নির্বাচন নিয়ে কথা

আপডেট: January 19, 2020, 12:26 am

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

অন্যদিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে দুই নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৬ জুলাই, ২০০৭ ভোরে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে মেট্রোপলিটন আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগারে আটক রাখা হয়। বেগম খালেদা জিয়াকেও একইভাবে সংসদভবন চত্বরে অন্য একটি অস্থায়ী কারাগারে গৃহবন্দি রাখা হয়েছিল। দু’জনে দু’টি ভিন্ন বাড়িতে থাকলেও তাঁদের প্রতি একই আচরণ করা হয়েছিল এবং একই ধরনের সুযোগ সুবিধে দেয়া হয়েছিল। রান্নাবান্না এক জায়গাতেই হতো, পরে সেখান থেকে ভিন্ন ভিন্ন অস্থায়ী কারাগারে তা সরবরাহ করা হতো। পরোক্ষভাবে বলা যায়, তাঁদের রাখা হয়েছিল গৃহবন্দি করে। বাইরে থেকে কোনো দলীয় লোক বা অন্য কারও সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল না একমাত্র সরকারি অফিসিয়াল ছাড়া। শেখ হাসিনা কারাগারে যাবার সময় তিনি দলের প্রবীণতম নেতা মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানকে দলীয় কাজ কর্ম চালিয়ে যাবার দায়িত্ব দেন। মধ্যখানে বেশ কয়েকজন দলীয় নেতা দলের সংস্কারের নামে মাথা চাড়া দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মো. জিল্লুর রহমানের দক্ষতা, যোগ্যতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দ্বারা তা কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন, যার ফলে এই সংস্কার পন্থীরা বেশিদূর এগুতে পারেন নি।
বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাবার সময় তিনি দলের সার্বিক দায়িত্ব কার কাছে অর্পণ করেছিলেন, তা আমরা সাধারণ মানুষ জানতে পারিনি। এমন কি এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। ফলে দলের নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। বেশকিছু প্রবীণ নেতা দলের সংস্কারের নামে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল, যা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। এই দলের নেতৃত্বেও দুর্বলতার কারণে দলের মধ্যে ভাঙ্গনও দেখা দেয়। দলের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, দীর্ঘ সময়ের চিফ হুইপ খন্দকার মো. দেয়োয়ার হোসেন। তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন রুহুল কবীর রীজভী। বিএনপি’র এই দলীয় কোন্দলে পড়ে এই দলটি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার প্রভাব পড়ে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
অসুস্থতার কারণে শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের ১১ জুন সংসদভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। মুক্তিলাভ করার পরই তিনি সু-চিকিৎসার জন্য বিদেশ চলে যান। তাছাড়াও তাঁর ছেলে ও মেয়ে দু’জনই সপরিবারে বিদেশে অবস্থান করছিলেন। তিনি তো একজন মা। তাঁরও যে মন আছে, প্রাণ আছে, ভালবাসা আছে। বিদেশে ছেলে মেয়েদের দেখাশোনা ও চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসেন এবং নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্Íুতি নিতে থাকেন। তাঁর দলের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটে তেমন ভাঙ্গন দেখা যায়নি। মহাজোট মোটামুটিভাবে সুসংগঠিত ছিল। কাকে কোন Constiuency’ তে মনোনয়ন দেয়া হবে সে groundwork জিল্লুর রহমান সাহেবই করে রেখেছিলেন। কাজেই দল গোছাতে শেখ হাসিনাকে তেমন বেগ পেতে হয়নি। তিনি তাঁর সংস্কারপন্থীদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু একটা কথা প্রায় বলতেন, “ক্ষমা হয় তো করতে পারি, কিন্তু ভুলতে তো পারি না।” যা হোক, যিনি শেষ পর্যন্ত সবকিছুই ভুলে গিয়েছিলেন। ভুল তো মানুষেরই হয়।
বেগম খালেদা জিয়া কয়েক মাস পরে এই বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেখতে পেলেন দল ও জোটের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা। সংস্কারপন্থীরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। কিন্তু এই দল গোছানোর জন্য তাঁর হাতে যথেষ্ট সময় ছিল না। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মো. জিল্লুর রহমান যেমন আওয়ামী লীগের হাল শক্ত হাতে ধরে সবকিছু ম্যানেজ করেছিলেন, বিএনপি’র ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি। তার মূল কারণ ছিল দলের বেশকিছু সিনিয়র রাজনীতিবিদ সংস্কারপন্থী দর্শনে বিশ্বাস করে দলকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। তার আগেই বেগম জিয়া ছাড়া পেয়ে যান। তবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য এই জোটের যে প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল তার কোনো কিছুই হয়নি। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই জোট কোনো Ground Work করে নি। বেগম জিয় সবকিছু জানতে পেরে তাঁর দলের সিনিয়র নেতাদের তিরস্কারও করেছিলেন। তাতে কোনো লাভ হয়নি। নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি পূর্বেই শেষ হয়ে গিযেছিল। যথেষ্ট চিন্তা ভাবনা করেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যে প্রার্থী বাছাই করা হবে, সেটিও করা সম্ভব হয়নি। সংসদ সদস্যদের মনোনয়ন দেয়ার কাজটি তেমন সহজ ছিল না। এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থেকে তিনি প্রায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। সভা-সমাবেশ করার সুযোগ কোনোটায় পাননি। ফলে তাড়াহুড়া করে নির্বাচন করতে গিয়ে তার ফল যা হবার তাই হয়েছিল।
এর মধ্যে একটি গুজব উঠেছিলো যে, নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাইনাস টু বা থ্রি করা হবে। আমি প্রথমে বিষয়টি আঁচ করতে পারিনি। পরবর্তীকালে জানতে পারলাম দুই জোটের দুই নেত্রী এবং এইচএম এরশাদকে বাদ দিয়েই নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিষয়টি হাস্যস্পদ। যাঁরা এদেশের নাগরিক এবং যাঁদের ভোটার তালিকায় নাম আছে, তাঁদের নির্বাচন থেকে বাদ দেবেন কি ভাবে? তবে হ্যাঁ পাকিস্তান আমলে দেখেছিলাম EBDO (Election Body Disqualification Order) করে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের বেশ কিছু প্রবীণ নেতাকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু না স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে তা হতে পারবে না। কাজেই এই চিন্তা ভাবনাটি ছিল একেবারে অমূলক। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না, এমন কোনো আইনের ধারায় তাঁরা পড়েন নি।
মাত্র ১১ মাসে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করেন। সেই ভোটার সংখ্যা ছিল ৮,১০,৫৮,৬৯৮। ভোটার তালিকাটি নির্ভুল বলে আমাদের মনে হয়েছে। কেননা তার পূর্বে যে ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়েছিল সেখানে ভোটার সংখ্যা ছিল ৯ কোটিরও বেশি যা মোটেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। কেননা সাধারণত ১৫ কোটি লোক সংখ্যার দেশে ৮ কোটির বেশি ভোটার হতে পারে না। এই কোটি কোটি মানুষের ভোটার রেজিস্ট্রেশন ও প্রত্যেকের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে বিতরণ করা কাজটি ততো সহজ ছিল না। যা হোক, এতো অল্প সময়ের মধ্যে এই কোটি কোটি মানুষের ছবিসহ নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা কাজটি ছিল চ্যালেঞ্জিং যা সেনাবাহিনীর সদস্যরা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এটি অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় কাজ। অন্যদিকে নির্বাচনের সময়ও এগিয়ে এলো। দু’বছর পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে রোড ম্যাপ দিয়েছিলেন, সেখানে ২০০৮, ডিসেম্বর নির্বাচন করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই ডিসেম্বরেই নির্বাচন হবে বলে নির্বাচন সিডিউল ঘোষণা করা হয়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয় ২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮। মনোনয়নপত্র দাখিলের সর্বশেষ তারিখ ছিল ৩০ নভেম্বর, ২০০৮। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে ভোটার উপস্থিতি ৮৭ শতাংশ ছিল বলে যে পরিসংখ্যান বের হয়েছিলো, সেটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছিল। আমি নিজেও ভোট দিয়েছিলাম ঢাকার বনানী বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রে। সেখানে ভোটার সমাগম তেমন একটা চোখে পড়েনি। একমাত্র এরশাদ সাহেবের আমলে দেখেছিলাম প্রতিটি নির্বাচনে ৮০ শতাংশের বেশি ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়েছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় ভোটার উপস্থিতি কখনই ৮০ শতাংশের বেশি দেখা যায় না। অতীতের পরিসংখ্যান তাই বলে। তাতে অবশ্য কিছু আসে যায় না। কেননা আমাদের সংবিধানে কোথাও লেখা নেই যে, কত শতাংশ ভোট কাস্ট হলে, সেই নির্বাচন Valid হবে। ৫ শতাংশ ভোটার উপস্থিত থাকলেই বা কি আসে যায়। আমার মতে ৫০ শতাংশের বেশি ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ না করলে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এতে করে এক তরফা নির্বাচনের সম্ভাবনা কমে যাবে।
(চলবে)