশ।
গুরুদাসপুরের বাসিন্দা মিজানুর রহমান, জালাল উদ্দিন, দীল মোহাম্মদসহ একাধিক এলাকাবাসি জানান, নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা আর লালসার শিকার হয়ে অকালেই প্রাণ হারাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। গুরুদাসপুরে পর পর তিনটি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক শিশু হত্যার ঘটনায় অভিবাবক ও এলাকাবাসির মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভয়ে অনেকে শিশুদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছে। সবার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দূর করতে প্রশাসনের কার্যকরি হস্তক্ষেপ জরুরি।
এ বিষয়ে নাটোর জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, আমরা খুব শঙ্কাময় একটি সময় পার করছি। কোথাও কোনো একটি নৃশংস ঘটনা ঘটলে তার পরপরই একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যে কারণে একইভাবে পরপর অনেকগুলো শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। পাড়া-প্রতিবেশী, স্বামী-স্ত্রী এমনকি এলাকাভিত্তিক শত্রুতার শিকারও হচ্ছে এখন শিশুরা। দু-একটি ঘটনার দ্রুত বিচারের রায় হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। যে কারণে দিন দিন অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।
এ ব্যাপারে নাটোর জজ কোর্টে পিপি অ্যাড. সিরাজুল জানান, শিশু নির্যাতন ও হত্যা তার জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল আছে। দেশের প্রচলিত আইনে হত্যাকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০২ ধারা অনুযায়ী হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তদুপরি অর্থদণ্ড। আর হত্যা চেষ্টায় সর্বনিম্ন শাস্তি ৭-১০ বছর।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচির নাটোরের সিনিয়র জেলা ব্যবস্থাপক আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রায়ই পুলিশকে আমরা মামলা না নেয়া, অভিযোগকে গুরুত্ব না দেয়া, ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা এরকম নানা সন্দেহজনক অবস্থানে দেখতে পায়। পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা পেলে তাদের শুধু বরখাস্ত নয়, দৃষ্টান্ততাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করতে হবে।
অপর এক বেসরকারি সংস্থা শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, গত বছরের সারা দেশে এক থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ২৯ শিশু এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ১৪ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০৮৫ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০১২ সালে ২০৯ জন, ২০১৩ সালে ২১৮, ২০১৪ সালে ৩৬৬ জন এবং ২০১৫ সালে ২৯২ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। গত প্রায় পৌনে চার বছরে সারা দেশে ৭৭৭টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালের এই হার ২০১৪ সালের তুলনায় কিছুটা কম ছিল।