নিরাপত্তা পরিষদের হতাশ করা সিদ্ধান্ত || আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদই উৎসাহিত হল

আপডেট: নভেম্বর ৯, ২০১৭, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

রোহিঙ্গা সঙ্কটের অবসানে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সোমবার নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব পাসের উদ্যোগ নিলেও মিয়ানমারের দুই মিত্র দেশ ভেটো ক্ষমতার অধিকারী রাশিয়া ও চিনের কারণে তা শেষ পর্যন্ত বাদ দেয়া হয়। অর্থাৎ মায়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপের যে দাবি বিশ্বব্যাপি উঠেছিল তা নিরাপত্তা পরিষদে নাকচ হয়ে গেল। এর বদলে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতভাবে একটি বিবৃতি দেয়, যেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ামার সেনাবাহিনীর বলপ্রয়োগ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
নিরাপত্তা পরিষদ বিবৃতি প্রদানের ক্ষেত্রেও অধিক সতর্কতা দেখিয়েছে। তারা মিয়ানমারের উদ্দেশে কঠিন কোনো ভাষাও ব্যবহার করেনি। বিবৃতিতে মায়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়টিকে শুধু মাত্র ‘উদ্বেগ ও বলপ্রয়োগ বন্ধ করার’ আহবান জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে।
সন্দেহ নেই নিরাপত্তা পরিষদের এই সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক বোধ সম্পন্ন বিশ্বের সকল মানুষকে হতাশ ও মর্মাহত করেছে। ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য উন্নত দেশগুলো নিজেরা যেমন মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তেমনি আবার অন্যদের মানবাধিকার লঙ্ঘনে উৎসাহিতও করে। নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে মায়ানমার যারপরনাই খুশি। অর্থাৎ ছয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু করে, তাদের হতা ও ধর্ষণ করে, তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে সম্পদ লুট করে কোনো অন্যায় করেনি সেটাই প্রমাণিত হলো?
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যার সুদূর প্রসারি প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্যই তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকেই আন্তর্জাতিক জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে ভেটোদাতা দেশ রাশিয়া, চিন সহ সব দেশেই এর কালো ছায়া পড়বেÑ যা পৃথিবীর অস্থিরতার বড় কারণ হতে পারে।
রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়া হলেও এতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকসহ সার্বিকভাবে বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ। স্থানীয় নাগরিকরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছেন। দিন দিন পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জরুরি। কেননা, এভাবে চলতে থাকলে একপর্যায়ে দেশ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। এই নিরাপত্তা ঝুঁকি পর্যায়ক্রমে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে যাবে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এর সুযোগ নেয়ার জন্য তৎপরতাও শুরু করেছে৷ ৯০-এর দশকে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে, তারা রাজনীতিতে জড়িয়েছে৷ তারা জামায়াতের রাজনীতির অনুসারী হয়েছে৷আর জামায়াতের সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সম্পর্ক সকলেই জানে।
বাংলাদেশ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থেকেই এটা সম্ভব হচ্ছে। পাকিস্তানসহ অনেক দেশই জঙ্গিদের ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান মেনে নিতে পারছে না। তারা রোহিঙ্গাদের ওপর ভর করে আবারো জঙ্গি বিস্তারের কাজটি করতে চায়। রোহিঙ্গা সমস্যা বিলম্বিত হলে তাদের জন্য বিষয়টি সহজ হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে ভারতও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা উভয় দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয় খাল কেটে কুমির আনার সর্বনেশে কাজ কারুরই প্রত্যাশা নয়। প্রথমেই আঞ্চলিক সহযোগিতার বন্ধনটা খুবই দৃঢ় হওয়া বাঞ্ছনীয়। তারপর সম্মিলিতভাবেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য কাজ করে যেতে হবে। এবং সেটি এখনই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ