নাটোরে চামড়া শিল্পে নেমে এসেছে বিপর্যয়

আপডেট: আগস্ট ২০, ২০১৯, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

নাটোর প্রতিনিধি


নাটোরে আড়তদারে ঘরে সংগৃহতি চামড়া-সোনার দেশ

নাটোরসহ সারা দেশে চামড়া শিল্পে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ট্যানারী মালিকদের উদাসিনতা, আড়তদারদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করা এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানি বন্ধ করে দেওয়ায়। শুধুমাত্র পুঁজির স্বল্পতার কারণে এ বছর চামড়ার দাম পড়ে গেছে এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বর্তমানে আড়তগুলোতে সরকার নির্ধারিত দামেই কাঁচা চামড়া কেনা বেচা হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানি করা হলে দেশে আবার চামড়া শিল্পে সুদিন ফিরে আসবে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়া বাজার নাটোর শহরের রেলগেট সংলগ্ন আড়ত ঘুরে দেখা যায় , বিভিন্ন জেলা থেকে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা নাটোর আড়তে কাঁচা চামড়া নিয়ে আসছেন। তবে ঢাকা থেকে ট্যানারী মালিক অথবা তাদের কোন প্রতিনিধি এখনো নাটোরে চামড়া ক্রয়ের জন্য আসেন নি। সম্প্রতি সময় নাটোরের চামড়া বাজার বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসার পরে স্থানীয় ভাবে কিছু কিছু লবনজাত করা চামড়া বিক্রি হচ্ছে। এসব গরুর কাঁচা চামড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকা বর্গফুট এবং খাসির চামড়া ২০ থেকে ২৫ টাকা বর্গপুট দরেই কেনা বেছা হচ্ছে।
ট্যনারী মালিকরা সাধারণত ঈদের পরে দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে নাটোর মার্কেট থেকে চামড়া সংগ্রহ শুরু করেন। তবে নাটোরের বড় বড় কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা জানান, নাটোরের বেশিরভাগ আড়তদার বর্তমানে মূলত কমিশন ভিত্তিক চামড়া কেনা বেচা করেন। তারা চামড়া প্রতি একটি কমিশিন পেয়ে থাকেন। সুতরাং লাভ লোকশানের ব্যাপারটি নির্ভর করে যারা চামড়া নিয়ে আসছেন অথবা যারা চামড়া কিনছেন।
এব্যাপারে নাটোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সহ সভাপতি লুৎফর রহমান লাল্টু জানান, সাধারণত ঈদের আগে ট্যানারী মালিকরা তাদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করে দেন। ফলে তাদের পুঁজি সংকট থাকেনা। এ বছর ৫/৬টি ট্যানারী ছাড়া বাকী ট্যানারী মালিকরা নাটোরের কোন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীর পাওনা পরিশোধ করেননি। ফলে পুঁজির অভাবে চামড়ার বাজার পড়ে গেছে। অনেক আড়তদার ও ব্যবসায়ী চামড়া কিনতে পারেননি। ফলে অনেকস্থানে চামড়া নষ্ট হয়েছে।
তিনি আরো জানান, হাজারী ব্যাগ থেকে ট্যানারী অপসারণ করে হেমায়েতপুরে স্থাপনের পরে পরিবেশ দুষণ রোধে ইটিপি প্লান্ট এখনো ঠিকমত কাজ করছেনা। ফলে একমাত্র চীন ছাড়া অন্যান্য দেশের বায়াররা পরিবেশ দুষণের দোহাই দিয়ে চামড়া কিনছেনা। এই সুযোগে চীন ইচ্ছেমত চামড়ার দাম দিচ্ছে। ফলে ট্যানারী মালিকরা রয়েছেন বেকায়দায়। এছাড়া অন্যান্য বছর সরকার স্বল্প সুদে ট্যানারী মালিকদের ঋণ দিয়েছেন। এবছর তা করা হয়নি।
অন্যদিকে ট্যানারী মালিকরা তাদের কারখানা পুনঃস্থাপন করতে গিয়ে অনেকেই পুঁজি সংকটে পড়েছেন। ফলে দোতরফা সংকটে এবছর চামড়া বাজার পড়ে গিয়েছে। এবং কোরবানী দাতা এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার ন্যায্য মূল্য পায়নি। এতিমখানাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ট্যানারী মালিকদের কাছে আমাদের গত ৪ বছরের পাওনা এখনো বাকী পড়ে রয়েছে। এসব টাকা পরিশোধ না করায় আমাদের অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির সুযোগ দিতে হবে।
ব্যবসায়ী মঞ্জুরুল আলম হিরু জানান, এক সময় আমাদের দেশ থেকে ওয়েট ব্লু চামড়া বিদেশে রফতানি করা হতো। তখন বাংলাদেশের ছিল চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য স্বর্ণযুগ। কিন্তু ৯০ এর দশকে ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানি বন্ধ করে দেয়। তখন থেকেই দেশের বিশাল কাঁচা চামড়ার বাজার ট্যানারী মলিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তাদের বেঁধে দেয়া দামের বাইরে আমরা চামড়া কিনতে পারিনা। ফলে চামড়া বাজারে বিপর্যয় নেমে এসছে।
ঈদের পরে গত দুদিন নাটোরের চামড়া আড়ত ঘুরে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রত্যকেই চামড়া কিনে লোকসান করছেন। সরকারি বেধে দেয়া দামে আড়তদাররা চামড়া কিনছেন না। যে চামড়া তারা ৮শ টাকায় কিনেছেন সেটি বিক্রি করতে হচ্ছে ৪শ টাকায়। নাটোরের আড়তগুলোতে সর্বোচ্চ গরুর চামড়া ৩ থেকে ৪শ টাকা এবং খাসির চামড়া ২০/৩০ টাকা করে দাম বলছেন।
মৌসুমী ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা করি। চামড়ার এত কম দাম কোনো সময় দেখিনি। ট্যানারি ও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়েছে। তাদের কাছে সবাই এখন জিম্মি।
নাটোরের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর কাঁচা চামড়া বেচা কেনার কেন্দ্র নাটোর। নাটোর শহরের রেলগেট সংলগ্ন বৈদ্যবেলঘরিয়া এলাকায় রয়েছে শতাধিক চামড়ার আড়ত। এসব আড়তে সমগ্র উত্তরাঞ্চলসহ দক্ষিন ও পুর্ব বাংলা ১৬ থেকে ৩২টি জেলার চামড়া কেনা বেচার জন্য নাটোরে নিয়ে আসা হয়। বিভিন্ন ট্যানারী মালিকরা সমগ্র চামড়ার ৫০ ভাগের বেশি নাটোর থেকে সংগ্রহ করে থাকেন। শুধু মাত্র ঈদ- উল আজহার সময় নাটোরে ৯শ কোটি টাকার অধিক মূল্যের চামড়া কেনা বেচা হয়। কিন্তু এবছর পুঁজি স্বল্পতায় তারা চামড়া ব্যবসা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোর চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নাটোর জেলা সভাপতি শরিফুল ইসলাম জানান, ট্যানারী মালিকরা চামড়ার বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করায় কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা পুঁজি স্বল্পতায় ভুগছে। তাছাড়া আমরা যে চামড়া কিনি লবন দিয়ে প্রক্রিয়াজাত গরু ও মহিষের চামড়া প্রতি দুই থেকে তিন’শ টাকা আরো খরচ হয়। তাছাড়া সরকার কোন চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট কত হবে তা নির্ধারণ করে দেয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা। তবে তিনি স্বীকার করেন, দাম না জেনে কোন কোন মৌসুমি ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা তাদের চামড়া গুদামে প্রক্রিয়াজাত করে দিচ্ছি যাতে তাদের লোকসান করতে না হয়।
চামড়ার দরপতনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও সালমা ট্যানারির মালিক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ট্যানারির মালিকরা পাওনা অর্থ পরিশোধ করছে না, এ কথা ঠিক নয়। ঢালাওভাবে অভিযোগ করাও ঠিক হচ্ছে না। কারণ বেশিরভাগ ট্যানারি আড়তদারদের টাকা দিয়েছে। তারা কম দামে চামড়া কিনছে। আমাদের কাছে বেশি দামেই চামড়া বিক্রি করবে। লবণযুক্ত চামড়া আমাদের এক হাজার টাকার উপরে কিনতে হবে। ১৫ থেকে ২০ দিন পর ট্যানারিগুলো চামড়া কেনা শুরু করবে। যেসব চামড়া ভালো থাকবে তা সরকার নির্ধারিত দামে কিনব।
নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহ মোহাম্মাদ রিয়াজ বলেন, আমরা চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনার আহবান জানিয়েছি। যাতে করে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং নাটোরের চামড়া ব্যবসার যে সুনাম রয়েছে তা অক্ষুন্ন থাকে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ