নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন…

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

আশফাকুজ্জামান


প্রায় ২৫ বছর আগে ‘নারীর চোখে বিশ্ব দেখি’এই শিরোনামে বেইজিংয়ে নারী সম্মেলন হয়েছিল। নিঃসন্দেহে বলা যায় এত বছরে নারীর অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। বেইজিং সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল অন্যতম। এর ওপর ভিত্তি করে দেশে মাতৃমৃত্যু কমেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় কন্যাশিশুর অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী। আমাদের সংসদের স্পিকার নারী। স্পিকার আবার বিশ্ব আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। বাংলাদেশের নারীর জন্য এটি একটি বড় অর্জন।
ব্রিটেনে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো গণতন্ত্র। এত বছরে সম্ভবত মার্গারেট থ্যাচার ও থেরেসা মে এ দুজন মাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী। আমেরিকায় আজও কোনো নারী রাষ্ট্রপতি হয়নি। সেখানে বাংলাদেশে গত প্রায় ৩ দশক ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী। ভবিষ্যতে দেশের প্রধান বিচারপতিও হয়তো নারী হবেন। আমরা সেটা দেখতে চাই। এখন দেশের যে কোনো অঞ্চলে গেলে নারীর উন্নয়ন চোখে পড়ে।
এ অঞ্চলের একমাত্র নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনি বাংলাদেশি নারীর সামাজিক উন্নয়নের ব্যাপক প্রশংসা করেন। ১৯৯৩ সালে মানবাধিকার নিয়ে ভিয়েনায় সম্মেলন হয়। এ সম্মেলনে নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
আজ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে প্রায় সব জায়গায় রয়েছেন নারী। নারায়ণগঞ্জের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ শহরের মেয়র নারী। কেউ দয়া করে তাদের এসব জায়গায় আনেন নি। তাঁরা পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করে এখানে এসেছেন। নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে এসেছেন। নারী সম্মেলনের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় আড়াই দশক। বাংলাদেশের নারীরা এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
একদিন এক নারী সাংসদ বলছিলেন, যে ভবিষ্যতে হয়তো পুরুষের এগিয়ে যাওয়ার জন্য সভা সমাবেশ করতে হতে পারে। কারণ তিন এক জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেন যাদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে তাদের অধিকাংশই মেয়ে শিক্ষার্থী।
সেই সত্তরের দশক থেকে নারী সংগঠন, সরকার, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠনগুলো নারী উন্নয়নে ভূমাকা রাখছে। গত প্রায় দুই দশক ধরে গনমাধ্যম বিভিন্নভাবে নারীকে সামনে আনছে। দেশে এখন নারীদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে ইচ্ছে করলে একজন নারী তাঁর মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে নিজের জায়গা করে নিতে পারে।
দেশের স্কুল, কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ক্ষেত্রে মেয়েরা সমান তালে ছেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। পরীক্ষার ফলাফলে গত প্রায় এক দশক ধরে ছেলেদের থেকে মেয়েরা ভালো করছে। নারীরা অধিকাংশ ক্ষত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। নারীরা কাজের প্রতি অনেক নিষ্ঠাবান, দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ও ধৈর্যশীল। অনেকে মনে করেন দেশে প্রচুর সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নারীরা যদি ড্রাইভিং পেশায় আসেন তা হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে।
এমন এক সময় ছিল যখন মেয়েরা গাড়ি চালালে অন্যরা তাকিয়ে থাকত। এখন নারীদের গাড়ি, মোটরসাইকেল চালানো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।দেশের শহরে এখন প্রায় হর হামেশাই নারীরা গাড়ি চালান। মোটরসাইকেল চালন। এটা নিয়ে কারও বিন্দুমাত্র কৌতুহল নেই। মনে হয় এটাই যেন আরও অনেক আগে হওয়ার কথা ছিল।
এখন সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিমান চালনা, পুলিশ, বিডিআর, সাংবাদিকতা, প্যারাস্যুট জাম্পিং, হিমালয়ের চূড়া কোথায় নেই বাংলাদেশের নারী! গত কয়েক দশকে অহংকার করার মতো অর্জন আছে তাদের। এ জন্য কে কি করেছে সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো নারী নিজে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। নারী তাঁর উন্নয়ন ক্ষমতায়নের জন্যই ঘর ছেড়েছেন।
এক সময় নারীর কাজ বলতে রান্না, সেলাই, বিউটি পারলার, কুটির শিল্প, মৃৎশিল্প ইত্যাদি বোঝত। এসব ছিল সনাতনী ধারণা। এটা নারীর মর্যাদা ও যোগ্যতাকে ছোট করে। তবে এখনো অনেক ক্ষেত্রে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে গেছে। তবে সেই দিন এখন আর নেই। নারী এখন সবকিছুকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের যে বিপ্লব ঘটেছে সেটা অনেকটা সম্ভব হয়েছে নারীর অবদানের জন্যই। পোশাক শিল্পে নারীরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্লান্তিহীন কাজ করেন। নারীর এই অগ্রযাত্রা নিরন্তর চলতেই থাকবে। কেউ তাঁকে আর অবদমিত করতে পারবে না। আমাদের রপ্তানি খাতের ৮০ শতাংশের বেশি হলো পোশাক খাত। পোশাক শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশাল অবদান রাখছে। বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে আমরা দ্বিতীয়। পোশাক শিল্পে এই বিস্ময়কর অবদানের ভূমিকা কাদের? এঁরা হলেন আমাদের দেশের নারী। কেউ তাকে পোশাক শিল্পে পাঠাইনি। জীবনের প্রয়োজনে বেঁচে থাকার জন্য তিনি ছুটে এসেছেন।
এত কিছুর পরও নারীর প্রতি প্রতি সহিংসতা হচ্ছে। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহিংসতা আরও বেড়েছে। এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না। তাঁর মতামতের প্রায় কোনো মূল্য দেওয়া হয় না। নারীর সত্যিকার ক্ষমতায়নে আরও অনেক দূর যেতে হবে।
আমাদের বড় সমস্যা হলো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। এ ধরনের মানসিকতা নারীকে অর্ধেক মানুষভাবে। যে কোনো মূল্যে এমন দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতে হবে।
২০১১ সালে বিসিএস (বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস) চারটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিল। তাদের তথ্যে দেখা গেছে-একজন নারী দৈহিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয। অর্থনৈতিক ও মানসিক যে নির্যাতন হতে পারে এটা আগে মানুষ বুঝত না।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে দেশে নারী হত্যা, ধর্ষণসহ অনেক ক্ষেত্রে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু সরকার দেশে একটি নারী বন্ধন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য নিরবধি কাজ করে যাচ্ছে। সবার প্রচেষ্টায় নারীরা এখন উন্নয়ন ও ক্ষমতার দিকে আরও বেশি যাচ্ছেন।
আমাদের সহশিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বালিকা বিদ্যালয়ের মাধ্যমে একজন মেয়েকে যেন বুঝিয়ে দেওয়া না হয় তুমি মেয়ে তোমাকে আলাদা স্কুলে পড়তে হবে। কারও হাত ধরে স্কুলে যেতে হবে। নারী প্রথমে বাবার বাড়িতে, পরে স্বামীর বাড়িতে। শেষে নির্ভরশীল হতে হবে সন্তানের ওপর। জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে হবে এভাবেই। একজন নারীর নিয়তি এমন হতে পারে না। পুষ্টিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। পুষ্টিও অভাবে নারী খর্বাকৃতি হচ্ছে। অপরিণত সন্তান হচ্ছে। মা ও সন্তান দীর্ঘ মেয়াদে অসুস্থ থাকছে। এক সময় প্রতিটি স্কুলে শরীর চর্চা বাধ্যতামূলক ছিল। এখন অধিকাংশ স্কুলেই শরীর চর্চা হয় না।
নারী-পুরুষের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছেন। নারীর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। আগে নারী ঘরমুখি ছিলেন। কেবল টেবিলে বসে কাজ করতেন। এখন ঘর ছেড়ে বাইরে আসছেন। অনেক চ্যালেঞ্জিং কাজ করছেন। চ্যালেঞ্জিং কাজে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। নারীর উন্নয়নে আগে কথা হতো বেশি। এখন কার্যকর আলোচনা হয়। এখন মানুষের ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। কারণ দেশে মেয়েদের প্রায় সব জায়গায় কাজ কারার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
দুই তিন দশক আগেও নারীর ওপর অত্যাচার হলে অনেক নারী বুঝতেই পারতেন না যে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। এখন সে অবস্থা নেই। সে বুঝতে পারে, তাকে নির্যাতন কর হয়েছে। এটাই অগ্রগতি। গত ৩ দশেকে নারীর বহুমাত্রিক উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়নকে ক্ষমতায়নে রূপান্তর করতে হবে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এঁদের মধ্যে প্রায়ই আমরা কয়েকজন ক্ষমতাধর নারীর উদাহরণ দিই। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে সব ক্ষেত্রে সেটি বলার সময় এখনো আসেনি। প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ-তরুণী শ্রম বাজারে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা কতজন?
দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে লাখ লাখ নারী তাদের সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু এখনো দেশে নারীর ক্ষমতায়ন সেভাবে হয়নি। নারী যেদিন আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কেবল সেদিনই বলা যাবে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। অমর্ত্য সেন এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশ নারীরা মানবিক উন্নয়নে বিস্ময়কর সফলতা অর্জন করেছে। তিনি ক্ষমতায়নের কথা বলেননি। কিন্তু এই মানবিক উন্নয়নের জন্য দীর্ঘ দিনের নারী আন্দোলন ও নারী সংগঠনগুলোর ভূমিকা, এনজিও, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সরকারের ইতিবাচক ভাবনা কাজ করছে।
কৃষির প্রায় অধিকাংশ কাজ নারী করেন। কিন্তু কৃষক হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি নেই। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব শ্রেণির নারীদের সম্পদের অধিকারে বৈষম্য রয়েছে। এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।দেশের রাজনীতিতে নারীবান্ধব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি। জরুরি এ জন্য যে ক্ষমতার বদল হলে যেন নারীর উন্নয়ন থেমে না যায়।
ক্ষমতায়ন ও ক্ষমতার মূল শেকড় রাজনীতি। দেশে প্রায় আট কোটির বেশি নারী। এসব নারীর কতজন রাজনীতির সুযোগ পাচ্ছেন? এসব বিষয় গুরুত্বে সঙ্গে ভাবাতে হবে।
বাংলাদেশ যেটা করতে চায় সেটা অত্যন্ত দ্রুত করতে পারে। ইউরোপের প্রজনন হার কমাতে লেগেছিল ২০০ বছর। বাংলাদেশের লেগেছে মাত্র ৩০ বছর। টিকাদানে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এই নারীই তার সন্তানকে টিকা দিতে নিয়েছেন। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে মানসিকভাবে নারীকে ক্ষমতায়ন করতে চাই তাহলে আমরা যেটা পারব ৫ বছরে অন্যরা সেটা করবে ২৫ বছরে। নারীর ক্ষমতায়ন হলো তাঁর স্বাধীনতা। মতামত দেওয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করা। নারীকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করাই হলো নারীর ক্ষমতায়ন। পৃথিবীর সভ্যতায় এই নারী যুগে যুগে অবদান রেখে চলেছেন। নারীর আরও উন্নয়নে ও ক্ষমতায়নে নীতিনির্ধারক, পুরুষ, নারী সবার ভূমিকা রাখতে হবে। নারীর যত সফলতা তা তাঁর নিজেকে অর্জন করতে হয়েছে। জগতের সকল নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন হোক