নানুবাড়ির শীতের পিঠা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

মোস্তফা কামাল গাজী ইরফান


আজ খুব খুশি। বার্ষিক পরীক্ষার ছুটি হয়েছে দীর্ঘ পনেরো দিনের। শহরের হাইস্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে ও। মা বলেছেন, আজকে সবাই নানুবাড়ি যাবে। অনেকদিন হলো নানুবাড়ি যাওয়া হয় না। শহরে থেকে নানুবাড়ির কথা মনে পড়লেই মনটা কেমন যেনো আনচান করে ওঠে ওর। যখন-তখন মন চায় গ্রামে ছুটে যেতে। বনবাদাড়, সবুজে ছাওয়া পথ-ঘাটে ছুটোছুটি করতে। নানুদের পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি করতে কিংবা ছোট মামার সঙ্গে পুকুর থেকে বড় বড় মাছ ধরতে। কখনো মন চায় নানুদের বড় পেয়ারা গাছটায় চড়ে বাদুরের মতো ঝুলে পেয়ারা খেতে। কিন্তু মন চাইলেই তো সব হয়ে যায় না! আব্বুর অফিস ছুটি হলে ইরফানের স্কুল থাকে খোলা। আবার ইরফান ছুটি পেলে আব্বুর অফিস থাকে খোলা। এর সঙ্গে থাকে নানান ঝামেলা। এবার দুজনের ছুটি হচ্ছে একসঙ্গে। অন্যকোনো ঝামেলাও নেই। অনেকদিন পর তাই ইরফানের নানুবাড়ি যাওয়ার সাধটা মিটছে। ছুটির ঘণ্টা পড়তেই মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। আনন্দে একরকম লাফাতে লাফাতে বাড়ি পৌঁছুলো ও। মায়ের গলায় ঝুলে জিগ্গেস করলো, ‘আম্মু, কখন যাবো আমরা নানুবাড়ি?’ আম্মু বললেন, ‘এইতো বাবা, বিকেলেই রওনা হবো। তুমি গোসল সেরে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।’ ইরফান দৌড়ে যায় দাদুর কাছে। বলে, ‘দাদু, আমরা নানুবাড়ি যাচ্ছি। তুমি যাবে না আমাদের সঙ্গে?’ দাদু নাতির মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে বললো, ‘নারে দাদুভাই, আমি যেতে পারবো না। হাঁটুতে ব্যথা। ভালোভাবে হাঁটতে পারি না। তোমরাই যাও।’ ইরফান গোসল করতে চলে গেলো। বিকেলে রওনা হলো ওরা। সঙ্গে আছেন মা-বাবা আর আপু। বাগেরহাট জেলায় ইরফানদের নানুবাড়ি। এবার শীতে সব খালা আর মামারা আসছেন সেখানে। খুব খুশি লাগছে ওর। অনেকদিন পর নানা-নানুর সঙ্গে দেখা হবে। মামাতো ভাই-বোনেরা আসবে। ওদের সঙ্গে খেলাধুলা হবে। কত্তো মজাই না হবে! নানুবাড়ি পৌঁছুতে পৌঁছুতে রাত হয়ে গেলো। নানু এসে ইরফানকে কোলে তুলে চুমু দিলেন গালে। কেউ চুমু দিলে ইরফানের বিরক্ত লাগে। একদলা থুথু দিয়ে গাল ভরে যায়। ঘিন ঘিন লাগে। অন্যকেউ চুমু দিলে এতক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেঁচি শুরু করে দিতো। নানু বলে কিচ্ছুুটি বললো না। একহাত দিয়ে কেবল মুছে নিলো গালটা। মামাতো ভাই-বোনেরা আগেই চলে এসেছে। কিছুক্ষণ ওদের সঙ্গে দুষ্টুমি করে আজকের মতো শুয়ে পড়লো ইরফান। সকালে ঘুম ভাঙলো নানাভাইয়ের ডাকে। নানা বললেন, আমরা সবাই খেজুর রস আনতে যাচ্ছি। তুমি যাবে নাকি আমাদের সঙ্গে?’ ইরফান তড়াত করে উঠে বললো, ‘অবশ্যই যাবো, নানাভাই।’ দৌড়ে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে রওনা হলো নানার সঙ্গে। খালাতো, মামাতো ভাই-বোনেরাও যাচ্ছে। খুশির ঝিলিক ঠিকরে পড়ছে যেনো সবার চোখে-মুখে। কুয়াশাঘন সকাল। একটু দূরের কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। পথের পাশে সারি সারি খেজুর গাছ। সবগুলো নানাভাইয়ের। একটি করে মাটির হাড়ি ঝুলছে গাছগুলোতে। ইরফানের কাছে খুবই চমৎকার লাগলো দৃশ্যটি। নানা গাছে চড়ে হাড়ি নামাচ্ছেন। খেজুর গাছ থেকে নল বেয়ে পড়া রস খাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামলো সবাই। জিহ্বা দিয়ে ঝরে পড়া রস খাওয়ার উৎসব চললো কতক্ষণ। এভাবে রস খেতে গিয়ে মামাতো ভাই সাদিক পড়ে গলো কাদায় টইটম্বুর জলাশয়ে। শীতে বেচারা যেনো কাবু হয়ে পড়লো একেবারে। নানুভাই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। অনেকক্ষণ ধরে নানাভাই রস পাড়লেন। রসের হাড়ি মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরলো সবাই। সকালের মিষ্টি রোদে বসে সবাই কাঁচা রস পান করলো একসঙ্গে বসে। কাঁচা রসে এতো স্বাদ, নানুবাড়ি না এলে হয়তো বুঝতেই পারতো না ইরফান। দুপুরে ইরফানরা গেলো ছোট মামার সঙ্গে পুকুর থেকে মাছ ধরতে। জাল ফেলে মামা ধরলেন বড় বড় অনেকগুলো মাছ। মাছধরা শেষ হলে সবাই মিলে পুকুরে অনেক্ষণ ঝাঁপাঝাঁপি করলো। সাঁতার কাটলো মনভরে। বিকেলে সবার সঙ্গে ইরফান গ্রামের বড় মাঠে গেলো খেলতে। পাড়ার অন্য ছেলেমেরাও খেলতে আসছে। ওদের সঙ্গে অল্পতেই ভাব হয়ে গেলো ইরফানের। গোল্লাছুট, বৌছি, ফুলটোকা- গ্রামের এ খেলাগুলো কতদিন হলো খেলে না ও। এবার ছুটিতে এসব খেলে পুষিয়ে নিতে হবে। বৌছি খেলার মাঝখানে ইরফান দেখলো, নানা আর মামা যাচ্ছেন বাজারে। খেলা ফেলে ছুটে চললো নানার পিছু। ওর সঙ্গে অন্য ভাই-বোনেরাও ছুটলো। নানাকে জড়িয়ে ধরে ইরফান বললো, ‘নানা, আমরাও যাবো বাজারে।’ নানা হাসিমুখে বললেন, ‘এটা আবার বলতে হয় নানাভাই? চলো সবাই আনন্দ করতে করতে যাই।’ আজকে অনেক বড় হাট বসেছে। মানুষে গিজগিজ করছে। দেকানিরা খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। নানা আর মামা সদাই কিনলেন ব্যাগভরে। ইরফানরা ঘুরে ঘুরে দেখলো পুরো বাজার। ফেরার সময় নানা সবাইকে মুড়ির মোয়া আর জিলাপি কিনে দিলেন। কতোদিন হলো ইরফানের মুড়ির মোয়া খাওয়া হয় না। পেটপুড়ে খেয়ে নিলো কয়েকটা। বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে নেমে এলো। এসে দেখে নানু আর মামিরা খেজুর রস দিয়ে নানান ধরনের পিঠা বানাচ্ছেন। ভাপাপিঠা, চিতই, দুধচিতই, বড়াপিঠা, পাটিসাপটা, দুধপুলি, ক্ষীরপুলি, চন্দ্রপুলিসহ আরো কতো পিঠা! পিঠার ঘ্রাণে পুরো বাড়ি মৌ মৌ করছে। ইরফানের জিবে জল এসে পড়লো মুহূর্তেই। সবার সঙ্গে বসে পড়লো পিঠা খেতে। আহ! কী সুস্বাদু রসের পিঠা! খেতে খেতে ইরফান ভাবলো, বছরের প্রতিটা দিনই যদি এমন আনন্দের হতো!

Don`t copy text!