নিজেদের আধিপাত্য ধরে রাখতেই মরদনায় দুই বছরে চার খুন

আপডেট: নভেম্বর ১৩, ২০১৭, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি


আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসের জনপদ শিবগঞ্জে পৌরসভাধীন মরদনায় পৌরসভার বর্তমান ও সাবেক কাউন্সিলর খাইরুল ইসলাম জেম ও আবদুুস সালাম ও তার ভাই শফিকুল ইসলাম পাশবানের নেতৃত্বে সক্রিয় আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপের সৃষ্টি হওয়া একের পর এক নাশকতা ও সন্ত্রাসী ঘটনায় অতীষ্ঠ এলাকাবাসী। তাদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের কারণে গত দুই বছরে মারা গেছে ৪ জন নিরিহ ব্যক্তি। পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে আরো কয়েকজনকে।
গত ২ বছর আগে অনুষ্ঠিত শিবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনের জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে সাবেক পৌরসভার কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস সালামের সমর্থকদের সঙ্গে বর্তমান কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা খাইরুল আলম জেম ও তার ভাই শফিকুল ইসলাম পাশবানের সমর্থকদের মধ্যে চলে আসছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। নিজেদের ক্ষমতা ও আধিপত্য ধরে রাখতে ঘটে চলেছে একের পর এক সন্ত্রাসী হামালা, লুটপাট অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা। গত ২ বছরে ঘটেছে ৪টি হত্যাকাণ্ড। এমনকি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অর্থের বিনিময়ে নিজের সন্তানকে সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিয়েছেন পিতা। সন্ত্রাসীদের প্রতিহিংসার ষড়যন্ত্রে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় প্রতিবন্ধি জান্নাতীও।
সরেজমিন গিয়ে এলাকার কেউ ভয়ে মুখ খুলতে না চাইলেও পরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নারী পুরুষ জানান, জেম ও সালামের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে ও নিজেকে আরো শক্তিশালী প্রমান করতে সব সময় গোপনে বা প্রকাশ্য তারা সন্ত্রাসী কার্যালাপে ব্যস্ত। উভয় পক্ষই এলাকায় গড়ে তুলেছে নিজস্ব শক্তিশালী বাহিনী। আর এই বাহিনী কাজ করে নেতাদের নির্দেশে। যেমন নির্দেশ তেমন কাজ।
আরো জানা যায়, বছরের পর বছর ধরে মরদানা গ্রামে দুই নেতার আধিপত্য বিস্তারে প্রায় সময় জালাও পোড়াও, বোমাবাজি, মারামারি লেগেই আছে। এতে অন্তত উভয় পক্ষের শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর করে পুড়িয়ে দেয়া হয়। মরদানা গ্রামে দুই গ্রুপের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রয়েছে অসংখ্য মামলা। এসব মামলায় হাতেগোনা কয়েকজন গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে। এর ফলে মরদনায় বন্ধ হচ্ছে না সন্ত্রাস।
সূত্র মতে, গত ২ বছরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে এই মরদনায় নিহত হয়েছে চারজন। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের সকালে প্রতিপক্ষের হামলায় নজরুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৪) নিহত হন। দ্বিতীয় দফায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রতিপক্ষের হামলায় একই এলাকার তেঁতুলিয়া গ্রামের ব্রিজের সামনে গুরুতর আহত হন পানাউল্লাহ্ (৪০)। তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর চলতি বছরের প্রথম দিকে মারা যান তিনি। তৃতীয় দফায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে অর্থের বিনিময়ে আলম হোসেনের মেয়ে প্রতিবন্ধী জান্নাতী খাতুনকে (১৮) ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধে হত্যা করে পাশের আখখেতে মরদেহটি ফেলে রেখে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
সর্বশেষ গত ৩ নভেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে মরদানা গ্রামের ফজলু রহমানের ছেলে তাইফুর রহমান বাড়ির ছাদের উপরে ৩-৪ সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে হাতবোমার তৈরির সময় অসাবধানতা বশতঃ হাতবোমা বিস্ফোরিত হলে বোমার আঘাতে তাইফুরের ডান হাতের কবজি উড়ে যায় এবং মুখমণ্ডল ঝলসে যায়। তাৎক্ষণিক বাড়ির সদস্যরা তাইফুরকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসককে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় মৃত তাইফুরসহ ১৫ জনকে আসামি করে সর্বশেষ শিবগঞ্জ থানায় আরও একটি মামলা দায়ের হয়।
এদিকে দুই গ্রুপের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আর প্রতিবারই একটি পক্ষ আর একটা পক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে বর্তমান কাউন্সিলর খাইরুল আলম জেম তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলি অস্বীকার করে নিজেকে সমাজসেবক দাবি করে বলেন, তিনি সম্পূর্ন নির্দোষ, মুলত সালামের সন্ত্রাসী বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ। তার প্রমান গত পৌরসভা নির্বাচনে পাওয়া গেছে। জনগণ শান্তি পাওয়ার জন্য আমাকে নির্বাচিত করেছেন। আমি আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও জনগনের মাঝে শান্তি ফিরিয়ে আনবো।
তিনি আরো বলেন, আমি নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় চুরি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপকর্ম বন্ধ আছে। তবে সালাম অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এলাকায় আবারো সন্ত্রাসী কার্যাকলাপ ঘটনোর।
এ সময় তিনি দাবি করেন, প্রতিবন্ধি জান্নাতির পিতাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে আমাকে ফাঁসানোর কৌশল হিসেবে জান্নাতীকে হত্যা করে সালামের লোকজন।
আর সর্বশেষ নিহত ব্যাক্তি সালামের অনুগত এবং সে সালামের নির্দেশেই বোমাগুলোর মজুদ করে তা রক্ষানাবেক্ষন করতে গিয়ে নিজেদের বোমায় নিজে মারা গেছে।
অন্যদিকে সাবেক কাউন্সিলর সালামকে তার এলাকায় না পেয়ে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার ফোনটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেয় সম্ভব হয়নি।
অবশ্য স্থানীয় জনসাধারনের দাবি তারা এলাকায় শান্তিতে বসবাস করতে চান। তারা এলাকায় কোন অশান্তি চান না। এলাকাবাসীর দাবি যখনই কোন সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে তখন নিরীহ জনসাধারণ অহেতুক পুলিশি ঝামেলা এড়াতে পালিয়ে থাকেন। রাতের পর রাত কাটাতে হয় আখ খেতসহ বিভিন্ন স্থানে।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাবিবুল ইসলাম হাবিব জানান, তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এলাকাটি শান্তিপূর্ণই ছিল। আর সর্বশেষ ঘটনায় নিহত ব্যাক্তি একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছিল। সে নিজেরে মজুদ করা বোমায় নিজেই মারা গেছে। পুলিশ সবর্দা তৎপর রয়েছে। সন্ত্রাসীরা যে দলের হোক এ ব্যাপাওে কাউকেই কোন ছাড় দেয়া হবে না।