নাটোরে বর্গ ফুটের বদলে চামড়া কেনা হচ্ছে পিস হিসেবে || ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ মানুষ ও প্রতিষ্ঠান

আপডেট: আগস্ট ১৮, ২০১৯, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

নাটোর প্রতিনিধি


নাটোরে বিক্রির জন্য চামড়া নিয়ে যাচ্ছেন এক মৌসুমি ব্যবসায়ী-সোনার দেশ

নাটোরে কোরবানি পশুর চামড়া পিস হিসেবে ক্রয় করে বিক্রি করেছেন বর্গফুট হিসেবে এমন অভিযোগ উঠেছে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। খাসির চামড়া প্রতিপিস মাত্র ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ টাকায় এবং গরুর চামড়া ২০০ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত পিস বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। চামড়ার দাম অত্যন্ত কম পাওয়ায় মৌসুমী ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা আড়ৎদার ও চামড়া ব্যাবসায়ীদের সিন্ডিকেটকেই দায়ী করছেন। উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম চামড়া বাজারের নাটোরের চামড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটে দিশেহারা বিভিন্ন জেলার চামড়া ব্যবসায়ীরা। এখানে ট্যানারী মালিকদের নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে চামড়া কেনা হলেও ব্যাবসায়ী নেতৃবৃন্দের দাবি ট্যানারী মালিকদের বেঁধে দেয়া দামেই কেনা হচ্ছে চামড়া।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে নাটোর শহরের চকবৈদ্যনাথে চামড়ার আড়ৎগুলোতে আসছে কোরবানির পশুর চামড়া। অন্য জেলার চামড়ার ব্যবসায়ীরা সরকারিভাবে নির্ধারিত দামে চামড়া কিনে নাটোরে আনেন। তবে এখানকার আড়তদারদের দামের কারণে বিপাকে পড়েছেন অন্য জেলার চামড়া ব্যবসায়ীরা। নাটোরের আড়ৎগুলোতে খাসির চামড়া ১০টাকা পিস এবং গরুর চামড়া ৩০০ খেকে ৫০০ টাকায় কেনায় লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ীরা। চামড়ার দাম না পেয়ে বাইরের জেলার অনেক ব্যবসায়ী এখানে চামড়া লবনজাত করে ফিরে যাচ্ছেন। আবার লবনজাত করতে গিয়ে শ্রমিক সংকটে পড়ছেন বাইরের জেলার ব্যবসায়ীরা। নাটোরের প্রায় দেড়’শ আড়ৎ থেকে গত বছর কোবানির পর দেশের ৩২টি জেলার প্রায় ১১ লাখ পিস চামড়া বিক্রি হয়।
নাটোর সদর উপজেলার ভাটোদাঁড়া গ্রামের কোরবানীদাতা মোজাহারুল ইসলাম জানান, তিনি ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকায় কোরবানির জন্য গরু কিনেছিলেন। কোরবানির পর চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ৭শ টাকায়।
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার স্কুল শিক্ষক ওহিদুর রহমান জানান, তিনি ৮৫ হাজার টাকায় গরু কিনে চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ৫শ টাকায়। গতবার এর ধরনের এক পিস চামড়া বিক্রি হয়েছে ১৫শ- ১৮শ টাকায়।
দিঘাপতিয়া পিএন উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি মজিবর রহমান খলিফা জানান, তিনি সাড়ে দশ হাজার টাকায় একটি খাসি কিনে কোরবানি দিয়েছেন। চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ৩০ টাকায়। যা সরকারের বেধেঁ দেয়া বর্তমান বাজার অনুযায়ী বর্গফুট হিসেবে এর দাম হওয়ার কথা দেড়শ থেকে দুইশ টাকা।
শহরের আলাইপুর এলাকার মামুন জানান, তিনি প্রায় দশ হাজার টাকায় খাসি কিনে কোরবানির পর চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ১০ টাকায়। নলডাঙ্গা উপজেলার পাটুল এলাকার অধিবাসী মেহেদী হাসান জানান, তিনি ৭০ হাজার টাকায় গরু কিনে কোরবানির পর চামড়া বিক্রি করেছেন ২শ টাকায়। সদর উপজেলার দিঘাপতিয়া বাজার এলাকার রহিমা বেগম জানান, তিনি খাসি কোরবানির পর চামড়া বিক্রির কাউকে না পেয়ে স্থানীয় মাদ্রাসায় চামড়াটি দান করেছেন।
পার্শবর্তি রফিকুল ইসলাম এবং রুস্তম আলী জানান, তারা সাত ভাগে একটি গরু কোরবানি দিয়েছেন। চামড়া কেনার ব্যাপারী না পাওয়ায় চামড়াটি স্থানীয় মাদ্রাসায় দান করেছেন।
অনেকেই চামড়া বিক্রি করে সেই টাকা মাদ্রাসায় অথবা গরীব মিসকিনদের দান করেন কিন্তু এবার ব্যবসায় অতি লাভ করতে কোরবানিদাতাদের ঠকানো হয়েছে। কোন কোরবানি দাতাই চামড়ার সঠিক দাম পাননি।
নাটোর দিঘাপতিয়া ফজলুল উলুম বহুমুখী ক্বওমী মাদ্রাসার মোহতামিম মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান জানান, গত বছর মাদ্রসাায় ৪৫টি গরুর চামড়া ও ৬৫টি খাসির চামড়া কোরবানিদাতারা দান করেছিলেন। তবে এবারে গরুর চামড়া ১২৫টি এবং খাসির চামড়া ২শতাধিক দান করেছেন স্থানীয় কোরবানিদাতারা।
নাটোরের বাগাতিপাড়া এলাকায় মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী আবদুল আলী জানান, ট্যানারী মালিকরা বিদেশে কম দাম চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পাশাপাশি ট্যানারী স্থানান্তরে অনেক অর্থ ব্যায় হওয়ায় অনেকে চামড়া কিনছেন না। ফলে তাদেরকেও কম দামে চামড়া কিনতে ও বিক্রি করতে হচ্ছে।
কোরবানিদাতা ও স্থানীয় ফড়িয়া, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা আড়ৎদারদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করে বলেন, চামড়া কেনার সিন্ডিকট থাকায় প্রকৃত দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। অথচ সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে পিস হিসেবে চামড়া কিনে লাভবান হচ্ছেন তারা। এমন অবস্থা চলতে থাকলে অনেকেই কোরবানির চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলবেন অথবা নদীতে ভাসিয়ে দেবেন যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের চামড়া শিল্প। এক্ষেত্রে সরকারের আশু পদক্ষেপ জরুরী।
রাজশাহী সদরের আমিনুল ইসলাম জানান, ঈদের দিন নাটোর আড়তে তিনি ১৩০ পিস খাসির চামড়া কিনেছিলেন ৫০ টাকা পিস হিসেবে। পরে বর্গফুট হিসেবে ওই চামড়ার মূল্য হিসেবে তিনি গড়ে ৮০ টাকা করে পেয়েছেন। অপরদিকে তিনি ৫১ পিস গরুর চামড়া কিনেছিলেন ৫শ থেকে ৭শ টাকা পিস হিসেবে। পরে ট্যানারী মালিকদের কাছে তিনি ওই চামড়া বর্গফুট হিসেবে বিক্রি করে গড়ে ৭৫০ টাকা হিসেবে দাম পেয়েছেন।
নাটোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি শরিফুল ইসলাম জানান, ফড়িয়া বা ব্যবসায়ী যে যেভাবেই চামড়া কিনে আনুক না কেন, আড়ত ও ট্যানারী মালিকরা বর্গফুট হিসেবেই চামড়া কেনেন। বর্তমানে খাসির চামড়া ১৫-১৮ টাকা এবং গরুর চামড়া ৪৫-৪৮ টাকা বর্গফুট হিসেবে কেনা-বেচা চলছে।
নাটোর জেলা চামড়া ব্যাবসায়ী গ্রুপের সহ-সভাপতি লুৎফর রহমান জানান, দেশের এই দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার মার্কেট থেকে মোট চামড়ার ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ নাটোর বাজার থেকে সরবরাহ করা হয়। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেশি দামে চামড়া কিনছেন। পরে তারা নাটোর বাজারে বিক্রি করতে এসে লোকসানে পড়ছেন। তবে ট্যানারী মালিকদের টাকা না পাওয়ায় চামড়া কিনতে সমস্যা হচ্ছে।
চামড়ার এই অস্বাভাবিক কম দামের কারণে পথে বসেছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চামড়ার টাকা সহায়তা পাওয়া দরিদ্র মানুষ ও প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি সংশ্লিষ্ট সকলের ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ