নাটোর সুগার মিলের বর্জ্য নদে || মাছসহ জীববৈচিত্র হুমকিতে

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০১৮, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

গুরুদাসপুর প্রতিনিধি


নদীতে ভেসে ওঠা মরা মাছ সংগ্রহ করছে গ্রামবাসি-সোনার দেশ

নাটোর সুগার মিলের বিষাক্ত বর্জ্য নদে ফেলা হয়েছে। বিষাক্ত ওই বর্জ্য নারদ নদ হয়ে নন্দকুঁজা ও গুমাণী নদীতে গিয়ে পড়ছে। ফলে ওইসব নদীর পানিও দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিষক্রিয়ায় মরে ভেসে ওঠছে মাছ। পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নদী সংলগ্ন এলাকার মানুষ।
জানা গেছে, মরে ভেসে ওঠা মাছের মধ্যে রয়েছে ট্যাংরা, পুঁটি, বাইম, বোয়াল, চেলা, গুঁচিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। মাছের সঙ্গে অন্যান্য জলজ প্রাণি, উদ্ভিদও রয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি নাটোর সুগার মিলের বর্জ্য নদী ফেলা শুরু করে। তখন থেকে নদীগুলোর পানি বিষিয়ে ওঠে।
‘চলনবিল নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটি’র গুরুদাসপুর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান জানান, ফিবছরই নদীতে বর্জ্য ফেলা হয়। এবারও একইভাবে নদীতে বর্জ্য ফেলায় নদীর মাছ মরে ভেসে উঠেছে। নদীর পানির রং বদলে গেছে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কিন্তু প্রতিকারের উদ্যোগ নেই। অথচ বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, মৎস্য আইন ও জাতীয় পানি নীতি অনুসারে নদীসহ প্রবহমান জলাভূমি দূষণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
মজিবুর রহমান আরো জানান, নাটোর সুগার মিলের বর্জ্য নাটোর শহরের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত নারোদ নদে ফেলা হয়। নারোদ নদ জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার আহম্মেদপুর এসে শেষ হয়েছে। শেষ থেকেই শুরু হয়েছে নন্দকুঁজা নদী। এই নদীটি গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড় ত্রিমোহনায় (আত্রাই-গুমাণী) শেষ হয়েছে। নারোদ থেকে ওই ত্রিমোহনা পর্যন্ত নদীর দীর্ঘ প্রায় ৪০ কিলোমিটার।
স্থানীয় গুরুদাসপুর বার্তার সম্পাদক সাজেদুর রহমান জানান, গুরুদাসপুর উপজেলার নদীর উজান আহম্মদপুর, হালশা, নাজিরপুর, চাঁচকৈড় এলাকায় নদী এলাকার শতশত মানুষ মরা মাছ ধরতে প্রতিযোগিতা শুরেছে। নারী-পুরুষ, যুবক-শিশু, বৃদ্ধ এমনকী গৃহিণীদেরও মাছ ধরতে দেখা গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলার নাজিরপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নদীর পানি রং বদলে কালো হয়ে গেছে। নদী থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদী এলাকার মানুষ নাক চেপে চলাচল করছে। নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত রানা লাবু জানান, এমনিতে নদীতে আগের মতো মাছ মেলে না। তার ওপর বর্জ্য ফেলায় মাছ শুন্য হয়ে পড়েছে নদী।
একই সঙ্গে নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ায় নদী এলাকার মানুষ গোসল, সেচ, ঘর গৃহস্থকাজে নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না। না বুঝে কেউ পানিতে নামলেও শরীরে চুলকানি হচ্ছে। পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নদী এলাকার মানুষ। তাছাড়া নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহার হওয়ায় কৃষিতেও ছড়িয়ে পড়ছে এর প্রভাব।
গুরুদাসপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা একেএম আবদুল হালিম গতকাল বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে বলেন, নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। ক্ষতিকারক গ্যাসে মাছসহ জীববৈচিত্র ধ্বংস হয়। একই সঙ্গে দ্রুত পানি দুষিত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে মাছ মরে যায়। নদীতে দুষিত বর্জ্য ফেলার বিষয়ে গত বছর উপজেলা সমন্বয় মিটিঙে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু গতি পায় নি। এবারও একই চিত্র দেখা দিয়েছে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় নি। জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ কুমার মুন্সি মুঠোফোনে জানান, কর্মস্থলে নতুন যোগদান করেছেন তিনি। খোঁজ নিয়ে করণীয় ঠিক করবেন।
এ বিষয়ে নাটোর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল্লাহ গতকাল বলেন, সুগার মিলের বর্জ্য পরিশোধনের জন্য নির্ধারিত প্লান্ট রয়েছে। প্লান্টে (ইপিটি) পরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়। এই বর্জ্যে মাছ মরার কথা নয়। ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, বছরের ৩-৪ মাস তাদের কারখানা চালু থাকে। অথচ নাটোরে আরো দুইটি কারখানা (প্রাণ ও যমুনা ডিস্টিলারিজ) রয়েছে। তারাও পরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ