নারী অধিকার এবং কিছু কথা

আপডেট: মার্চ ১৪, ২০১৮, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


৮ মার্চ আসলে নারী অধিকারের বিষয়ে দেশ জুড়ে র‌্যালি, সভা-সেমিনার সিম্পোজিয়ামসহ নানা আনুষ্ঠানিকতায় মেতে উঠতে দেখা যায়। আর এই আনুষ্ঠানিকতা আঙ্গুলি দিয়ে নির্দেশ করে দেয় নারী এ সমাজের পৃথক একটি জনগোষ্ঠি। নারী এবং পুরুষের এ ধরনের বিভাজন নারীকে মূল ¯্রােতধারার একটি ভিন্ন আবহে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে নারী সমাজে নারীই হয়েই থাকছে। অন্যদিকে মানুষ হিসাবে তার স্বীকৃতিটা গৌণ হয়ে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে। দেশের কথিত সুশীল নামক সমাজে কিছু নারীবাদী নামে সুশীলের আবির্ভাব হেেয়ছেÑ যারা নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, নারী হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। আর এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে নারী পুরুষের পারস্পারিক সৌহার্দ্য কমছে, পারিবারিক বিরোধ বাড়ছে, সমাজে ঘটছে বিবাহ-বিচ্ছেদের মতো ঘটনা। স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের মতো আগের চেয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের হার কয়েকগুণ বেড়েছে। কারণ নারী এবং পুরুষের পারস্পারিক অধিকার বিষয়ক বিষয়টি পারিবারিক দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছে। সমাজে কেন নারীরা নিগ্রহ বা নির্যাতনের কবলে পড়ছে তার মূল কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। নারীর শারীরিক কাঠামোগত বৈশিষ্টতা পুরুষের চাইতে ভিন্ন। নারী এবং পুরুষের দৈহিক শক্তিরও পার্থক্য রয়েছে। এ ধরনের পার্থক্যজনিত কারণে কি একজন নারী নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন? মূল বিষয়টি কিন্তু তা নয়। সমাজে দৈহিক শক্তিশালী প্রভাবশালী হয় না সব সময়। সমাজ যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করার শক্তির উৎসটার স্থল কিন্তু ভিন্ন। কারণ সমাজ নিয়ন্ত্রকরা দৈহিক শক্তির প্রয়োগ করে অন্যের মাধ্যমে। তাই দেখা যায়, সম্পদ এবং অর্থনৈতিক শক্তির বলে যারা বলীয়ান তারাই সমাজের নিয়ন্ত্রক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে হাজার বছর ধরে সামাজিক নীতি-রীতি এবং যে প্রথা প্রচলিত আছে সেই প্রথার কারণে নারীরা সমাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিকতা বা নারীবাদ নিয়ে যারা বিতর্কের ঝড় তুলেন তারাই নারীকে পশ্চাদগামী করছেন। বাংলাদেশে সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে এই বিষয়টি বিচার বিশ্লেষণ সাপেক্ষ ব্যাপার। বেশ কয়েকটি স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় সরকারের নেতৃত্ব নারীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশটির সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দুইজন নারী। তারপরও কেন নারীবান্ধব সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। দুই বছর ওয়ান এলেভেনের সরকার বাদ দিলে দীর্ঘ পচিশ বছর দেশটির মূল দায়িত্ব ছিল নারীদের হাতে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, সংসদের ষ্পিকার সরকার প্রধান নারী। দেশের কিছু কথিত বিদগ্ধ প-িতজন আছেন যারা বলে থাকেন, এই দুই নারী সরকার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর ভর করে। সামাজিক বাস্তবতায় দেখা যায়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বলে যে প্রথাকে আখ্যা দেয়া হচ্ছে তা কি সত্যিই পুরুষতান্ত্রিক? নাকি ক্ষমতা কেন্দ্রীক নিয়ন্ত্রণ? বিষয়টি যদি সম্পুর্ণ পুরুষতান্ত্রিক হয় তাহলে কেন বা কী করে সরকারের প্রধান হিসেবে নারীরা দায়িত্ব পালন করলেন? তন্ত্র বা বাদ দিয়ে সামাজিক সম্প্রতি বা সহাবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করা একটু কষ্টকরÑ কারণ আইন দিয়ে সমাজ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিন্তু পারস্পারিক সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে না। পারস্পারিক সৌহার্দ্য এবং মমত্ব সৃষ্টি করার জন্য মনস্তাত্বিক বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক স্বস্তি গড়ে ওঠে আর্থিক সক্ষমতার মধ্য দিয়ে। তাই মনস্তাত্বিক বিষয়টির সৃষ্টি হয় আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ফলে দেখা যায়, আর্থিকভাবে নারী বা পুরুষ যে কেউ সক্ষম হন সেই নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে এবং সমাজে তাই ঘটছে। সে নারীই হোক আর পুরুষই হোক না কেন সবল দুর্বলের উপর পীড়ন চালায়। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের অসহায়ত্বটাকে হাতিয়ার বানিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। এখানে লিঙ্গ বা জেন্ডার কোনোটাই মূল বিষয় নয়Ñ মূল বিষয় হলো- ক্ষমতা। আর এই ক্ষমতার উৎপত্তি আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। একটা সময় ছিল, এদেশে নারীদেরকে পুরুষরা বিবাহ করার পূর্বে পণ দিতো। যাকে এক কথায় যৌতুক বলা যায়। এই পণপ্রথা দীর্ঘদিন চালু ছিল। তবে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি, কারণ পণগ্রহিতা নারী বিয়ের পর তার পুরুষ স্বামীটির ঘরে চলে আসতো। ওই সময়কার বিবাহিত নারী বিয়ের পর স্বামীর গৃহে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও তার পারিশ্রমিকটা আর্থিক মানদ-ে মূল্যায়িত হতো না। এ ছাড়াও উৎপাদিত পণ্যে তার কোনো অধিকার থাকতো না। ফলে নারীর গ্রহণ করা পণ বা যৌতুকটি জনসম্মুখে আসতো না পরোক্ষভাবেÑ তা স্বামীর সংসারে ব্যয় করা হতো। সময়ের পরির্বতনে নানা কারণে নারীর নির্ভরতা বা বেচে থাকার উপায় বা অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় তার স্বামী নামক পুরুষটি। পুরুষ নারীর জীবনের একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ানোর আরেকটি কারণ নারীর কর্মক্ষেত্র না থাকায় আর কৃষিভিত্তিক ও গৃগস্থালি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নারীর পারিশ্রমিক না থাকায়। আর উৎপাদনের মালিকানা না থাকা। নারীদের শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল না বিধায় তারা দক্ষ মানব সম্পদ হিসাবে সেই সময় গড়ে উঠতে পারেনি। নারী তখন পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই পিতার পরিবার কন্যা সন্তানকে পাত্রস্থ করার জন্য যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে আর সেই থেকে উল্টো যৌতুক প্রথা শুরু হয়। অর্থাৎ কন্যাদায় সারানোর জন্য পিতা যৌতুকের মাধ্যমে কন্যাকে বিয়ে দেন। আর এই যৌতুকটা দাম্পত্য জীবনে নানা কাজে যৌথভাবেই ব্যয়িত হয়েছে। তবে এই যৌতুক বিনা পরিশ্রমে লাভ করার ফলে লোভ বাড়তে থাকে। এক সময় যৌতুক প্রথা সমাজে মহামারি আকারে বিস্তার লাভ করে। যৌতুক পাবার আশায় পুরুষরা নারীদের উপর নানা ধরনের নির্যাতন চালায়। যৌতুক বিষয়টি পারিবারিক দ্বন্দ্বের মূল কারণ হিসেবে দাঁড়ায়। তাছাড়া নারী নির্যাতন যৌতুকের কারণে বাড়তে থাকলে রাষ্ট্র আইন করে তা বন্ধের ব্যবস্থা নেয়। নারী নির্যাতন রোধকল্পে যৌতুকবিরোধেী আইন তৈরি হয়। সরকার নারীদের স্বাবালম্বি করার জন্য কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করে। বিশেষ কোটাধিন নারীরা সরকারি কর্মক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ পায়। সরকারি বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠানে নারীরা চাকরি করছেন। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষকের হার ৬০ ভাগ এর বেশি। নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবালম্বি হওয়ায় সমাজে নিজেদের একটি অবস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছে। বর্তমানে যৌতুক এর বিষয়টি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। অপরদিকে ¯াবালম্বি কতিপয় নারী পুরুষের কাছে নানা কৌশলে যৌতুক দাবি করছে। আর এই দাবি পুরুষেরা পূরন করতে না পারায় তাদের উপর কিছু নারী শ্বেত নির্যাতন চালাচ্ছে। এই নির্যাতনের চিত্রটা নি¤œমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারে বেশি। এ ধরনের নির্যাতনের শিকার পুরুষেরা সমাজ লজ্জার ভয়ে কিছু বলতে পারছে না, তবে এ ধরনের শ্বেত নির্যাতনের সংখ্যা নেহাতই কম না। অপরদিকে নির্যাতিত পুরুষরাই আবার বর্তমানে নারী নির্যাতন নিরোধ আইনের কবলে পড়ছে আর আইনি হয়রানির শিকার হচ্ছে। সমাধিকারের কথা বললে যৌতুকসহ নির্যাতন আইনটি নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয় এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু নারী এবং পুরুষ উভয়েই মানুষ। নারী নির্যাতনের নিরোধকল্পে তৈরি আইনটিও অপপ্রয়োগ হচ্ছে। ফলে অপপ্রয়োগকারী কিছু নারীর কারণে সমাজের বৃহৎ নারীর অংশকে সমাজ ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। নারী নির্যাতন নিরোধ বিষয়ক আইন নিয়ে চটকদার রসালো গল্প তৈরি হচ্ছে। যার জন্য নারীদেরেকেই সামাজিকভাবেই হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়।
সমাধিকার বিষয়টি নারী পুরুষ বা হিজড়া (বর্তমান সরকার তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে) যে কোনো জেন্ডারের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে সম্পদ এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিষয়টি সমান করতে হবে। পিতা মাতার সন্তান হিসাবে নারী, পুরুষ কিংবা হিজড়া যে কেউ হোক না কেন পিতামাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার সবার সমান হওয়া প্রয়োজন। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর সকল সম্পত্তির মালিক তার স্ত্রী এবং স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার সকল সম্পত্তির মালিক তার স্বামী হবে- এ রকম আইন তৈরি করা দরকার। তবে এখানে উল্লেখ থাকতে হবে যে, অন্যত্র বিয়ে করলে আর সম্পত্তির মালিকানা দাবি করতে পারবে না। কারণ স্বামী মারা গেলে তার স্ত্রী সম্পত্তির যে অংশ পায় তাতে করে তার চলে না। ফলে সন্তানদের ওপর নির্ভশীল হতে হয়। অপরদিকে স্বামীর বেলায়ও তদ্রুপ ঘটনা ঘটতে পারে। আর এ ধরনের আইন তৈরি হলে মা-বাবা উভয়ের অবর্তমানে সন্তানেরা সম্পত্তির মালিক হবে। একজনের মৃত্যুর পর সন্তানেরা সম্পত্তির মালিক হতে পারবে না। এর ফলে বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় নারী বা পুরুষের সন্তানের ওপর নির্ভরতা কমবে। নারীকে নারী ভেবে তার অধিকারের কথা ভাবলে শুধু চলবে না, সমাজে মানুষ হিসাবে নারীকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর সকল মানুষের সমাধিকার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। তাই নারীর সমাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সম্পদ এবং সম্পত্তির ওপর নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ মানুষের অধিকার এবং তার প্রায়োগিকতা নিহিত থাকে সম্পদ বা সম্পত্তির মালিকানার ওপর। সম্পদের মালিকানায় অন্যায্যতা রেখে সমাধিকারের বিষয়টি ভাবা ঠিক না।
লেখক :- কলামিস্ট