নিয়তিবাদী বিএনপি

আপডেট: জুলাই ৭, ২০১৮, ১১:৫৯ অপরাহ্ণ

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ


২০০৯ সালে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠিত হবার পর থেকেই ক্রমশ এক ধরনের নৈরাশ্যবাদিতায় আক্রান্ত হতে থাকে বিএনপির নেতাকর্মীরা। যত দিন যেতে থাকে এ নৈরাশ্যবাদিতার মাত্রা বাড়তে থাকে যা অচিরেই পরিণত হয় নিয়তিবাদীতায়। ফলে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দুর্নীতি এবং নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলবার পরিবর্তে মনোজাগতিকভাবে তারা যেন কোনো এক অজানা নিয়তির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, যে এসে আওয়ামী লীগকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে বিএনপিকে।
বর্তমানে এ নিয়তিবাদিতা চূড়ান্তভাবে জেঁকে বসেছে বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল, সব স্তরে। মাঠ পর্যায়ের বিএনপির যেকোনো নেতাকর্মীর সাথে কথা বললে যে চিত্র পাওয়া যায় তাহল তাঁরা প্রায় সবাই এক বাক্যে বিশ্বাস করে বসে আছেন যে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনের দরকার নেই। আওয়ামী লীগের কর্মফলের কারণেই নিয়তির অমোঘ বিধানে তাদেরকে একদিন ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে।
নিয়তির অমোঘ বিধানের কথা বললেও সেই নিয়তি বলতে তারা অনেকেই বাস্তবতা বিবর্জিত, সেনা হস্তক্ষেপের আশা করে বসে আছেন। ২০০৯ সালের দিকে তাঁদের মাঝে এ বিশ্বাস এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতাও সেসময় আবেগ চেপে রাখতে না পেরে বলে ফেলেছিলেন আরেকটি ১৫ই আগস্ট আসন্ন। এরই ফলশ্রুতিতে বিডিআর বিদ্রোহের সময় অনেক বিএনপি নেতাকর্মীর মাঝে একটা চাপা উল্লাস পরিলক্ষিত হয়।
এছাড়া বিএনপির অনেক সমর্থক মনে করেন হেফাজতের মত চরম দক্ষিণপন্থার উত্থানেও সরকারের পতন ঘটতে পারে। এর বাইরে তাঁরা আশা করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এ ধরনের বাইরের চাপ। এমনকি কেউ কেউ এমন কল্পনার জগতে ডুব দিয়েছেন যে তাঁরা মনে করছেন যে ভারতের মোদী সরকারও ভবিষৎতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে।
এ ধরনের নানা কাল্পনিক জগতে ডুবে থাকা মাঠ পর্যায়ের যেকোনো কর্মী সমর্থককে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাঁরা নিজেরা কেন আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন না, তাঁদের সবার কাছ থেকে সাধারণত যে উত্তরটি পাওয়া যায় তাহল পুলিশ তাঁদের কোনো অবস্থাতেই রাস্তায় দাঁড়াতে দিচ্ছে না, পুলিশ প্রযুক্তিগতভাবে অনেক উন্নত এখন, ফলে এ পুলিশের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে রাস্তায় আন্দোলন করা সম্ভব নয় ইত্যাদি। এছাড়া আন্দোলনে জেল, মামলা ইত্যাদির ভয়ও রয়েছে।
অর্থাৎ, পুলিশের ভয়ে ভীত হয়ে তাদের দলীয় প্রধানের মুক্তির দাবিতে ন্যূনতম প্রতিবাদও জানাতে পারছে না বিএনপি। আর এ দাঁড়াতে না পারা থেকেই বিএনপি তার ভবিষ্যত নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। বর্তমানে বিএনপির কার্যক্রম এতটাই নগন্য যে এরশাদের ঘরোয়া রাজনীতির সময়েও আওয়ামী লীগ, সিপিবি প্রমুখ দল এর চেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল।
বস্তুত, ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে এ নিয়তিবাদের উপর নির্ভর করে। এ নিয়তিবাদিতার কারণেই দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া গ্রেফতার হবার পরেও ন্যূনতম আন্দোলন তো দূরের কথা, দেশের কোথাও সে অর্থে তারা একটি প্রতিবাদ মিছিল বা সমাবেশ করতে চায়নি বা পারেনি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময় তৎকালীন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ ১৯৮০ সালে নারায়ণগঞ্জে এক জনসভায় আবেগবশত বলে ফেলেছিলেন বাংলাদেশে আফগান স্টাইলে বিপ্লব করা হবে। সেসময় মাত্র সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছে বাম সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করবার জন্য। অতিরিক্ত সতর্ক জিয়া সরকার তখন ফরহাদকে বন্দি করে প্রথমে মৃত্যুদ- এবং পরবর্তীতে তা রদ করে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করে। সিপিবির মত একটি ছোট রাজনৈতিক দলও সেসময় যেভাবে দেশব্যাপি মিছিল, মিটিং, দেয়াল লিখন ইত্যাদি করে তার ছিটেফোঁটা উদ্যোগও বিএনপির মত দল থেকে এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয় নাই।
শুধু এবারই নয়, ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের ১/১১ এর ছদ্ম “সামরিক শাসনের” সময় যখন বেগম জিয়া প্রথমবারের মত বন্দি হলেন তখনো এ দলের নেতাকর্মীদের তাদের নেত্রীর মুক্তির দাবিতে মিছিল, মিটিং করতে দেখা যায় নাই। তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াসও তাদের মাঝে পরিলক্ষিত হয় নাই।
বরং, খালেদা জিয়াকে বন্দি রেখে সেসময় সাইফুর রহমান, আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া, মেজর (অব.) হাফিজের মত বাঘা বাঘা বিএনপি নেতারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন বেগম জিয়াকে বহিস্কার করে নতুনভাবে দল গড়ে তোলার। এ উদ্যোগের সাথে সেসময় সামিল হয়েছিলেন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী। প্রয়াত খন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ কিছু কর্মী সমর্থক তখন দলকে টিকিয়ে রাখবার জন্য সাহসী ভূমিকা না রাখলে বিএনপি আজকে সাংগঠনিকভাবে যে অবস্থায় রয়েছে সে অবস্থায় থাকত কিনা সন্দেহ।
কিন্তু, খালেদা জিয়া মুক্ত হবার পর সাইফুর রহমান, মান্নান ভুঁইয়ার মত শীর্ষস্থানীয় হাতে গোণা দুই-একজন বাদে বাকি সবাইকে “ক্ষমা” করে দিয়ে আবার দলে ফিরে আসার সুযোগ দেন। শুধু তাই নয়, সাইফুর রহমান এবং মান্নান ভুঁইয়া মারা যাবার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা উদারতা দেখিয়ে তাঁদের জানাযাসহ মৃত্যু-পরবর্তী অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দেন।
এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটি বিষয় উল্লেখ না করলে নয়। এটি দল হিসাবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বুঝতে সহায়ক হবে। বাম দল হিসাবে পরিচিত বাসদ ভেঙ্গে কয়েক বছর আগে মুবিনুল হায়দার চৌধুরী, শুভ্রাংশ চক্রবর্তী এবং আব্দুল্লাহ সরকারের নেতৃত্বে বাসদ (মার্কসবাদী) নামে আরেকটি দল গঠন করা হয়।
আব্দুল্লাহ সরকার যখন মারা যান তখন অপর বাসদের (খালেকুজ্জামান) নেতা কমরেড খালেকুজ্জামানসহ কোনো নেতাকর্মী আব্দুল্লাহ সরকারের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণ করতে আসেন নাই। বাম রাজনৈতিক প্লাটফরম থেকে ক্রমাগত উন্নত সংস্কৃতি ও মননের কথা বলে যাওয়া এবং এর পাশাপাশি তাঁদের ভাষায় আওয়ামী লীগ, বিএনপির মত বুর্জোয়া দলগুলোর সংস্কৃতিগত দৈন্যের বিরুদ্ধে উচ্চকিত থাকা ব্যক্তিবর্গ থেকে এ ধরনের হীনমন্যতায় তখন অনেককেই স্তম্ভিত হয়েছিলেন।
বিএনপি, আওয়ামী লীগের মত দলগুলোর কাছে যেহেতু আদর্শের চেয়ে ভোটের হিসাবটা মুখ্য তাই তারা সাধারণত নেতাকর্মীর সংখ্যা বাড়াবার হিসাবে বেশি ব্যস্ত থাকেন। খালেদা জিয়া হয়ত এ ভাবনা থেকেই ১/১১ এর হোতাদের সাথে যারা হাত মিলিয়েছিলেন তাঁদের অধিকাংশকে ক্ষমা করে দিয়ে দলে সক্রিয় হবার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু যে বিষয়টা তিনি তখন বুঝতে সক্ষম হন নাই সেটা হল সংখ্যা ভোটের রাজনীতিতে সহায়ক হলেও আন্দোলনের রাজনীতিতে সহায়ক নাও হতে পারে; বিশেষত সেই সমস্ত ব্যক্তিবর্গ যারা দলের সবচেয়ে দুর্দিনে নেত্রী এবং দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
এ সমস্ত ব্যক্তিবর্গ আজকে দলকে নৈরাশ্যবাদিতা এবং নিয়তিবাদের দিকে ঠেলে দেবার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করলেও এ নিয়তিবাদিতার উৎস কিন্তু তাঁরা নন। বর্তমানের এ নিয়তিবাদিতার উৎস বুঝতে হলে, আমাদের চোখ ফেরাতে হবে দলটির জন্ম এবং বিকাশ প্রক্রিয়ার দিকে।
বিএনপির জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে যে মিথটি তৈরি করা হয়েছে তাহল বিএনপি হল সেনা- ছাউনি জাত দল। এ দল গঠনের মূল উদ্দেশ্য হল রাষ্ট্র কাঠামোয় সেনা আমলাতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষা করা। অর্থাৎ, সেনা আমলাতন্ত্রের বেসামরিক মুখপাত্র হিসাবে কাজ করবার জন্য বিএনপি গঠন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ, জাসদ, সিপিবি, ন্যাপ (মো) প্রমুখ দলের দীর্ঘদিনের প্রচারণার ফলে জনগণের একটা বড় অংশের পাশাপাশি বিএনপি সমর্থকদের একটি অংশও এটি বিশ্বাস করেন। এ প্রচারণার ব্যাপ্তি এত গভীরে যে বিভিন্ন একাডেমিক গবেষকও বিএনপির জন্ম প্রক্রিয়াকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন।
উল্লেখ্য যে, উপরে উল্লিখিত দলগুলো শুধু প্রচারণার অংশ হিসাবে নয়, তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই বিএনপি সম্পর্কে তারা এটি বিশ্বাস করেন। বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং বিএনপি ঘেঁষা বুদ্ধিজীবীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল এ মিথটির বিপরীতে তাঁদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গ্রহণযোগ্যভাবে জনগণের একটি বড় অংশের মাঝে বিএনপির গঠন প্রক্রিয়ার বিষয়টি তুলে ধরতে না পারা। আদর্শগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিগত প্রবল দৈন্য অবশ্য দলটির জন্মলগ্ন থেকেই ছিল, যা থেকে বিএনপি আজো উত্তরণ ঘটাতে পারেনি।
এ কথা সত্য যে জিয়াউর রহমান উর্দি পরে দল গঠন করেছিলেন এবং এ দল গঠন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র কাঠামোকে কাজে লাগিয়েছিলেন। তবে, এ দলটি গঠিত হয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের বাইরে, সিভিলিয়ান এলাকায়। কিছু সেনা অফিসারের এ দল গঠন প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টতা এবং সমর্থন থাকলেও পুরো সেনা ছাউনির সমর্থন জিয়া পাননি। বরং সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশই জিয়ার দল গঠন প্রক্রিয়ার বিরোধী ছিল। এ বিরোধিতার কারণ মূলতঃ দুটো। এর একটি হল জিয়ার সফলতায় তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত ঈর্ষা এবং অপরটি, আদর্শগত।
আদর্শগত কারণে বিরোধিতাকারিরা মূলতঃ দুটো ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথমোক্ত ভাগে ছিলেন যারা ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী তাঁরা; অন্য কথায় বলতে গেলে এরা মূলতঃ আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতি সহানুভুতিসম্পন্ন ছিলেন। আদর্শগত বিরোধিতাকারিদের আরেকটি অংশ কর্নেল (অব.) তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সমর্থক ছিলেন।
সেনাবাহিনীর সহায়তায় অভ্যুথান (তাহেরের ভাষায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব) সংগঠিত করে জাসদকে ক্ষমতায় আনবার জন্য তাহের সেনা সদস্যদের নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে এ সৈনিক সংস্থা গঠন করেছিলেন। বস্তুত, এ সৈনিক সংস্থা ক্ষমতা দখলের জন্য যে অভ্যুথান তাহেরের নেতৃত্বে পরিচালনা করে তারই ফসল হল জিয়ার ক্ষমতা দখল। অভ্যুথানের পর তাহের জিয়ার হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে মনে করেছিলেন তিনি নেপথ্যে থেকে জিয়ার মাধ্যমে জাসদের “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের” ধারণা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করবেন।
কিন্তু ক্ষমতা দখল করে জিয়া একদিকে যেমন দ্রুত গোপন সামরিক বিচারের মাধ্যমে তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে তাঁর নিজের ক্ষমতা সংহত করতে উদ্যোগ নেন, তেমনি পাশাপাশি, মুসলিম লীগের রাজনৈতিক চেতনাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণার জন্ম দিয়ে। জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন সেসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানাবিধ কারণে প্রবল অজনপ্রিয় আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়াতাবাদী চেতনার ভিত্তিতে তিনি তাঁর রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে পারবেন না।
ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ এবং জাসদের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন সেনা অফিসাররা জিয়ার হাত ধরে মুসলিম লীগ ধারার রাজনীতির পুনর্বাসনের বিরোধী ছিলেন। অপরদিকে, জিয়ার মত মুসলিম লীগ বা ইসলামপন্থার রাজনীতিতে যারা বিশ্বাস করতেন তাঁদের একটা বড় অংশও জিয়ার রাজনৈতিক সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ছিলেন। এর বড় প্রমাণ হল একই ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়েও জেনারেল এরশাদ কর্তৃক পরবর্তীতে বিএনপি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল।
সেনা আমলাতন্ত্রের হাতে ৭৫ পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দল হচ্ছে বিএনপি। এত ক্ষতি হওয়া সত্বেও বিএনপির কর্মী/সমর্থকদের নিয়তিবাদী মননের সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হল মনোজাগতিকভাবে এর সেনা নির্ভরতা। অনুমান করা হয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশের বিরোধিতার ফলে জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে কম পক্ষে ১৯ টি ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটে। জিয়ার কঠিন হাতে এ অভ্যুত্থান দমন করবার ফলে অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় জিয়া সরকার কর্তৃক সহস্রাধিক সেনা সদস্যের প্রাণহানি ঘটে।
জিয়াউর রহমানকে শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হয় তাঁর বিরুদ্ধে সংঘঠিত ২০তম সেনা অভ্যুথানে। পরবর্তী সময়ে জেনারেল এরশাদ থেকে জেনারেল নাসিম এবং ১/১১ এর জেনারেল মঈন প্রত্যেকটি সেনা “অভ্যুত্থান” সংগঠিত হয় বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে।
জেনারেল এরশাদ এবং জেনারেল মঈনের অভ্যুত্থানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিএনপি। এ দুই জেনারেল চেয়েছিলেন দল হিসাবে বিএনপিকে দুর্বল বা শেষ করে দিতে। এ থেকে একটি বিষয় পরিস্কার যে সেনা আমলাতন্ত্রের একটি বড় অংশের নানা সময়ে বিরাগভাজনের শিকার হতে হয়েছে বিএনপিকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যেহেতু তাহেরের অভ্যুত্থানের ফসল হিসাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেজন্যই হয়ত বিএনপির কর্মী/সমর্থকরা এমন একটা ইলিউসনে ২০০৯ সাল থেকে বসবাস করছেন যে, কোন এক শক্তি এসে তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে।
প্রবল ধীশক্তির অধিকারী জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করবার সাথে সাথে বুঝতে পারেন যে, তাঁকে অচিরেই মতাদর্শিকভাবে তাঁর পক্ষ এবং বিপক্ষ দুই ধরনের সেনা সদস্যদের তরফ থেকেই প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি পড়তে হবে। তিনি আরো বুঝতে পারেন শুধুমাত্র কিছু সেনাসদস্যের সমর্থনের উপর ভিত্তি করে তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন না। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে ন্যূনতম একটা গণভিত্তি লাগবে আর এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দল গঠন।
জিয়ার দল গঠনের উদ্যোগের সাথে যারা সামিল হয়েছিলেন তাঁদেরকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করা যায়। এর একটি হল বিভিন্ন দলের সুবিধাবাদী ব্যক্তিবর্গ, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করে নানা প্রকার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সুবিধা আদায়। এর পাশাপাশি আমলাতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে, অর্থের লোভ এবং ভয় দেখিয়েও কিছু লোককে জিয়া দলে ভিড়ান।
অপর ক্যাটাগরির ব্যক্তিবর্গ জিয়ার দল গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিলেন জিয়ার মাধ্যমে ডান এবং দক্ষিণপন্থার রাজনীতির যার আপাত অবসান ১৯৭২ সালে হয়েছিল বলে অনেকে ভেবেছিলেন সেটি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা দেখে। এরা এসেছিলেন মূলত মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন “ইসলামপন্থী” রাজনৈতিক দল ও “পিকিংপন্থী” আইনি এবং বেআইনি বাম দলসমূহ থেকে। তবে, বিএনপির কর্মীদের মূল অংশটা এসেছিল ন্যাপ (ভাসানী) থেকে।
সিপিবি এবং ন্যাপ (মো) যেমন তাদের নিজ নিজ দল বিলুপ্ত করে ১৯৭৫ সালে বাকশালে যোগ দিয়েছিল, সেই একই ধারা অনুসরণ করে তৎকালীন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাপ (ভাসানী) নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া তাঁর দলকে বিলুপ্ত করে জিয়ার দলে যোগ দেন। বস্তুত, যাদু মিয়ার সমর্থন ছাড়া বিএনপি বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হয়ে উঠত কিনা সন্দেহ। ন্যাপের (ভাসানী) বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীর বিএনপিতে যোগদানের ফলে এটি মূলধারার দল হয়ে ওঠে, যে সুবিধাটি জেনারেল এরশাদ পান নাই। কোনো প্রধান রাজনৈতিক দল এরশাদের জাতীয় পার্টিতে বিলুপ্ত না হবার ফলে এটি রাজনীতিতে কখনই মূলধারা হয়ে উঠতে পারে নাই।
তবে, যাদু মিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপের নেতা/কর্মীদের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে বিএনপি একটি শক্তিশালী দল হিসাবে গড়ে উঠলেও জিয়া শঙ্কিত হয়ে ওঠেন দলীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু যাদু মিয়ার হাতে রয়েছে এ উপলব্ধি থেকে। যাদু মিয়া যদি কখনো তাঁর কর্মীদের নিয়ে দল থেকে বের হয়ে যান তাহলে দলের ভবিষ্যত কি হবে এ ভাবনা জিয়াকে পেয়ে বসে।
বিএনপি গঠনের অল্প দিনের মাথায় হঠাৎ করে ৫৪ বছর বয়সী যাদু মিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। যাদু মিয়ার পরিবারের ঘনিষ্ঠ অনেকেই এটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু মনে করেন না এবং এদের কেউ কেউ একে ষড়যন্ত্রমূলক মৃত্যু বলে দেখেন। যদিও এদের কেউই জিয়াকে এ মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন না, তবে এ মৃত্যুর মাঝ দিয়ে জিয়ার জন্য দলের উপর নিজের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
দলের উপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দলছুট ব্যক্তিদের নিয়ে গড়ে ওঠা এ দলটি কোনোদিন ক্ষমতাচ্যুত হলে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারবে কিনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ জিয়া তা চিন্তা করে যেতে পারেন নাই। ফলে, জিয়া নিহত হবার পরে বিএনপি যখন এরশাদ কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হয় তখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে না তুলে মওদুদ আহমেদসহ দলটির অনেক নেতা-কর্মী উর্দি পরা নেতৃত্বই জাতির ভবিষ্যত মনে করে সামরিক সরকারের সাথে হাত মেলান।
পরবর্তীতে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন পনের দলীয় জোটের সাথে আন্দোলনে শরীক হলেও বিএনপির দুর্বলতা ধরা পড়ে যখন আন্দোলনের তুঙ্গ মুহূর্তে ১৯৮৬ সালে হঠাৎ করে আন্দোলন বন্ধ করে আওয়ামী লীগ, সিপিবিসহ কিছু দল নির্বাচনে চলে যায়। আওয়ামী লীগ পদত্যাগ করে আবার আন্দোলন শুরু না করা পর্যন্ত বিএনপি তার সহযোগীদের নিয়ে এরশাদ বিরোধী তেমন কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে নাই যা কিনা সরকারের পতন ঘটাবে। অপরদিকে, ১৯৯৬ সালে এককভাবে আন্দোলন করে আমরা আওয়ামী লীগকে বিএনপি সরকার ফেলে দিতে দেখেছি।
শুরু থেকেই কারো উপর নির্ভর করে ক্ষমতা দখল বা আন্দোলন করবার ফলে এককভাবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার সংস্কৃতি বিএনপির মাঝে গড়ে ওঠে নাই। তাই ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে জামায়াত তার যুদ্ধাপরাধী নেতৃত্বকে মুক্ত করবার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলে যা পরবর্তীতে পেট্রোল বোমা নির্ভর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়-বিএনপি নেতৃত্ব তার কর্মীদের নিয়ে এ আন্দোলনের অনুগামী হয়।
জনসমর্থন না থাকায় সরকার কঠোর হাতে পেট্রোল বোমা নির্ভর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন দমন করে ফেলে। পাশাপাশি, যুদ্ধাপরাধী নেতৃত্বের অনেকের ফাঁসি হয়ে যাওয়ায় এবং সরকারের দমন নীতির ফলে জামায়াত সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় আন্দোলন থেকে দূরে সরে যায়। এমতাবস্থায়, খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলে নিয়িতিবাদ নির্ভর বিএনপি নেতৃত্বকে অনেকটাই “ডধরঃরহম ভড়ৎ এড়ফড়ঃ” বা “গডোর প্রতীক্ষা”এর মত প্রতীক্ষা করা ছাড়া আর কোন ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না।
এখন পর্যন্ত বাস্তবতা হচ্ছে, দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে প্রেরণ করবার পর বিএনপির যে পরিমাণ নেতাকর্মী রাস্তায় নেমেছেন, আশির দশকে সিপিবি একাই এর চেয়ে বেশি কর্মী রাস্তায় নামাতে পারত, যদিও সিপিবির পিছনে কখনই তেমন কোনো জনসমর্থন ছিল না। এমনকি খালেদা জিয়ার আমলে স্বৈরাচারী এরশাদ যখন বন্দি ছিলেন, তখন পাঁচ বছরের পুরো সময়টাই জাতীয় পার্টির মত একটি দল তাদের নেতাকে মুক্ত করবার জন্য কম বেশি রাস্তায় ছিল।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা হবার পর থেকে বিএনপি এখন তার দলীয় ইতিহাসে সবচেয়ে সঙ্কটময় সময় অতিক্রম করছে। এমতাবস্থায়, বিএনপি যদি নিয়তির উপর নির্ভর করে থেকে মাঠের আন্দোলন (সন্ত্রাস নয়) গড়ে তুলতে না পারে এবং সঙ্কট উত্তরণের জন্য শুধুমাত্র আইনি লড়াই ও ফেসবুক এক্টিভিজমের উপর নির্ভর করে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে দলটির পরিণতি মুসলিম লীগ বা শেরে বাংলা ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির মত হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।
লেখক: শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
(বিডিনিউজটুয়েন্টিফরডটকম এর সৌজন্যে)