নীতিমালা ছাড়াই কয়লা আমদানির উদ্যোগ

আপডেট: জুলাই ৩০, ২০১৮, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


জ্বালানি নিরাপত্তায় কোনো উদ্যোগই সেভাবে কাজে আসছে না। গ্যাসের ঘাটতি বাড়তে থাকলেও নতুন কূপ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সাফল্য দেখাতে পারছে না পেট্রোবাংলা। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি সত্ত্বেও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বড়পুকুরিয়া কয়লা দুর্নীতি জ্বালানি নিরাপত্তার এ নাজুকতা নতুন করে সামনে এনেছে। কয়লা সংকটে দেশের একমাত্র তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটিই বন্ধ করে দিতে হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত থেকে কয়লা আমদানির কথা ভাবছে বিদ্যুৎ বিভাগ। যদিও কয়লা উৎপাদন, ব্যবহার ও আমদানির কোনো নীতিমালাই এখন পর্যন্ত হয়নি।
দেশের পাঁচটি খনিতে কয়লা মজুদ আছে ৭৯৫ কোটি টন। এ কয়লা মজুদ রেখেই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার জন্য ভারত থেকে কয়লা আমদানির কথা ভাবছে বিদ্যুৎ বিভাগ। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের কয়লার যে গঠন তার ক্যালোরিফিক ভ্যালু ভারতীয় কয়লার চেয়ে অনেক ভালো। এতে আর্দ্রতার পরিমাণও ভারতের কয়লার চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশী কয়লার তাপ উৎপাদন শক্তি বেশি হওয়ায় কম কয়লা ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তাছাড়া এ কয়লা ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি নষ্টের ঝুঁকিও কম।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ভারতীয় কয়লার এ ঝুঁকির বিষয়টি এতদিন বিদ্যুৎ বিভাগও বলে আসছে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির কয়লা চুরির ঘটনায় সৃষ্ট সংকটে এখন সেই কয়লাই আমদানির কথা ভাবছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আমদানির বিষয়টি পর্যালোচনায় ১২ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বণিক বার্তাকে বলেন, কয়লার স্পেসিফিকেশন ও দ্রুত আমদানিÍ এ দুই বিষয় যাচাই করে দেখতে কমিটি করা হয়েছে। বড়পুকুরিয়ার কয়লার সঙ্গে যদি ভারতের কয়লার মিল পাওয়া যায়, তাহলে সেখান থেকেও আমদানি করা হবে।
ভারতীয় কয়লায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণই করা হয় কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু ও অ্যাশ কনটেন্ট বিবেচনায় নিয়ে। সাময়িক বিভ্রাটের জন্য নিম্নমানের কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালালে সেটাও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্ষতিকর। যেটা আমরা কখনো করতে পারি না। অন্যদিকে খনি কর্তৃপক্ষ নতুন কয়লা উৎপাদন শুরু করতে যদি বেশি সময় নেয়, সেক্ষেত্রে চাহিদা মেটাতে কয়লা আমদানি করতে হবে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে যদি অক্টোবরের আগে কয়লা না পাওয়া যায়, তাহলে আমদানি করেও লাভ হবে না। কারণ ততদিনে বড়পুকুরিয়ায় কয়লা উত্তোলন শুরু হয়ে যাবে। তাই মানসম্পন্ন কয়লা দ্রুত আমদানির ক্ষেত্রে যেসব মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা দরকার, সেজন্য একটি কমিটি করা হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলিত কয়লায় ক্যালোরিফিক ভ্যালু প্রতি কেজিতে ২৫ দশমিক ৬৮ মিলিজুলস বা ৬ হাজার ৭২ কেসিএএল। এতে অ্যাশের পরিমাণ ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। এছাড়া আর্দ্রতা থাকে ১০ ও ফিক্সড কার্বন ৪৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ থাকে ভোলাটাইল ম্যাটার ও দশমিক ৫৩ শতাংশ সালফার।
অন্যদিকে ভারতীয় প্রতি কেজি কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু ৪ হাজার ৯৪০ থেকে ৬ হাজার ২০০ কেসিএএল। এ কয়লায় আর্দ্রতার পরিমাণ ১৫-৩৫ শতাংশ। এসব কারণে বড়পুকুরিয়ার ৫২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন যেখানে চার থেকে সাড়ে চার হাজার টন কয়লা পোড়াতে হয়, ভারতের কয়লা ব্যবহার করলে লাগবে এর দেড় থেকে দুই গুণ। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম. তামিম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ভারতের কয়লায় সালফারের পরিমাণ অতিমাত্রায় বেশি। ওই কয়লা বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হলে বয়লার ও টিউব নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তবে বয়লার ও টিউবের জন্য সহনশীল মাত্রায় সালফারযুক্ত কয়লা পাওয়া গেলে আমদানি করতে কোনো সমস্যা নেই। সতর্কতার সঙ্গে প্রকৌশলীদের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে।
এদিকে দেশে কয়লার উত্তোলন ও ব্যবহার হলেও এ-সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। কয়লার উৎপাদন, বিপণন, আমদানি ও ব্যবহারে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ২০০৪ সালে। উন্মুক্ত পদ্ধতি, নাকি ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে, সেটিও উল্লেখ থাকার কথা ওই নীতিমালায়। কিন্তু গত ১৩ বছরেরও ওই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি।
ফলে নীতিমালা ছাড়াই ২০০৫ সাল থেকে চলে আসছে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন ও বিপণন। কয়লা উত্তোলনের পরিমাণ, ব্যবহার ও বিপণন-সংক্রান্ত সঠিক তথ্য কখনই রাখা হয়নি। কয়লা বিক্রি নিয়ে হয়েছে ব্যাপক পরিসরে দুর্নীতি। সম্প্রতি ১ লাখ ৪৬ হাজার টন কয়লা উধাও হওয়ার পর দীর্ঘদিনের অনিয়ম জনসম্মুখে এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য রাখা ওই কয়লার সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ছিল রংপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রধান উৎস। এটি বন্ধের কারণে উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এখন বাধ্য হয়ে এটি চালু রাখতে কয়লা আমদানির দিকে যাচ্ছে সংস্থাটি।
কয়লা নীতির গুরুত্ব তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী কামরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, সব আমদানিকৃত কয়লার গুণগত মান যে নিম্নমানের তা নয়। ভারতের কিছু খনির কয়লার মান ভালো। তবে যদি নীতিমালা থাকত, সেক্ষেত্রে বড়পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কোন কয়লা উপযোগী, সেটি যাচাই-বাছাই করা যেত।
বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার ও ২০৪১ সাল নাগাদ ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন করা হবে ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ। এ পরিমাণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের জন্য ২০৪১ সাল নাগাদ দেশীয় খনি থেকে উত্তোলনের পাশাপাশি আমদানি করতে হবে বছরে ছয় কোটি টন কয়লা। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা