নিরলস উন্নয়নের চাকা ঘোরাচ্ছেন নারীরা

আপডেট: এপ্রিল ২৪, ২০১৭, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক



চার বছর ধরে সেতারা খাতুনের মা বিছানায় পড়েছেন, বাবা মারা গেছেন আরো এক বছর আগে। ছোট তিন ভাই-বোন নিয়ে পুরো পরিবার ডুবতে বসেছিল।  সেখান থেকে শুধু টেনে তোলেননি, পুরো সংসার টেনে যাচ্ছেন সেতারা।
সেতারার মতো শ্রমজীবী নারীরা পরিবার ছাড়াও দেশের অর্থনীতি টেনে তুলতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন। নিরলস ঘুরাচ্ছেন উন্নয়নের চাকা। অর্থনীতিতে অতিদ্রুত বিশেষ করে চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে প্রশংসিতভাবে। গত কয়েক বছর ধরেই সামগ্রিক অর্থনীতিতে নারীর অবদান ঊর্ধ্বমুখী। দেশে বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস পোশাকশিল্প, হিমায়িত চিংড়ি, চামড়া, হস্তশিল্পজাত দ্রব্য, চা শিল্পসহ অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি নারী জড়িত। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বেড়েই চলেছে।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে নারীর অগ্রগতির এসব বিষয় উঠে আসছে। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আট লাখ ৪৯ হাজার নারী দিনমজুর রয়েছেন। কিন্তু তারা পুরুষের সমান কাজ করেও মজুরি কম পান।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ধারাবাহিকভাবে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে দেশের মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০০২-০৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ২৬ দশমিক ১ শতাংশ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে হয় ২৯ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১১-১২ অর্থবছরে হয় ৩৯.১ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৬ সালের হিসেবে তা ৪০ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন সমীক্ষার তথ্য মতে, গৃহস্থালি কর্মকা- ছাড়া বর্তমানে দেশে এক কোটি ৬২ লাখ নারী কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন। কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতে নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টি স্বীকৃত হলেও বিপুল সংখ্যক নারী বিনা পারিশ্রমিকে ঘরে শ্রম দেন।
ব্যুরোর তথ্য মতে, কৃষি, শিল্প ও সেবা- অর্থনীতির বৃহত্তর এই তিন খাতে বর্তমানে ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কাজ করছেন। অর্থনীতিতে নারীর আরেকটি বড় সাফল্য হলো, উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। মূলধারার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃত উৎপাদন খাতের মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই এখন নারী। এ খাতে ৫০ লাখ ১৫ হাজার নারী-পুরুষ কাজ করেন। তাদের মধ্যে নারী ২২ লাখ ১৭ হাজার। তবে নারী কর্মীদের সিংহভাগই শ্রমজীবী। বাকিদের মধ্যে কেউ উদ্যোক্তা, কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ নির্বাহী ও উচ্চপদেও দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা।
শ্রম সংক্রান্ত পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, বর্তমানে কৃষি খাতে নিয়োজিত আছেন ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী। এ ছাড়া শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করেন যথাক্রমে ৪০ লাখ ৯০ হাজার এবং ৩৭ লাখ নারী। সংস্থাটির হিসাবে, বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ নারী-পুরুষ কোনো না কোনোভাবে কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন। উল্লেখ্য, সপ্তাহে কমপক্ষে এক ঘণ্টা কাজ করেন এমন ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে ধরা হয় না।
শিক্ষক, নির্মাণকর্মী, বিজ্ঞানী, ব্যাংকার, উদ্যোক্তা, শিল্পী, গণমাধ্যমকর্মী- প্রায় সব পেশাই বেছে নিচ্ছেন নারীরা। এমনকি এখন পেশা হিসেবে গৃহকর্মকেও বেছে নিচ্ছেন তারা। ব্যুরোর সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে ৯ লাখ নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বিনোদন ও শিল্পকর্মেই জড়িত আছেন প্রায় ৯ হাজার নারী। এ ছাড়া ব্যাংক-বিমার মতো আর্থিক খাতে কাজ করেন ৭০ হাজার নারী। আর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন সাড়ে ছয় লাখ নারী। সেবা ও শিল্প খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রায় পাঁচ হাজার নারী দায়িত্ব পালন করছেন। সব মিলিয়ে দেশের প্রায় সব সেক্টরেই নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. আবুল বারকাত রাইজিংবিডিকে বলেন, একটু খেয়াল করলেই প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ে। তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেই দেখা যায় যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী সক্রিয় রয়েছে।
তিনি বলেন, গৃহস্থালি কাজে নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, যার  আর্থিক মূল্যমান দুই লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। জিডিপিতে এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে নারীর হিস্যা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। কিন্তু বিষয়গুলোর স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক সব পেশারও স্বীকৃতি প্রয়োজন। তাহলে উন্নয়ন পরিকল্পনাও নারীদের বিষয়টি সরাসরি মাথায় রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে নারীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও কম নয়। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দেশের প্রধান খাত পোশাকশিল্পে কর্মরতদের প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী। প্রায় ২৫ লাখ নারী এ খাতে কর্মরত।
বাংলাদেশ ফেডারেশন অব উইমেন এন্ট্রাপ্রেনার্স এর চেয়ারম্যার রোকেয়া আফজাল রহমান বলেন, একজন সফল উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী কিংবা পেশাজীবী হিসেবে সফল হতে হলে দুটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হয়। প্রথমত, কঠোর পরিশ্রম এবং দ্বিতীয়ত মানুষের সঙ্গে ভাল ব্যবহার। এ ছাড়া রয়েছে, দায়িত্বশীল হওয়া। নারীরা এ সব বিষয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ দিয়েছে এরই মধ্যে।
তিনি বলেন, নারীর এসব অগ্রগতি হয়েছে মূলত নারীর শিক্ষার হার বাড়ার পাশাপাশি পোশাকশিল্প ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধিক হারে নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কারণে। তবে এখনো নারীরা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি বঞ্চিতও হচ্ছে। এ জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর অংশগ্রহণ আরো বাড়ানো উচিৎ। রাইজিংবিডি