নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

আপডেট: আগস্ট ৩, ২০১৯, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

মো. নূরল আলম


স্বাভাবিক গুণ বা বৈশিষ্ট্যরূপে নারী-পুরুষ সব মানুষের মধ্যেই জন্মগতভাবে কিছু ক্ষমতা ও অধিকার বোধ থাকে। জীবন পরিচালনা বা জীবনমান অর্জনের ক্ষেত্রে যখন কোনো নারী বা পুরুষ তার সেই ক্ষমতা বা অধিকার ব্যবহার ও প্রয়োগের জন্য সামর্থ্য ও স্বীকৃতি লাভ করে তখন তাকে ক্ষমতায়ন বলা যায়। অর্থাৎ ব্যক্তির নিজ জীবন সে কীভাবে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করবে তা স্থির করার অধিকার ক্ষমতায়ন প্রত্যয়টির সঙ্গে যুক্ত। ক্ষমতায়নের মাধ্যমে ব্যক্তির ভেতরে আত্মবিশ^াস সৃষ্টি হয় যার দ্বারা সে সমস্যা সমাধানের শিক্ষা ও শক্তি লাভ করে। সে পরনির্ভরশীল না হয়ে স্বনির্ভর হয়। এভাবে একজন নারী বা পুরুষ যখন তার জীবন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মতামত গ্রহণে ক্ষমতার অধিকারী হয় তখন তার ক্ষমতায়ন হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। ক্ষমতায়ন কার্যকর করার জন্য তিনটি পর্যায়কে বিবেচনা করা হয়। যেমন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যক্তির আত্মবিশ^াস ও সামর্থ্যরে বিষয়টি দেখা হয়। দ্বিতীয়ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে কতটা সক্ষম। তৃতীয়ত, ব্যক্তির অন্যদের সাথে মিলিত হয়ে কাজ করার সামর্থ্য। এই ক্ষমতা অর্জন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর সঙ্গে বেঁচে থাকার বিভিন্ন ব্যবস্থা সম্পর্কিত।
নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে তা বুঝাতে হলে দেখতে হয় (ক) সম্পদের ওপর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা, (খ) সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নারী সক্ষম কিনা, (গ) নারী নিজে সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা এবং (ঘ) নারী সরাসরিভাবে উন্নয়ন কর্মকা-ের সুফল ভোগ করছে কিনা। নারীর ক্ষমতায়নকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন- অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে, বাস্তবায়নে, অভিগম্যতায়, নিয়ন্ত্রণে এবং সমতার ভিত্তিতে সুফল ভোগে নারীর পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে শুধু চাকরি বা অন্য কোনো পেশার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ একটি ধারণা হিসেবে মনে করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু বিষয়টির আরও ব্যাপক ব্যাখ্যা রয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রথম ধাপ হলো নারীদের নিজেদের যোগ্যতা ও পছন্দ মত কর্মক্ষেত্র খুঁজে নেয়া ও কাজ করার স্বাধীনতা। এর পর প্রশ্ন দেখা দেয় নারী তার নিজের উপার্জন নিজের ইচ্ছা বা পছন্দ অনুযায়ী ব্যয় করার স্বাধীনতা ভোগ করছে কিনা। এ বিষয় দুটিতে বাংলাদেশে যে সর্বশেষ অবস্থাটি দেখা যায় তা হলো – এ ব্যাপারে লক্ষণীয় অগ্রগতি সত্ত্বেও আমাদের সমাজে এখনও কিছু বাধা বিপত্তি আছে
যার জন্য নারীসমাজের সদস্যরা পছন্দ মাফিক কাজ খুঁজে নেয়া এবং সেখানে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পিতা মাতা বা স্বামীর রক্ষণশীল মনোভাব, বিবাহিত জীবনে সংসারের চাপ ও কর্তব্য পালন এবং অন্যান্য কিছু সমস্যার কারণে নারী কাজ খুঁজে নেয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের মত ততটা গতিশীল হতে পারে না। তবে সাম্প্রতিক কালে এ সমাজ চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীর দ্রুত অগ্রসর এবং পরিবার বা সংসারের অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই নারীকে কর্মমুখি করতে বাধ্য করছে। তাছাড়া উচ্চ শিক্ষা লাভের পর নারী নিজেই কর্মহীন হয়ে সামাজিক সম্মান ও গুরুত্ব অর্জনের বাইরে থাকতে চাচ্ছে না। এটা দেশে নারী শিক্ষা বিস্তারের একটি প্রত্যক্ষ ফল। তাছাড়া বিবাহিত জীবনে নারী তার উপার্জনের অর্থ দ্বারা জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও ছেলেমেয়েদের কল্যাণে ব্যয় করতে ইচ্ছুক থাকে বলেই সে চাকরি ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে চায়। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে।
সমাজতাত্ত্বিকরা বলছেন, নারী যদি কোনো চাকর বা অর্থনৈতিক পেশায় আনুষ্ঠানিকভাবে জড়িত নাও থাকেন, তাহলেও তাকে যদি পরিবারের আয়-ব্যয় সংক্রান্ত কাজে অংশগ্রহণ বা মতামত দেয়ার অধিকার দেয়া হয়, সেক্ষেত্রে সেই অধিকার তার অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মধ্যে পড়ে বলে গণ্য করতে হবে। এজন্য গৃহস্থালি কাজে সার্বক্ষণিক নিযুক্ত নারী পরিবারের ব্যয় নির্ধারণে যে মতামত বা সিদ্ধান্ত প্রদানের অধিকার লাভ করে সেটা তার অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে এককভাবে নারী মুক্তির প্রধান ভিত্তি হিসেবে মনে করা ঠিক নয়। এর সঙ্গে পরিবারিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন যুক্ত হলে কেবল তখনই অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ের গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ঋণ (গরপৎড় পৎবফরঃ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবারের প্রায় ২ কোটি নারী যারা এ যাবত প্রচলিত ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তারা এখন সরকারি, বেসরকারি ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণ করে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে বিনিয়োগ করছেন। ফলমূল ও সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন, মুড়ি তৈরি ইত্যাদি ক্ষুদ্র ব্যবসা ছাড়াও এ ঋণের সাহায্যে দরিদ্র নারীরা নানা ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কর্মকা- পরিচালনা করছেন। ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে দরিদ্র নারীরা তাদের জন্য কর্মসুযোগ সৃষ্টি ও পরিবারের আয় বৃদ্ধি করছেন। এর ফলে অর্থনৈতিক ক্ষমতা বলয়ে নারীদের অন্তর্ভূক্তি বাড়ছে। পুরুষ অধ্যুষিত জায়গাগুলোতে তাদের চলাচল ও বিভিন্ন কাজকর্মে অংশগ্রহণ ক্রমশঃ বাড়ছে। এই নারীরা এখন পরিবারের আয়-ব্যয় সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রদানের অধিকার ভোগ করছেন। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারীদের মতামত ও সিদ্ধান্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ঋণের প্রভাবে দারিদ্র্য হ্রাস এবং নারীর সামাজিক ক্ষমতায়ন আগের তুলনায় এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে ক্ষুদ্র ঋণের অনেক সমালোচনাও রয়েছে। এ ঋণের সুদের হার অনেক বেশি। ঋণ গ্রহীতারা এটা না জেনে ঋণ গ্রহণ করে এবং সুদসহ অনেক বেশি অর্থ পরিশোধে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক কালে দেখা যায়, গ্রামের ও শহরের বস্তিবাসী দরিদ্র নারীরা ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণ করে উৎপাদন ও ব্যবসা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ না করে পরিবারের জন্য ভোগ্য সামগ্রী ক্রয়ে ব্যয় করে। ফলে ক্ষুদ্র ঋণের মৌলিক উদ্দেশ্য অপূর্ণ থাকে। নারীকে সামনে রেখে পরিবারের পুরুষরা এ ঋণের সুবিধা গ্রহণ করে। অনেক সময় হতদরিদ্র নারীকে বাদ দিয়ে কেবল ব্যবসায়িক লাভের জন্য ঋণদানকারীরা এ ঋণের প্রসার ঘটায়। তাছাড়া অবকাঠামোগত অসুবিধার কারণে এ ঋণের প্রকৃত সুফল পাওয়া যায় না এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে এ ঋণের ক্ষেত্রে কেবল আর্থিক লেনদেনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। এসব ক্রুটি ও সমস্যার কারণে নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্র ঋণের ভূমিকা মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
দেশের সকল অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বেও সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত অংশ হচ্ছে নারী। দেশের অংশিদারি উন্নয়নের স্বার্থে সব ক্ষেত্রে পুরুষের মত নারীদের সম অধিকার থাকা প্রয়োজন এ কথাটি আজও পশ্চাদপদ অসচেতন সমাজ মুক্তমনে মেনে নেয় না। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও দেশ পরিচালনার সব ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে নির্ধারক, পরিচালক ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালনের অধিকার। নারী যখন কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়ে দলের যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করে, দলের নীতি নির্ধারণ, গৃহীত নীতিসমূহ বাস্তবায়ন, দল ও প্রয়োজনে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রদান এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ার লক্ষ্যে রাজনৈতিক কার্যকলাপ গ্রহণ করার সাংবিধানিক অধিকার লাভ করে, তখন তার রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হয়েছে বলে মনে করতে হবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দেশ ও সরকার পরিচালনায় নীতি নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের জন্য নারীর মতামত গ্রহণের মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিযায় জাতীয় সংসদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমঅংশিদারিত্ব বাস্তবে না থাকলে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।
এদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের নারীর পারিবারিক জীবনে সমতা, সম অধিকার ও সম মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য নারীর উপযুক্ত ক্ষমতায়ন এখনও গড়ে ওঠেনি। কারণ হলো- একদিকে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার মত যোগ্যতা সম্পন্ন ও আগ্রহী নারীর অভাব, পারিবারিক ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ, নেতিবাচক ধর্মীয় মনোভাব, রক্ষণশীলতা, জাতীয় থেকে স্থানীয় সব পর্যায়ের নির্বাচনে নারীদের মনোনয়ন দান ও দলে নারীকে সম্মানজনক স্থান নির্ধারণ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। অন্যদিকে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেয়ার জন্য আর্থিক অসামর্থ্য, কালো টাকার প্রভাব, পেশিশক্তি, সন্ত্রাস, মৌলবাদী আগ্রাসন ইত্যাদি বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতিতে যোগ দেয়ার জন্য নারীকে উৎসাহিত করে না। এতদসত্ত্বেও বিগত অন্তত দশ বছরে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষ করে স্থানীয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রাম বাংলার দরিদ্র, স্বল্প শিক্ষিত ও স্বল্প অভিজ্ঞতার অধিকারী নারী সমাজ বিপুল উৎসাহে ব্যাপক রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন।
ক্ষমতায়নের ধারণাটি কিছুটা আপেক্ষিক। পরিবারের বাইরে এসে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হলেই নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি পূর্ণতা পায় না। আবার কর্ম বা পেশায় যোগ দিলে সেখানে তার অধিকার ও ক্ষমতা প্রাপ্তির মাত্রার ওপর নির্ভর করে তার ক্ষমতায়নের প্রকৃতি ও মাত্রা। নারী যখন কর্মজীবী হিসেবে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হয় তখন সেক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে, বাস্তবায়নে, অভিগম্যতায়, নিয়ন্ত্রণে এবং সমতার ভিত্তিতে সুফল ভোগে নারীর পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা সেটা অবশ্যই বিবেচ্য বিষয়। আবার রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ, ভোট প্রদান, নির্বাচনে অংশ গ্রহণ, রাজনৈতিক দলে সমতার স্থান অর্জন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার অধিকার কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে তা দেখার বিষয়। এসব ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মধ্যে সমতা না থাকলে বা নারী বৈষম্যের শিকার হলে তার ক্ষমতায়ন ব্যাহত বা ক্ষুণœ হয়। সেজন্যই সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার সাথে মৌলিকভাবে সম্পর্কিত।
২০৩০ সাল নাগাদ বিশ^ব্যাপি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য সমাজ ও দেশের সব পর্যায়ে লিঙ্গ সমতা অর্জন এবং সকল নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনজীবনের সকল স্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ এবং ভূমিসহ সব রকম অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে নারী সমাজের চলমান আন্দোলন ইস্যুটিকে অনেকটা সামনে এনেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ৩০০ টি উন্মুক্ত আসনের মধ্যে নির্বাচিত নারী সংসদের সংখ্যা মাত্র ২২ জন। স্থানীয় সরকার পর্যায়েও নির্বাচিত নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। বিগত তিন দশক পূর্বে নারীর এই অংশগ্রহণ অনেক কম ছিল। সমাজের আধূনিকায়ন ও রাজনৈতিক কর্মকা-ের প্রসারের ফলে রাজনীতির ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশঃ বাড়ছে। এ দেশে নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম করতে হলে যা প্রয়োজন তা হলো- মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি, গণতন্ত্রের নিরন্তর চর্চা, অপরাধমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা- বিশেষ করে নারী শিক্ষার প্রসার এবং রাজনীতিতে নারীর অন্তর্ভুক্তির জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক ও সমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি।
বাংলাদেশে সমাজের অংশিদারি উন্নয়নের স্বার্থে নারীর ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকারের গৃহীত উদ্যোগের ফলে বর্তমানে দেশের শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এমন কী সামরিক বাহিনী এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে নারীরা দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। মাঠ পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকা-েও আগ্রহী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। আশা করা যায়, এরই ধারাবাহিকতায় অদূর ভবিষ্যতে এদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হবে।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি (অব.) প্রাক্তন চেয়ারম্যান, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড