নার্ভাস ব্রেকডাউনের ৭ লক্ষণ

আপডেট: নভেম্বর ১৪, ২০১৭, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


‘নার্ভাস ব্রেকডাউন’ প্রকৃতপক্ষে মেডিক্যাল টার্ম বা মানসিক অসুস্থতা নয়। কিন্তু এটি উদ্বেগ বা বিষণ্নতার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা নির্দেশ করতে পারে।
মায়ো ক্লিনিকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, নার্ভাস ব্রেকডাউন বা মেন্টাল/ইমোশনাল ব্রেকডাউন হচ্ছে এমন এক অবস্থা যখন কোনো ব্যক্তি প্রবল মানসিক চাপের কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। নার্ভাস ব্রেকডাউনের শারীরিক, মানসিক এবং আবেগীয় সতর্কতামূলক লক্ষণ রয়েছে, কিন্তু আপনি এসব যত স্পষ্ট ভাবছেন তা তেমন নাও হতে পারে।
এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা নার্ভাস ব্রেকডাউনের লক্ষণসমূহের দিকে মনোযোগ দিন- বিশেষ করে, যদি একটির বেশি লক্ষণ দেখা দেয় এবং যদি তা কয়েকদিনের বেশি থাকে। আপনার লক্ষণ সম্পর্কে ডাক্তারকে জানান যাতে আপনি চরম চাপ মোকাবেলা এবং ভালবোধ করা শুরু করতে ডাক্তারের কাছ থেকে সঠিক ধরনের সাহায্য পেতে পারেন।
১. আপনি মনোযোগ দিতে পারেন না : স্বল্পমেয়াদের ক্ষেত্রে, স্ট্রেস বা মানসিক চাপ হরমোন রিলিজ করে আপনার ব্রেইনপাওয়ার বা মস্তিষ্কশক্তি বৃদ্ধি করতে পারে যা মেমোরি স্টোরেজ বা স্মৃতিশক্তি সংরক্ষণাগার উন্নত করে এবং মনোযোগ বৃদ্ধি করে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস মনোযোগ নষ্ট করে এবং কাজের প্রকল্পে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যারা অত্যধিক স্ট্রেস নিয়ে ড্রাইভ করে তাদের দুর্ঘটনা ঘটানোর সম্ভাবনা থাকে। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড মেডিক্যাল সেন্টারের মতে, চরম স্ট্রেসের ক্ষেত্রে অত্যধিক পরিমাণ স্ট্রেস হরমোন করটিসল মেমোরি বা স্মৃতিশক্তির ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে।
২. আপনি খাবার খাওয়া থামাতে পারেন না : স্ট্রেস মস্তিষ্ককে হরমোন রিলিজে প্রণোদিত করে, যেমন- অ্যাড্রিনালাইন হরমোন, যা মাংসপেশীকে ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্সের (জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন নাকি এড়িয়ে যাবেন বিষয়ক প্রতিক্রিয়া) জন্য শক্তি যোগায়। অ্যান্ড্রিনালাইনের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেলে করটিসল শরীরকে খাবার গ্রহণে হারানো শক্তির জায়গায় শক্তি পূরণ করতে বলে। সমস্যা হচ্ছে, এমন কোনো কারণ আপনাকে মানসিক চাপ দিচ্ছে যা শারীরিক কার্যকলাপের সঙ্গে সংযুক্ত নয়, তাতে আপনি মস্তিষ্ক থেকে সংকেত পেতে পারেন যে আপনার শক্তি অর্জনের জন্য কোনো কিছু খাওয়া প্রয়োজন- তখন আসলে আপনার খাওয়ার প্রয়োজন নেই। উচ্চ চর্বি এবং উচ্চ শর্করা সমৃদ্ধ কমফোর্ট ফুড বা সান্ত¡না খাবার মস্তিষ্কে প্লেজার কেমিক্যাল বৃদ্ধি করে আপনাকে সাময়িক ভালোবোধের অনুভূতি দেবে (যেমন- এ কারণে ভয়ানক, অপ্রীতিকর কিংবা খুব খারাপ দিনের পর আপনার মধ্যে আইসক্রিম খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগতে পারে)। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জরিপে পাওয়া যায়, ৩,০০০ প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৪০ শতাংশ লোক ইমোশনাল ইটিং বা আবেগীয় ভোজন করে স্ট্রেস মোকাবেলা করে।
৩. আপনার পাকস্থলী পীড়া দিচ্ছে : পাকস্থলীর ব্যথা এবং খিঁচুনি প্রায়ক্ষেত্রে মানসিক চাপ ও উদ্বেগের শারীরিক প্রকাশ। পেটব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটফোলা, গ্যাস এবং ডায়রিয়া হতে পারে ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোমের উপসর্গ, যার সঙ্গে উদ্বেগের সম্পর্ক আছে, কিন্তু এসবের জন্য উদ্বেগ এককভাবে দায়ী নয়। স্ট্রেস বা মানসিক চাপের প্রতি ইমিউন সিস্টেমের প্রতিক্রিয়ার কারণে ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম বা আইবিএস উত্তেজিত হতে পারে, বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে এখনো গবেষণা করছেন। অ্যানজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেশন অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার মতে, ‘যেকোনো জায়গায় ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ আইবিএস রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, যেমন- সাধারণ অ্যানজাইটি ডিসঅর্ডার বা উদ্বেগ ব্যাধি এবং বিষণ্নতা।’ যদি আপনার মধ্যে আইবিএস টের পান, তাহলে শারীরিক ও মানসিক মুক্তির জন্য ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
৪. ‘আপনাকে কি রকম দেখাচ্ছে’ তা নিয়ে আপনি কেয়ার করেন না : কর্মস্থলে যাওয়ার পথে আপনার শার্টে কফি পড়েছে এবং আপনি শার্টের কফি মুছে কর্মস্থলে রওয়ানা দিলেন। এভাবে হয়তো অন্য আরো উপায়ে নোংরা লুক বা আউটফিট বা সাজসজ্জা নিয়ে কর্মস্থলে হাজির হন। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যে শুধু অলসতাবোধ করছেন, কিন্তু এরকম ‘ডোন্ট কেয়ার’ স্বভাব যা দূর হয় না- তা আরো বেশি মারাত্মক সমস্যার (যেমন- ইমোশনাল ব্রেকডাউন) শুরুতে দেখা দিতে পারে। স্ট্রেস মন ও শরীরকে অত্যধিক খাটায় এবং শক্তির মাত্রা হ্রাস করে। এই ক্লান্তির অনুষঙ্গী হচ্ছে উদাসীনতা। ক্লান্তির মাত্রা বেড়ে গেলে আপনি কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, যেমন- কর্মস্থলের জন্য সাজসজ্জার প্রতি যে নজর দেওয়া উচিত তাতে অনাগ্রহ চলে আসবে। ডাক্তাররাও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ব্যক্তিগত বাহ্যিক রূপ বজায় রাখা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা লোকদের জন্য কঠিন হতে পারে।
৫. আপনি অবনমিত হচ্ছেন বা ঝুলে পড়ছেন : সান ফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির ২০১২ সালের এক গবেষণায় ১১০ জন ছাত্রকে স্লাউচিং বা অবনমিত বা ঝুলে পড়া পিঠের ভঙ্গি করে একটি হলওয়ের করিডোরে হাঁটতে বলা হয় এবং তারপর এ ভঙ্গি ত্যাগ করে স্কিপিং বা দ্রুত হাঁটতে বলা হয়। তাদের সবাই একমত হয় যে, স্লাউচিং তাদের শক্তি হ্রাস করেছে, অন্যদিকে স্কিপিং শক্তি বৃদ্ধি করেছে। যেসব ছাত্ররা সাধারণত বেশি বিষণ্ন ছিল, অবনমিত হওয়ার ফলে তাদের বিষণ্নতা আরো বেড়ে যায়। ত্রুটিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি বিষণ্ন মেজাজের লক্ষণ হতে পারে। কর্মস্থলে আপনার স্বাভাবিক বসার পজিশনের দিকে মনোযোগ দিন। ইচ্ছাকৃতভাবে সিটে সোজা হয়ে বসার ভঙ্গি আপনার আউটলুক বা বাহ্যিক রূপকে প্রভাবিত করবে, আপনার হতাশ ভাবকে লুকাবে এবং এমনকি ইমোশনাল ব্রেকডাউন থেকে আপনাকে রক্ষা করবে।
৬. আপনার নাক গন্ধ অনুভব করছে : যদি আপনার স্বাভাবিক সমস্যাবিহীন নাক মেছো গন্ধ বা অ্যাসিডিক গন্ধ অনুভব করে থাকে, তাহলে আপনার স্ট্রেসের মাত্রাকে সামঞ্জস্য বা নিয়ন্ত্রণ করার সময় হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব উইসকন-ম্যাডিসনের গবেষণায় ডিস্টার্বিং ম্যাটারিয়াল বা উদ্বেগ উদ্দীপক উপাদান (যেমন- গাড়ি দুর্ঘটনা ও যুদ্ধের ছবি বা গ্রন্থ) প্রকাশ করা হয়, এতে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা মস্তিষ্কের ভুল বোঝাবুঝির ফলে প্রতিকূল উপাদান থেকে ভ্রান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ গন্ধ অনুভব করেন। তাদের উদ্বেগ বৃদ্ধি পাওয়াতে গন্ধের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। গবেষকরা সিদ্ধান্তে আসেন যে, খারাপ গন্ধও উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
৭. আপনার ‘খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে’ মনে হয় : আপনি প্রতিনিয়ত কোনো কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন, কিন্তু ঠিক জানেন না কি ঘটতে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে- এরকম অমূলক ভয় প্যারানয়ার অন্তর্ভুক্ত। প্রবল স্ট্রেস স্বাভাবিক উদ্বেগকে অতিক্রম করে নার্ভাস ব্রেকডাউন বা ইমোশনাল ব্রেকডাউনকে প্রণোদিত করতে পারে। চরম প্যারানয়া অনির্ণীত অ্যানজাইটি ডিসঅর্ডার বা উদ্বেগ ব্যাধির লক্ষণ হতে পারে- বিশেষ করে, অমূলক ভয় যদি আপনার কাজ ও সামাজিক জীবনকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করে। উদ্বেগ থেকে মুক্তি ও ভালোবোধের জন্য ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন, যিনি আপনাকে প্রয়োজনীয় ওষুধ বা অন্যান্য চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন। তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট