নির্বাচন নিয়ে কথা

আপডেট: January 21, 2020, 12:11 am

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়ে গেছে। বিএনপি জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বলে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে। তবে এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টি অধিকাংশ আসনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো বিরোধী দলে কে থাকবে? বিরোধী দল তো একটি থাকতেই হবে, তা না হলে গণতন্ত্রেও কোনো অর্থই হয় না। এ ব্যাপারে দেন দরবার চলতে লাগলো বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গে। তাঁকে বিরোধী দলের নেত্রী বানানোর চিন্তা-ভাবনার কথা তাঁকে জানানো হলো। আর অসুস্থতার অজুহাতে এরশাদ সাহেব এর জায়গা হলো সিএমএইচের কেবিনে। বেগম রওশন এরশাদ অন্যান্য নেতাদের পরামর্শে বিরোধী দলের নেতার পদ গ্রহণে আগ্রহী হলেন। অন্যদিকে এরশাদ সাহেব তাঁর দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলে, অধিকাংশ প্রার্থীই তা প্রত্যাহার করে নেন। তবে গুটিকতক প্রার্থী তাঁদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন নি। এমন কি, এরশাদ সাহেব নিজেও তাঁর প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন নি। যার ফলে দলের মধ্যে এক বিশঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। যা হোক, হরতাল, অবরোধ, ভাঙ্গচুর, জ্বালাও, পোড়াও’র মধ্য দিয়ে ৫ জানুয়ারি, ২০১৪ দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়ে গেল। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে আনন্দমুখর পরিবেশ ও উৎসাহ উদ্দীপনা তেমন একটা দেখা যায়নি। ভোটার উপস্থিতিও ছিল অত্যন্ত কম। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩৫ বা ৩৬ শতাংশ। তবে বিরোধী দলীয় জোটের মতে এই ভোটার উপস্থিতি ছিল একেবারে কম। এক তরফা নির্বাচন হলে তো ভোটার উপস্থিতি কম হবেই। ফলাফল প্রকাশ হলো। দেখা গেলো ১৫৩ জন প্রার্থী অর্থাৎ মেজরিটি সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন, যা কোনোক্রামেই কাম্য ছিল না। তাঁরা কোনো ভোট না পেয়েই নির্বাচিত হয়ে গেলেন। এদিক থেকে এ নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ হলেও তা ছিল সংবিধান সম্মত। আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি কত শতাংশ ভোটার ভোট দিলে কোনো নির্বাচন Valid হবে এর কোনো দিক নির্দেশনা কোথাও নেই। ফলে ৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিলেও তো নির্বাচনে কোনো বাধা নেই। এই নির্বাচনকে আমাদের দু’টি প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্র ভারত এবং চীন প্রথমেই মেনে নিয়েছে, এই জন্য যে নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ হলেও সংবিধান সম্মত হয়েছে। এরপর তো আর কোনো কথা থাকে না। সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নানাদিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করছে না বা করতে পারছেন না। বিরোধী দলের একাধিক সাংসদ আবার শেখ হাসিনা সরকারের কেবিনেটের সদস্যও বটে, ফলে সরকার কোনো কিছু অনিয়ম করলে বা নীতি বহির্ভুত কোনো কাজ করলে জোর গলায় তাঁরা প্রতিবাদ করতে পারছেন না। টেবিল চাপড়িয়ে কথা বলতে ভয় করছেন। আবার ‘ওয়াকআউট’ করার কোনো সুযোগ তাঁরা গ্রহণ করতে পারছেন না। অথচ সংসদকে প্রাণবন্ত করতে হলে বিরোধী দলের যথাযথ ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের এই দশম সংসদের কার্যকলাপ কেমন যেন এক তরফা হয়ে যাচ্ছে। সংসদে কোথায় কোনো তর্ক-বিতর্ক, জবাব-পাল্টা জবাব, সমালোচনামূলক বক্তব্য কোনো কিছুই চোখে পড়ছে না। বর্তমান সংসদে এ ভাবেই চলছে।
যা হোক, আমি দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করছি আমাদের দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে রাজনীতির ক্ষেত্রে গভীর চিন্তা-ভাবনা, দূরদর্শিতা ও গবেষণার অভাব। কোনো কিছু সফলভাবে করতে হলে অবশ্যই গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করেই তা করতে হবে। তা না হলে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন হবে না। এই গভীর চিন্তা ভাবনা করার যে প্রবণতা তা আমাদের দেশে দেখা যায় না। এটি অবশ্য বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিও হতে পারে। দ্বিতীয়ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে এদের সুদুরপ্রসারী ফলাফলের কথা অবশ্যই চিন্তার মধ্যে আনতে হবে। যাঁরা সরকারে থাকেন তাঁদের হয়তা বা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়, কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তাঁরা তো অস্থায়ী, যদিও পদগুলো স্থাযী। ৫ বছরের জন্য হলেও তাঁদের এমন কিছু করা উচিত হবে না, যাতে করে দেশের বা মানুষের কোনো রকম অমঙ্গল হয়। তৃতীয়ত গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যন্ত গবেষণা কথাটা কেন যেন ফিকে হয়ে আসছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে তো কোনো গবেষণা নেই। তবে বিদেশে আছে। মাঝে মধ্যে তাঁরা জনমত জরিপ করে সরকারের জনপ্রিয়তা যাঁচাই করে থাকে। এই জরিপের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে সরকার তাঁদের কার্যক্রমের ধারা পরিবর্তন করেন। তাছাড়াও জনগণের মতামতের উপর তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। শিক্ষিত জাতি বলে তাঁরা রাজনীতি ভাল বোঝেন। সেখানে মানুষকে ঠকিয়ে, মিথ্যাচার করে ভোট পাওয়া ততো সহজ হয় না। আমাদের দেশেও আমার মনে হয় প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের গবেষণা ‘সেল’ থাকা উচিত। আমাদের দেশে মিডিয়াতে যে সমস্ত সংবাদ পরিবেশিত হয়, সেগুলো নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। কে কী বললেন বা লিখলেন, কেনই বা বললেন বা লিখলেন, এর সমাধানই বা কী ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তাভাবনা করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। তাঁদেরকে নিয়ে আলাপ আলোচনাও করা যেতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমানে যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, সেটির গ্রহণযোগ্যতা আগের থেকে অনেক বেশি বলে বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। দু/এক জন কমিশনারকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তাঁরা বেশ আদর্শবাদী এবং নীতিবান। তাঁদেরকে চাপ দিয়ে কোনো কিছু করা সম্ভব হবে না। তাঁদেরকে নির্বাচন করা হয়েছে একটি পদ্ধতির মাধ্যমে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে তাদের নাম এসেছে এবং বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দল থেকেও তাঁদের নাম এসেছিল। এক্ষেত্রে কারও কোনো কিছু করার বা বলার ছিল না। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হওয়ার সময় জনসাধারণের মুখ থেকে বেশ কয়েকটি মন্তব্য বের হয়ে এসেছিল। প্রথমটি হলো নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। আমার প্রশ্ন, তা হলো কি এতেদিন নির্বাচন কমিশনের উপর মানুষের কোন আস্থা ছিল না? যদি তাই হয়, তা হলে এই কমিশনের অধীনে যে সব নির্বাচন হয়ে গেছে এবং ফলাফল ঘোষিত হয়েছে সেগুলো কি বৈধ নয়? তা কী করে হয়। দ্বিতীয়ত বিশেষজ্ঞদের মুখ থেকে যেসব কথা বেরিয়ে এসেছিলো সেগুলো হলো নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে, যথাযথ “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” তৈরি করতে হবে- যে কাজটি করা ততো সহজ হবে না। সর্বোপরি তাঁদের হতে হবে সাহসী। সাহসী শব্দটি নতুনভাবে উচ্চারিত হয়েছে যা অতীতে কেউ বলেন নি। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০টি জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেছে এবং স্থানীয় সরকারের অসংখ্য নির্বাচন যেমন সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলাপরিষদ ইত্যাদি নির্বাচন হয়ে গেছে। এগুলোতে যে অনিয়ম বা কোনো অঘটন ঘটেনি এমনটি নয়। এসব ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, কোনো প্রতিকার বা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ কোনো কমিশনই করেনি কিংবা করতে পারেনি। সেই জন্যই বোধকরি মানুষ সাহসের কথাটি উপস্থাপন করেছে এবং তারা আশা করছে কোথাও কোনো অনিয়ম বা অঘটন ঘটলে, বর্তমান কমিশন প্রচলিত নিয়ম মাফিক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই টুকু আশা জনগণ করতেই পারে। তা ছাড়াও স্বাধীন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য, “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” তৈরি করা অপরিহার্য। নিরপেক্ষ, নির্দলীয় বা ঐকমত্যের সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা যতো সহজ হবে। কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ততো সহজে সেটি সম্ভব হবে না। অথচ এই “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমি এমনও দেখেছি, নির্বাচনের হঠাৎ করে দেখা গেলো কোনো একটি বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত। তাদের দাবি যেহেতু নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনূকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি, কাজেই তাদের পক্ষে নির্বাচনে যাওয়া সম্ভব হবে না। এখন কী করা যায়? নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েই গেছে। নির্বাচনের তারিখ পেছনোর সময় বা সুযোগ কোনোটাই থাকে না। এখানেই তার শেষ নয়, দেখা গেলো মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে, সকলেই দল বেঁধে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন বেকাদায় পড়ে যায়। দশম জাতীয় নির্বাচনে এই ঘটনা ঘটেছিল, যার পুনরাবৃত্তি এদেশের মানুষ আর দেখতে চায় না। নির্বাচন কমিশন আরও একটি চিন্তা ভাবনা করতে পারে যে, যেকোনো নির্বাচনে ৫০ শতাংশ ভোট কাস্ট না হলে, সেই নির্বাচন বৈধ বা গ্রহণযোগ্য হবে না। এ ক্ষেত্রে এক তরফা নির্বাচনের সম্ভাবনা কমে যাবে। নির্বাচন কমিশনকে এসব বিষয় গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে।
(একাদশ নির্বাচন পর্যন্ত)
লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।