নিয়ামতপুরে জনপ্রিয় হচ্ছে গ্রাম আদালত

আপডেট: এপ্রিল ১৭, ২০১৮, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

রাসিকুল ইসলাম, নিয়ামতপুর


নওগাঁর নিয়ামতপুরে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম। স্থানীয় পর্যায়ের ছোট-খাট বিরোধ ও সমস্যা সমাধানে মানুষ এখন থানা-পুলিশে না গিয়ে গ্রাম আদালতেই সুবিচার পাচ্ছেন।
ইউনিয়ন কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত এ আদালতে ফৌজদারী, দেওয়ানী ও যে সব মামলার বিচারিক কাজ ৭৫ হাজার টাকার উর্ধ্বে হবে না এমন সব মামলা এখানে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে বিভিন্ন দিনে সপ্তায় একদিন করে এ বিচারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। হাজিনগর ইউনিয়ন গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় সপ্তায় ১দিন রোববার, চন্দননগর ইউনিয়নে সপ্তায় ১দিন বুধবার, ভাবিচা ইউনিয়ন সপ্তায় ১দিন বুধবার, নিয়ামতপুর সদর সপ্তায় ২দিন রোববার ও বুধবার, রসুলপুর ইউনিয়ন সপ্তায় ১দিন রোববার, পাড়ইল ইউনিয়ন সপ্তায় ১দিন বুধবার, শ্রীমন্তপুর ইউনিয়নে সপ্তায় ২দিন রোববার ও বুধবার বাহাদুরপুর ইউনিয়ন সপ্তায় ১দিন রোববার। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে একটি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ন্যায় বিচার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নিয়ামতপুর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন সফলতার সঙ্গে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইউএনডিপি ইউরোপিয়ান ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (২য় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত গ্রাম আদালতের সফলতার পিছনে রয়েছে প্রত্যেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যানবৃন্দ, আর তারও পিছনে রয়েছে ইকো সোশ্যাল ডেভলোপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)।
নিয়ামতপুর উপজেলার গ্রাম আদালত প্রকল্পের সমন্বয়রে দায়িত্বে রয়েছেন ইকো সোশ্যাল ডেভলোপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)এর উপজেলা সমন্বয়কারী বদিউল আলম। বর্তমানে নিয়ামতপুর উপজেলায় গ্রাম আদালত ব্যাপক প্রসংশিত হচ্ছে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে গ্রাম আদালতের প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। আর ইকো সোশ্যাল ডেভলোপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) উদ্যোগে ইউএনডিপি ইউরোপিয়ান ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (২য় পর্যায়) প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। মাত্র ১৩ মাসেই নিয়ামতপুরে গ্রাম আদালতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গ্রাম আদালতে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রাম আদালতের প্রধান হলেন সংশ্øিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। এছাড়া বাদী-বিবাদীদের একজন করে মনোনীত দুজন, একজন ইউপি সদস্য, ও একজন গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ পাঁচজনকে নিয়ে শুরু হয় এ গ্রাম আদালতের বিচারিক কার্যক্রম। আর বর্তমানে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশেষ করে সাধারণ দরিদ্র মানুষ এ আদালতের উপর ক্রমেই নির্ভরশীল হচ্ছেন।
হাজিনগর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম রেজা ডালিম বলেন, অভিযোগ করার কয়েক দিনের মধ্যেই গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান পাচ্ছেন তারা। এতে করে তাদের আর থানা-পুলিশে যেতে হচ্ছে না।
বাহাদুরপুর ইউনিয়নের সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিয়ামতপুরে একটি প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে, থানা ও নওগাঁ কোর্টের খরচ চালায় বাহাদুরপুর ইউনিয়নবাসী। কিন্তু এখন সেদিন পাল্টে গেছে। এখন বাহাদুরপুর ইউনিয়নের যে কোন ছোট-খাট সমস্যা আর থানা কিংবা আদালতে যায় না। গ্রাম আদালত সক্রিয় হওয়ার পর থেকে এখন ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতেই সমাধান হয়ে যায়। বিশেষ করে সরকারের যে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্প চালু হয়ে তা যদি আরো কিছু দিন থাকে তাহলে আমার বিশ্বাস ইউনিয়নের যে কোন ছোট-খাটো সমস্যার সমাধান গ্রাম আদালতেই হবে।
ইউএনডিপি ইউরোপিয়ান ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (২য় পর্যায়) প্রকল্পের সহযোগী সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভলোপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)এর উপজেলা সমন্বয়কারী বদিউল আলম বলেন, আমরা নিয়ামতপুর উপজেলায় গত ১৩ মাস থেকে কাজ করছি। এই ১৩ মাসে ৮টি ইউনিয়নে প্রায় ৪শ মামলা নিষ্পত্তি করেছি। এজন্য সকল সফলতার দাবিদার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যানবৃন্দ। তারা এখন অনেক সক্রিয়। প্রত্যেক মাসে ৮টি ইউনিয়নে গড়ে ৪০টির মত মামলা নিষ্পত্তি করা হয় গ্রাম আদালতে। আমরা সাধারণ মানুষকে গ্রাম আদালত সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে উঠোন বৈঠক, কাউন্সিলিং, ভিডিও শো ও র‌্যালি করে থাকি। প্রত্যেক ইউনিয়নে প্রত্যেক মাসে এ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করি থাকি। আমি আশা রাখি এভাবে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হলে সাধারণ মানুষ গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভুক্ত যে কোন সমস্যা নিয়ে আর থানা কিংবা আদালতে যাবে না। ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিষ্ঠিত গ্রাম আদালতেই আসবে এবং তা নিষ্পত্তিও হবে।
নিয়ামতপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান বজলুর রহমান নইম বলেন, ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ এখন দিন দিন গ্রাম আদালতের প্রতি আস্থা রাখতে শুরু করেছে। আমি সপ্তায় ২দিন গ্রাম আদালত পরিচালনা করি। রোববার ও বুধবার। আমি যে কোন মামলা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করে থাকি। বর্তমানে আমার ইউনিয়নের ছোট-খাট গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভুক্ত সমস্যা নিয়ে কেউ আর থানা বা আদালতে যায় না। আমার ইউনিয়নের ছোটখাটো সমস্যা গ্রাম আদালতেই তা ৩০ দিনের মধ্যে নিস্পত্তি করার চেষ্টা করি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সালেহ মো. মাহফুজুল আলম বলেন, আসলে গ্রাম আদালত তো অনেক আগে থেকেই রয়েছে। কিন্তু তেমন কোন কার্যক্রম ছিল না। সাধারণ মানুষও গ্রাম আদালতে বিচার চাইতে আসতো না। কিন্তু বর্তমান সরকারের উদ্যোগে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্প চালু হওয়ার কারণে গ্রাম আদালতকে সক্রিয় করার জন্য বিভিন্নভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে সাধরণ মানুষ গ্রাম আদালতের প্রতি আস্থা রাখতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ যে সকল গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভুক্ত সে সকল সমস্যা নিয়ে আর থানা বা আদালতে যায় না। মোট কথা গ্রাম আদালত এখন অনেক অনেক সক্রিয় আর সাধারণ মানুষ এর সুফল পেতে শুরু করেছে।