বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

নির্বাচন নিয়ে কথা

আপডেট: January 20, 2020, 12:51 am

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

যা হোক, এই নবম জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২৩০ টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ৩০ টি, জাতীয় পার্টি ২৭ টি আসন লাভ করে। তাছাড়াও জাসদ ৩ টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম ২ টি, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পাটি ২ টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৪ টি আসন লাভ করে। ভোটের হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪৮.০৪ শতাংশ, বিএনপি ৩২.৫০ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৭.০৪ শতাংশ, জাসদ ০.৭২ শতাংশ, জামায়াতে ইসলাম ৪.৭০ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র্র প্রার্থী ২.৯৪ শতাংশ ভোট। এখানে লক্ষণীয় যে, বিএনপি মাত্র ৩০ টি আসন পেলেও ভোট পেয়েছে ৩২.৫০ শতাংশ, অথচ জাতীয় পার্টি ২৭ টি আসন পেয়ে ভোট পেয়েছে মাত্র ৭.০৪ শতাংশ। জামায়াতে ইসলাম মাত্র ২ টি আসন পেলেও পভাট পেয়েছে ৪.৭০ শতাংশ, অথচ জাসদ ৩ টি আসন পেলেও ভোট পেয়েছে মাত্র ০.৭২ শতাংশ। নারীদের সংরক্ষিত আসন ছিল ৪৫টি। পরবর্তীকালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদের নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৫০ নির্ধারণ করা হয়। এই ৫টি আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে ৫ জন প্রর্থাী নির্বাচিত হয়। ফলে সংরক্ষিত আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ জনে। বাকী ৯ জনের মধ্যে বিএনপি ৫ ও জাতীয় পার্টি ৪ আসন লাভ করে।
সাংসাদ ২৩০টি আসন লাভ করার ফলে, আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। শেখ হাসিনা হন ‘লিডার অব দি হাউস” এবং প্রধানমন্ত্রী। বেগম সাজেদা চৌধুরী হন, “ডেপুটি লিডার অফ দি হাউস।” মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বর্ষীয়ান নেতা মো. জিল্লুর রহমান। স্পিকার নিযুক্ত হন অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল হামিদ। বিরোধী দলীয় নেতা হলেন বেগম খালেদা জিয়া। তবে বিরোধী দলের উপনেতা কেউ ছিলেন কি না মনে করতে পারচ্ছি না। সংসদ বসলে চিরাচরিত নিয়মে বিরোধীদল অসহযোগিতা করতে থাকে। প্রথমদিকে তাঁরা সংসদে যেতো না। দু/এক দিন গেলেও ওয়াক আউট করে বের হয়ে আসতেন। এই অসহযোগিতার মধ্য দিয়েই সংসদ চলতে থাকে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে মহাজোট সরকার যে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল, তা তাঁরা কোনোক্রমেই তাদের মন থেকে মুছে দিতে পারছিলেন না। মহাজোট সরকার ক্ষমতা নিয়েই চিন্তা ভাবনা করতে লাগলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো সংস্কার করা যায় কি না? কিংবা সংবিধান থেকে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে একেবারে প্রত্যাহার করা যায় কি না।
বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা বা অস্তিত্ব আছে কি না, থাকলেও এর রূপরেখা কেমন হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, এ সব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করার নিমিত্তে সংসদের উপনেতা বেগম সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছিল। কমিটি বেশ কিছুদিন এ সব বিষয় নিয়ে কাজও করেছিলেন। বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান সংবিধান বিশেষজ্ঞ বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি-এর মধ্যেই তাঁদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে মিডিয়ার সামনে মুখ খুলেছিলেন এবং এটাও বলেছিলেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকতে পারে তবে তার মেয়াদ হবে ১২০ দিন বা চার মাস। আমি তা নিজের কানে শুনেছিলাম এবং মনে মনে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন, এই জন্য যে, ৯০ দিন বা তিন মাস সময় সুষ্ঠু নিবাচন পরিচালনার জন্য যথেষ্ট সময় নয়, বিশেষ করে আমাদের দেশে। আমাদের দেশে দল গুছাতে বেশ সময় লেগে যায়। দলীয় কোনো দলের জন্য অনেক হিসাব নিকাশ করে মনোনয়ন দিতে হয়। ফলে তিন মাসের মধ্যে সবকিছু সম্পন্ন করে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকতেই হবে এবং এর মেয়াদকাল হবে ১২০ দিন। তবে হ্যাঁ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনার যথেষ্ট অবকাশ আছে এবং এ নিয়ে সব দলের নেতাদের মধ্যে আলাপ আলোচনর প্রয়োজন আছে। এ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে, যদিও সে কাজটি তত সহজ হবে না। এই বিশেষ কমিটি ভালভাবেই কাজ করেছিলেন এবং বেশ কিছু দূর এগিয়েও গিয়েছিলেন। এর মধ্যে হঠাৎ করেই সুপ্রিম কোর্ট থেকে রায় বের হলো এই বলে যে, বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো বিধান নেই। যদিও এই সরকারের অধীনে একাধিক নির্বাচন হয়ে গেছে। তবে রায়ে ্আরও একটি বক্তব্য ছিল আর তা হলো প্রয়োজনে পর পর আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি। ফলে দেশ অহেতুক এবং অনাবশ্যক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, যা ছিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
দিন যায়, মাস যায় বিরোধী দলীয় আন্দোলনের গতি একটু একটু করে বাড়তে থাকে। একমাত্র দাবি উঠে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় হলে চলবে না। মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা বার বার বলেন, সংবিধান থেকে তিনি এক চুল নড়বেন না।
অন্য জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, “আন্দোলনের চোটে চুল নড়বে না, বরং চুল একেবারে উড়ে যাবে। এই ভাবে দুই নেত্রীর মধ্যে বাগ-বিতণ্ডা চলতে থাকে। বিএনপি জোট এমনকি বিদেশ থেকেও অনুরোধ আসতে থাকে সংলাপে বসার জন্য। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মহাজোট বারে বারে তা প্রত্যাখ্যান করে। প্রত্যাখ্যান করবারই কথা। কেননা সংলাপের অর্থই হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনঃপ্রবর্তন করা, যা শেখ হাসিনা, তথা মহজোটের কাছে কখনই গ্রহণযোগ্য হবে না। কাজেই সমঝোতার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক একজন অধ্যাপক মাত্র দুটো কথা বলেছিলেন, যা দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর প্রথম বক্তব্য ছিল, “যতই ঝুঁকি আসুক না কেন, শেখ হাসিনা কখনই তাঁর পদ ছাড়বেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা তিনি কখনই বলবেন না বা শুনবেন না এবং সংবিধানে তা পুনঃসংযোজন করার কোনো প্রশ্নই উঠে না।” দ্বিতীয় বক্তব্যটি ছিল বর্তমানে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী যে অবস্থানে আছে তাঁরা কখনই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বা বেসামরিক প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করবে না। ২০০৭ সালে দেশে নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করতে করতে যে সাংবিধানিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল, জেনারেল মইন ইউ আহমদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করিয়ে কোনো রকমে তা সামাল দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও বুদ্ধিমান জেনারেল, যার ফলে মাত্র এক বছরের মধ্যে ছবিসহ নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। তাঁদের রোড-ম্যাপ অনুযায়ী ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসেই নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা সম্ভব হয়েছিল। তাঁদের কথার কোনো বরখেলাপ হয়নি।
যা হোক, বিরোধী দলের তিন দিনের ধর্মঘট চলছে। হঠাৎ করেই শেখ হাসিনা ধর্মঘটের প্রথম দিনেই ঘোষণা দিলেন, “আমরা আগামীকাল সন্ধ্যের পর আপনাদের (বিরোধী দল) সঙ্গে এক বৈঠক বসতে চাই। সেখানে আপনাদের বক্তব্য শোনা হবে এবং আলাপ আলোচনা হবে।” বিরোধী জোট থেকে কেন যেন তেমন পজিটিভ বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এই জোট থেকে সম্ভবত বলা হয়েছিল, “তাদের তিন দিনের ধর্মঘট চলছে। এই তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পরই তাঁরা ভেবে দেখবেন সংলাপে বসবেন কি না। তাঁদের বক্তব্যের ভাষা কী ছিল এই মুহূর্তে হুবহু মনে কারতে পারছি না। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই টেলিভিশনের পর্দায় দেখলাম প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। তিনি সরাসরি বললেন, “আহা, ভুল হয়ে গেলো। শেখ হাসিনা এতোদিন সংলাপে বসতে রাজি হন নি, আর যখন রাজি হলেন, তখন বেগম জিয়ার তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা ঠিক হয়নি। এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত, মারাত্মক ভুল”। বেগম জিয়ার এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না সঠিক ছিল, তা ভবিষ্যতে ইতিহাস বিচার করবে। তবে আলাপ আলোচনায় বসলে যে, তাৎক্ষণিকভাবে সমঝোতা হয়ে যেতো এমনটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কেননা বেগম খালেদা জিয়া চাইতেন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, আর শেখ হাসিনা সংবিধানের দোহায় দিয়ে সম্মত হতেন না। এ ব্যাপারে আমরা সুনিশ্চিত। তবে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষই ছাড় দিলে হয়তো বা ঐকমত্যের সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল। বিশেষজ্ঞ মহল থেকে এমনও ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিলো যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই ৪ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেই। নির্বাচন সর্বদলীয় না হলে, অন্তত বহুদলীয় তো হবে। প্রয়োজনে তাঁরা এইচএম এরাশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বানিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন করবেন। বাস্তবে হলোও তাই। নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসতে থাকে, আর সঙ্কট দিনের পর দিন ঘনীভুত হতে থাকে। শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়াকে আবারও অফার দিলেন, প্রয়োজনে একাধিক মন্ত্রীর পদও তাঁরা দিতে চাইলেন। নির্বাচনের তারিখও এসে গেলো। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিরোধী জোট এই নির্বাচন ঠেকাবার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার হয়তো বা নেই, কিন্তু সরকারের তো পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। সেখানেও তো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েই গেছে। কাজেই দশম জাতীয় নির্বাচন তো করতেই হবে।
(চলবে)