নির্বাচনের বছর, পরিকল্পিত কর্মসূচি চাই

আপডেট: জানুয়ারি ৯, ২০১৮, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


প্রচার মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ২০১৮ নির্বাচনের বছর। এ বছর সিটি কর্পোরেশনসহ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের শেষপাদে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছেন। জয়ী হয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী। কেনো এই পরাজয়, সেটা নিশ্চয়ই দলের নেতৃবৃন্দ মূল্যায়ন করেছেন। জনসাধারণও তাদের ভোট প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে সেটা মূল্যায়ন করেছেন। অবশ্য এলাকা, ব্যক্তিত্ব, দলের ও সরকারের কার্যক্রম, কথাবার্তা ইত্যাদি নানা বিষয়ে ভোটাররা চিন্তা করে। ভেবে তাদের সমর্থন ব্যালটে প্রতিফলিত করে। রংপুরের ক্ষেত্রেও সে রকমটি হয়েছে। অনেকেই বলবেন, রংপুর জেনারেল এরশাদের এলাকা। সেখানে তার প্রভাব বেশি। কথাটা সর্বতো সঠিক নয়। প্রার্থীও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আওয়ামী লীগ গুরুত্বহীন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রার্থী করে ভুল করেছে বলে আবার অনেকেই অভিমত প্রকাশ করেছেন। সামনে আরো সিটি নির্বাচন আসছে। আসছে জাতীয় নির্বাচন। সে ক্ষেত্রে প্রার্থী মনোনয়ন করতে ভুল করবে দল। তাই মাঠ পর্যালোচনার আলোকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া আবশ্যিক। অবশ্য এ কথাও ঠিক, যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, তিনি যে সবার প্রিয় এমন দাবিও ঠিক নয়। কোনো না কোনোভাবে প্রার্থী কারো না কারো বিরাগভাজন হবেই। তবে অধিক মানুষের সমর্থনযোগ্য এবং সংসদে অবস্থানকালে যার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল কম ওঠে, তাকে মনোনয়ন দেয়া হলে হয়তো পরাজয় এড়ানো যাবে।
এ কথা ঠিক যে, যে কেউ যে কোনো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভুল-ভ্রান্তি করতেই পারেন। যিনি কাজ করেন, তিনি ভুল করতেই পারেন। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে যদি কেউ দুর্নীতি-অনিয়ম আর অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হন, তাহলে তাকে কখনোই জনগণ সমর্থন দেবে না। এতোদিনের অভিজ্ঞতা সে তথ্যই সরবরাহ করে। মনে রাখতে হবে প্রতিপক্ষ রাজনীতিকভাবে দুর্বল নয়। তাদের পক্ষে স্বাধীনতা বিরোধী সকল ব্যক্তি ও দল ঐক্যবদ্ধ। তারা দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশেও তৎপর। নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তার একটি দৃষ্টান্ত রোহিঙ্গা আগমন। এখানেও স্বাধীনতা বিরোধী চক্র যুক্ত। ওদিকে আসাম থেকে বাঙালি খেদাও ঘোষণা আরেক সংকটের সৃষ্টি করতে পারে। আসাম সরকার বা কোনো দল বাঙালি খেদাওয়ের নামে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন-উৎপীড়ন শুরু করে তারাও কোন্ ফাঁকে এসে বাংলাদেশেই আশ্রয় খুঁজবে। একে তো বাংলাদেশ জনবহুল একটি দেশ। সেই দেশে দুই দেশের উদ্বাস্তুদের আশ্রয়দান কতোটা সহনশীল হবে, যারা দেশ পরিচালনা করছেন, তারা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন। বিধায়, সুতরাং মিত্রতার একটা সীমানা মানসিকভাবে গড়তে হবে। সে সীমানা লঙ্ঘন করলে ক্ষতিটা দলীয় নেতাদের না হলেও সাধারণ মানুষের চূড়ান্তভাবে হবে। বৃদ্ধি পাবে দ্রব্যমূল্য, সৃষ্টি হবে শান্তি-শৃঙ্খলা আর উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। আর এ রকম পবিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে স্বাধীনতা বিরোধীরা নানা আঙ্গিকে ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছে। সে কারণেই তারা ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচার করতে উদ্যেত হয়েছিলো। অবশ্য তার আগে বা পরে আরো কতো ট্রাক পাচার করেছে, সেটা এ দেশের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের সদস্যরা ভালো জানেন। অথবা তারাও জানেন না। তবে এ রকম একাধিক সংকট বাংলাদেশের দিকে আসতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন। তাই এই ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান গ্রহণ আবশ্যিক।
অনেক ক্ষমতাবান নেতা সরকারি দলের দ-মু-ের কর্তা। তারাও অনেকে স্বাধীনতা বিরোধী ঘরাণার। মুখে যা-ই বলুক না কেনো তারা, অন্তরে সে বিষবৃদ্ধের বীজ বহন করছে। তারা ভূমি দখল, ঘুস-দুর্নীতির সঙ্গে এতোটাই যুক্ত যে তাদের নিয়ে ভোট সংগ্রহের প্রচারণার অর্থই দলকে রসাতলে পাঠানোর সমতুল্য। তারা সরকারি দলে আশ্রয় নিয়েছে দলটার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার লক্ষ্যে। তারা অপরাধ-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অর্থ সরকারি দলের বিরুদ্ধে জনমত সংগ্রহে সুবিধা নেয়া। আর সেই সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যেই তারা নানা রকম দুষ্কর্ম নির্বিবাদে করছে। এদের নিয়ে ভোট ভিক্ষা করতে গেলেই প্রার্থী ভোটার হারাবে। গত সিটি নির্বাচনে যে যে কারণে সরকারি দলের মেয়র পদে পরাজিত হয়েছে, এটা তারমধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ। তাদের অশোভন আচরণ, দুষ্কর্ম আর নেতার পদে অভিষিক্ত করাটা দলের ত্যাগী নেতা-কর্মী ভালো চোখে দেখেনি। তাই তারা নির্বাচনের সকল কার্যক্রম থেকে দূরে সরে গেছেন, কেউ কেউ ভোট দিতেও কেন্দ্রে যাননি। এই বাস্তবতা মাঠ পর্যায়ে প্রচার রয়েছে। এখনো অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থক-কর্মী এই পুনর্বাসিতদের খবরদারি পছন্দ করছেন না। তারা দূরে দূরে থাকছেন। দলের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের কাছে যেতে হবে প্রার্থীকে। দল ক্ষমতায় না এলে দেশে কি বিপর্যয় ঘটবে, সে সম্পর্কে ধারণাও দিতে হবে। ১৪ দলীয় জোট পুনঃনির্বাচিত না হলে যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় আসবে, তারা দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি থামিয়ে দেবে। একাত্তরের কায়দায় রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে। গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীলতার সমস্ত অবকাঠামো ভেঙে পাকিস্তানি কায়দায় জঙ্গি-সন্ত্রাসী সংগঠন তৈরি করবে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ওপর চলবে নির্যাতনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সশস্ত্র কর্মসূচি। একাত্তর আর পঁচাত্তরের ঘাতকেরা হবে দেশের রাজা, উজির-নাজির। অবশ্য আমাদের মতো অতিসাধারণ প্রান্তিক মানুষ এ বিষয়ে যে রকম অনুমান করি, তা যথার্থ না-ও হতে পারে। কিন্তু ২০০১-এর নির্বাচনের পর দেশবাসীর যে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা, তাতে উপরোক্ত আশঙ্কা অমূলক নাও হতে পারে। এ পর্যন্ত তারা মানবতা ও শান্তি বিরোধী যে সব কাজ করেছে, তার খতিয়ান নিশ্চয়ই ইতিহাস ধারণ করবে। দেশবাসীও বিস্মৃত হয়নি। কোনোদিনই ইতিহাসের তথ্য মুছে ফেলা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ইংরেজরা ক্ষমতা দখল করে নবাব সিরাজের জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধেও নানা অপ-প্রচারে লিপ্ত হয়। কিন্তু তারা শেষ রক্ষা করতে পারেনি। শত বছর পর হলেও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মশাই সত্য উদ্ঘাটন করে ইংরেজদের মিথ্যেচারের জবাব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধেও স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপিও নানা মিথ্যেচার লিপ্ত হয়। আজও তা অব্যাহত রয়েছে। যেমন বেগম জিয়া শহিদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তারেক রহমান বলেছে, ‘জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক এবং বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট।’ কী হলো এই মিথ্যেচারের? গত মাসে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ জাতিসংঘের ইউনেস্কো ভাষণটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দান করেছে। জিয়া কি একবারও মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরির অবদান রেখেছিলেন? তিনি বরং পাকিস্তানের পক্ষে দালালি করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ^াসঘাতক খোন্দকার মোস্তাকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। সেটা প্রকাশ হওয়ায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন তাদের বিশেষ নজরে রেখে ক্ষমতা হ্রাস করেছিলেন। অন্যদিকে তারেকের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ-সম্পদ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত চলছে। সৌদি আবরসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ তারেকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। তাতে তার নামে বিলাসবহুল মার্কেট, অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য মিলেছে। জিয়া অর্ফানেজের অর্থ আত্মাসাতের মামলা মা-ছেলে দুজনের বিরুদ্ধে চলছে। খুব শিগগিরই সেই মামলার রায় হতে পারে। আদালতই প্রমাণ করবে সত্যটা কী। যদিও বিএনপি বলছে, এ সব ষড়যন্ত্রমূলক মামলা। সাজানো অভিযোগ। জিয়া পরিবারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতেই এ সব করছে সরকার। আসলেই কি তাই? তারা ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভাঙা সুটকেস পুঁজি করে এতো সম্পদের মালিক কী করে হলো? লন্ডনের মতো শহরে বিলাসবহুল বাড়িতে কী করে বছরের পর বছর বাস করছে তারেক? তার মাদকাসক্ত ছোটভাই যে অর্থ পাচার করেছিলো, তার কিছু তো দেশে ফেরৎ আনা হয়েছে। তাহলে কী প্রমাণিত হয়? প্রমাণিত হয়, তারা অর্থ-সম্পদ দু-ই বিদেশে পাচার করেছে। সেই টাকায় তারেক লন্ডনে বিলাসবহুল বাড়িতে আরামে বাস করছে। এটাই সত্য বলে জনগণ জানে। তাহলে তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়া কি ঠিক? ঠিক কি তাদের ভোট দেয়া। দিলে দেশ উন্নয়নের যে সোপানে উঠেছে, তা নি¤œগামী হবে। আবার সন্ত্রাস-জঙ্গিপনা বৃদ্ধি পাবে। দেশটাই হবে জঙ্গি-সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য। বিধায় এ সম্পর্কে সরকারকেও সঠিক ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিকল্পিত কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। কর্মীদেরও সংযত ও নমনীয় আচরণে অভ্যস্থ করতে হবে। দলের নেতারা কোনোভাবে অভিযুক্ত হলে সেটার বিরুদ্ধেও দলীয় বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে হবে। তবেই দেশবাসীর আস্থা অর্জন সম্ভব। আর এই মুহুর্তে বিএনপিকে নিয়ে ভাবার কিছু নেই। তবে প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভাবাও ঠিক হবে না। কিন্তু তাদের ভুল-ভ্রান্তি এবং দেশপ্রেমহীনতাকে নিয়ে পরামর্শ কিংবা বিতর্ক করার কিছু নেই। তারা এমনিতে সাংগঠনিকভোবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেশপ্রেম বলতে জনগণ যা বোঝে, তার ধারে-কাছেও বিএনপি নেই। তারা কেবল ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই নানা রকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। ভুল-ভাল বকছে। আর এ করেই তারা ক্রমান্বয়ে মুসলিম লীগের মতো নামে থাকলেও তাদের অস্তিত্ব আর দৃশ্যমান হবে না। সে আলামত ক্রমান্বয়েই দৃশ্যমান হবে। অপেক্ষা করুন। নিজের ভিটেয় আলো জ¦ালান। অন্যের ত্রুটি ধরে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। জনগণকেই সেটা ভাবতে দিন। কারণ নির্বাচনে জনগণই রায় দেবে। তাদের ভালো-মন্দ ও কল্যাণের চিন্তা করুন। সাফল্য আপনাদের দুয়ারে কড়া নাড়বে।