নৈতিকতাবর্জিত ছাত্র রাজনীতি নিয়ে দুর্ভাবনা

আপডেট: নভেম্বর ১০, ২০১৯, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

মো. নূরল আলম


সম্প্রতি বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেশের ছাত্র রাজনীতির ভয়াবহ ও বীভৎস চিত্র উন্মোচন করেছে। বিগত ৬ অক্টোবর রবিবার রাতে কয়েকজন ছাত্র নেতা আবরারকে তার কক্ষ থেকে ডেকে ২০১১ নং কক্ষে নিয়ে যায়। তারপর কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর শুরু হয় মারধর। প্রায় দশ এগার জন ছাত্র দীর্ঘ প্রায় ৬ ঘণ্টা ধরে তার ওপর বর্বরোচিত শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং তাকে সবাই মিলে পিটিয়ে হত্যা করে। এটা কোনো সাময়িক ক্রোধের বশে আকস্মিক আঘাত ছিল না। রীতিমত আগে থেকে পরিকল্পনা করে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। নিহত আবরার বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি শেরে বাংলা হলের ১০১১ নং কক্ষে থাকতেন।
আবরারের অপরাধ কী ছিল? তাকে শিবির বলে সন্দেহ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দর ব্যবহার এবং পানি বণ্টন ও গ্যাসের আদান প্রদান সম্পর্কিত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে তিনি তার পেজবুকে সমালোচনামূলক পোস্ট দিয়েছেন। আবরার শিবিরের সদস্য ছিলেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সরকার দেশ পরিচালনা করে এবং দেশের কল্যাণে সরকার মনে করলে অন্য কোনো দেশের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা বা চুক্তি করতে পারে। সরকারের গৃহিত সব কর্মকাণ্ড বা নীতি কৌশল সবার পছন্দ হবে এমন কোনো কথা নেই। সে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা দল ভিন্নমত প্রকাশ করতেই পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা সরকারকে সতর্ক ও ক্ষেত্র বিশেষে শক্তিশালী করে। এটাই গণতন্ত্র ও উন্মুক্ত সমাজের প্রচলিত নিয়ম। তাই কেবলমাত্র ভিন্নমত প্রকাশের জন্য এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হবে এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। নিঃসন্দেহে এটা একটা কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং তা দলমত নির্বিশেষে সকলের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। কেউ ভিন্নমত প্রকাশে সীমা লঙ্ঘন করলে তার জন্য আইন আছে। কিন্তু একজন ব্যক্তি অন্যের সংবিধানসম্মত অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সমাজের সচেতন মানুষ এ মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে দারুণভাবে মর্মাহত ও শঙ্কিত হয়েছে।
ইতোমধ্যে আমরা সবাই জেনেছি – এ পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের হোতারা সবাই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য। না, ছোট খাটো কোনো সাধারণ সদস্য নয়। এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিতে পদ পদবির অধিকারী- রীতিমত পরাক্রমশালী ও ক্ষমতাবান সদস্য। প্রশ্ন জাগে, এ কোন ছাত্রলীগ? বাংলাদেশের প্রাচীনতম সংগঠন ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগের সদস্য হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা এদের নেই। এদের একটাই পরিচয়, এরা ছাত্র নামধারী হত্যাকারী এবং সে বিচারে হয়তো বা তারা অপরাধ জগতের সদস্য।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অনেক বড় একটি ছাত্র সংগঠন। এ সংগঠনের শত শত নেতাকর্মী ও হাজার হাজার সমর্থক রয়েছে। এদের মধ্যে নিঃসন্দেহে অনেক দেশ প্রেমিক, সুরুচি সম্পন্ন ও ভদ্র নেতাকর্মী রয়েছে। তাদেরকে বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে পেশিশক্তির অধিকারী এরকম পিশাচ ও সন্ত্রাসী সদস্যদেরকে কেন দায়িত্ব দেয়া হয়? এরা শুধু নিজেদের সংগঠন নয়, তাদের মূল রাজনৈতিক দল এবং সমাজ ও দেশের জন্য যে কতটা ভয়ংকর ও ক্ষতিকর তা তো দেখাই যাচ্ছে।
বুয়েট একটি উন্নত মানের ও মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কেবলমাত্র উচ্চ মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরাই এখানে পড়ার সুয়োগ পায়। যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভর্তি হয়ে থাকলে এই হত্যাকারীদেরকেও মেধাবী বলতে হবে। কিন্তু এ কিসের মেধা? মানুষ খুন করতে তাদের হাত যদি একটুও না কাঁপে, তাহলে বলতে হবে এরা মেধাবী নয়, এরা পেশাদার খুনি। এসব তথাকথিত মেধাবী হত্যাকারীদের এ দেশে কোনো প্রয়োজন নেই। বিচারের কাঠগড়ায় উপযুক্ত শাস্তি এদের প্রাপ্য।
বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের অকুতোভয় দেশপ্রেমিক সৈনিকরা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। সে সময়ের ছাত্র রাজনীতির উল্লেখযোগ্য নেতা নেত্রীরা ছিলেন – শেখ ফজলুল হক মনি, আসমত আলী সিকদার, সিরাজুল আলম খান, রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের আবু সাঈদ, সরদার আমজাদ হোসেন, আবদুর রাজ্জাক প্রমূখ। দেশপ্রেমে উদ্দীপ্ত এসব ছাত্র নেতা আওয়ামী লীগের ৬ দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার ভিত্তিতে উনসত্তরের আইউব বিরোধী আন্দোলনে দেশ ও দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বার্থে আপোসহীন সংগ্রাম করেছেন এবং এ জন্য তারা জেল, জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়নকে মাথা পেতে নিয়েছেন। কিছু বিভাজন সত্ত্বেও সেই ছাত্র আন্দোলন ষাটের দশকের শেষ পর্যন্ত দুঃশাসন বিরোধী প্রতিবাদী ধারা প্রবল শক্তিতে ধরে রাখতে পেরেছিল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তাই সেই ছাত্র রাজনীতির নেতা নেত্রীরা দেশ ও সমাজের মানুষের কাছে ছিলেন সমীহ ও ভালবাসার পাত্র। ভাবতেও অবাক লাগে, সে সময়ের ছাত্র রাজনীতির উত্তরসূরি আজকের এই ছাত্র রাজনীতির এমন করুণ দশা কীভাবে ঘটল? সেই ঐতিহ্যমণ্ডিত ছাত্র রাজনীতি সময়ের বিবর্তনে কী করে এতটা মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বর্জিত এবং কলঙ্কিত হয়ে পড়ল ?
ছাত্র রাজনীতির এই অসুস্থ ধারা একদিনে গড়ে ওঠেনি। স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিক পরিবেশে যে নৈরাজ্যের ব্যাপক প্রকাশ ও সৃষ্ট অনাচার ও দুর্নীতি তা শুধু সমাজ ব্যবস্থাকেই আঘাত করেনি, তা ক্ষমতাসীন ছাত্র রাজনীতিকেও ক্রমান্বয়ে ব্যাপকভাবে দূষিত ও নীতিভ্রষ্ট করেছে। স্বাধীনতার পরে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, হানাহানি এবং তাদের অন্যায় দাবি আদায়ের অজুহাতে শিক্ষক ও প্রশাসনের ওপর চড়াও হওয়া ও নির্যাতন চালানের মত নীতিহীন ও উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ড চলেছিল বছরের পর বছর ধরে। বিচারহীনতা ও লেজুরবৃত্তির রাজনীতি ছাত্র নেতাদের এহেন সন্ত্রাসী আচরণের মূল কারণ- এ কথা সহজেই বলা যায়। আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিবর্তে বিত্তবৈভবের আকর্ষণ তাদেরকে করেছিল নীতিবিচ্যুত। দুই সামরিক শাসক মেধাবী ছাত্রদের একাংশকে কাছে নিতে সক্ষম হয়। দেয়া হয় অর্থসহ নানা রকম প্রলোভন। তাছাড়া পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা বিরোধী ইসলামী ছাত্র শিবির জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় সংঘর্ষ, হানাহানি ও হত্যার রাজনীতি করেছে। সৈ¦রশাসনের অবসানের পরেও রাজনৈতিক দলের শাসনে পরিচালিত ছাত্র রাজনীতি এ পথভ্রষ্ট অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ক্ষমতাসীন বা সাময়িক বিরোধী দলের আশ্রয়- প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্র রাজনীতির নামে চরম নীতিহীনতার রাজনীতির প্রকাশ ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় আজকে দেখতে হয়, ডাকসুর সোনালি যুগের ছাত্র রাজনীতির স্থান দখল করেছে এমন এক নৈতিকতাবর্জিত রাজনীতি যার অশুভ স্পর্শে দুর্দশাগ্রস্ত হয়েছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়।
কথিত ছাত্র নেতাদের নিত্যদিনের অপকর্মগুলো হলো- টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, নির্মাণ কাজ থেকে চাঁদা বা কমিশন আদায়, ভর্তি বাণিজ্য, হল দখল ও সিট বাণিজ্য, র‌্যাগিং এর নামে নবাগত শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক নির্যাতন এবং সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে হলে হলে ‘টর্চার সেল’ বসিয়ে ভিন্নমতের সহপাঠী শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। পত্রিকার তথ্য, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ১৩ টি হলে’ প্রায় অর্ধশত ‘টর্চার সেল’ রয়েছে। খবরটি সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে- সেই বিশ^বিদ্যালয়ে কি কোনো প্রশাসন নেই? প্রশাসন থাকলেও কি সেখানকার শিক্ষক কর্মকর্তাদের নীতি- নৈতিকতা ও দায়িত্ব- কর্তব্যবোধ একেবারে লোপ পেয়েছে ?
২৯/১০/২০১৯ তারিখের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‘ডার্ক নাইট- গেষ্ট রুম’ আতঙ্ক শিরোনামে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বুয়েট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থীদের জন্য সিট বরাদ্দের একক ক্ষমতা ছাত্রলীগের। আরও আশ্চর্যের বিষয়, বাকৃবিতে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে রাতে গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে নিয়ম-কানুন শেখানোর নামে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এভাবে হল ভেদে প্রথম বর্ষের বাছাই করা শিক্ষার্থীদেরকে প্রথম ৬ মাস এই ‘ডার্ক নাইট’ বা ‘গেস্ট রুম কালচারের’ মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সিনিয়র ছাত্রলীগ ভাইয়াদের এরকম নির্দেশ নির্যাতন মুখ বন্ধ করে পালন করলে হয়তো হলে সিট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া ছাত্র নেতাদের কীভাবে সালাম দিতে হবে, আওয়ামী লীগের নীতি আদর্শ কী, কীভাবে স্লোগান দিতে হবে, মিছিলে অংশগ্রহণ করা এ বিষয়গুলো সিনিয়র নেতারা কঠোরভাবে শিখিয়ে দেন। শুধু সালাম দিলেই হবে না। কতটা আন্তরিকভাবে ও সশব্দে সালাম দেয়া হলো তা যাচাই করা হয়। ডাইনিং ছাড়া অন্য কোথাও খাওয়া নিষেধ। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা বাড়ি বা অন্য কোথাও যেতে হলে নেতা ভাইয়াদের কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করতে হয়। কোনো শিক্ষার্থী শিখিয়ে দেয়া এসব নিয়ম না মানলে বা ভুল করলে তাকে গেস্ট রুমে ডেকে নিয়ে চড়-থাপপড় ও স্ট্যাপ পেটা করা হয়, এমন কি হল থেকে বের করেও দেয়া হয়। নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানের মিছিলে অংশ গ্রহণ করা প্রথম বর্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক। একটু ভিন্ন ধরনের হলেও মেয়েদের তিনটি ছাত্রাবাসে ছেলেদের হলের আদলে গেস্টরুম কালচার চালু আছে, তবে মাত্রাটা কম। বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে হলসংশ্লিষ্ট শিক্ষক কর্মকর্তারা সবাই এটা জানেন। কিন্তু তাঁদের কথা, তাদের কিছু করার নেই।
পত্রিকার খবর, বুয়েটের তিন ছাত্র হলে ৭ টি টর্চার সেল রয়েছে। সেখানে লাঠি, স্ট্যাম্প সব প্রস্তুত রাখা হয়। এ খবরটি কি জানা ছিল না বুয়েটের প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের? শিক্ষার্থীদের দেয়া তথ্য, নিহত আবরারকে নির্যাতন করা ২০১১ নং কক্ষে প্রায়ই মদের আড্ডা বসত। শুধু বুয়েট বা ঢাবি নয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে হলে ‘টর্চার সেল’ বসিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরে এনে তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তাদেরকে শিবির বা ছাত্রদল কর্মী হিসেবে প্রচার চালানো হচ্ছে (কালের কন্ঠ-৮.১০.১৯ ও ৩০.১০.১৯)। সম্প্রতি রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগের একটি টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। কয়েকদিন আগে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ জনাব ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে টেনে হিঁচড়ে ক্যাম্পাসের ভেতরের পুকুরে নিক্ষেপ করেছে। তার অপরাধ ছিল, তিনি প্রতিষ্ঠানের জনৈক অনিয়মিত ছাত্র নেতাকে পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য নিয়ম অনুযায়ী তার অভিভাবককে আনতে বলেছিলেন।
বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষকরা বোধকরি দলীয় রাজনীতি নিয়ে এতটাই স্বার্থান্ধ থাকেন যে এসব অমানুষিক ঘটনাগুলোর সবকিছু জেনে বুঝেও তারা নিরব থাকেন। অনুধাবন করতে কষ্ট হয় না, বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতির ফলে শিক্ষক গোষ্ঠীর বিভাজনের সুযোগে এবং মাননীয় উপাচার্যের উদাসীনতার ফলে ছাত্র রাজনীতির এই ক্রমবর্ধমান অপকর্ম। র‌্যাগিংয়ের নামে নিরীহ নতুন শিক্ষার্থীদের নির্যাতিত হওয়ার ঘটনায় বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা নিয়েছে? ক্ষমতাসীন দলের লেজুরবৃত্তি করা শিক্ষকরা ওই সব অনাচারের বিরুদ্ধে কখনোই সোচ্চার হননি। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে তারা ন্যায়নীতি, নৈতিকতা ও রুচিবোধ সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন। যদি আগে থেকেই বিশ^বিদ্যালয়ের প্রশাসন ও সকল শিক্ষক কর্মচারী একযোগে এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করত তাহলে সম্ভবত পরিস্থিতির এতটা অবনতি হতো না।
কেউ কেউ বলে থাকেন, ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয় প্রশ্রয়ে ছাত্র রাজনীতির এই অধঃপতন। দলের দুচারজন নেতা এ বিষয়ে জেনেও মুখ বন্ধ রেখেছেন এটা সত্য হতে পারে। কিন্তু দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এ ক্ষেত্রে কোনো রকম আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়েছে বা দিচ্ছে- এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য না। মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর মতই ন্যায় ও সততার পক্ষে শতভাগ নিবেদিত। তাঁর নির্দেশে সারা দেশে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে যে শক্তিশালী অভিযান চলমান রয়েছে তা থেকে ছাত্র রাজনীতিসহ সব রকম দুষ্ট রাজনীতিতে সংস্কার সাধিত হবে এটা আশা করা যায়।
প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ঐক্যবদ্ধ সাধারণ ছাত্ররা আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। এ শক্তিশালী প্রতিবাদ ও আন্দোলন বুয়েটের বিষকুম্ভকে ভেঙ্গে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের এই প্রতিরোধ আন্দোলন আবরার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার দাবি করেছে। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতা ও দায়িত্বহীনতার জন্য ক্ষোভ ও অনাস্থা প্রকাশ করেছে।
বুয়েটের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ফলে বর্তমান ছাত্র রাজনীতি নিয়ে একটি কঠিন ও জটিল প্রশ্নের উদ্ভব ঘটেছে। বুয়েটের ছাত্র আন্দোলনের ১০ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম দাবি হলো ছাত্র রাজনীতির নিষিদ্ধকরণ। অনেক সময় ধরে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত নিরীহ সাধারণ ছাত্রদের পক্ষে এমন দাবি উত্থাপন করা স্বাভাবিক। এটা তাদের পুঞ্জীভুত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ঘাতকদের দাপটে এবং কর্তৃপক্ষ ও সরকারের পরোক্ষ সমর্থনের কারণে এতদিন তাদের মুক্ত চিন্তার প্রকাশ ঘটানো সম্ভব ছিল না।
এখন উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতির বর্তমান অবস্থার আমূল পরিবর্তন বা সংস্কার দরকার। কেননা ছাত্র নেতাদের এরকম অপকর্ম অব্যাহতভাবে চালু থাকার ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যার প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে পরীক্ষার ফলাফলে। সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ক্রমশ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে সামগ্রিকভাবে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার ব্যাপারে আরও পর্যালোচনা ও বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে শিক্ষক রাজনীতি অবশ্যই নিষিদ্ধ হওয়া উচিৎ। শিক্ষকগণের কাজ শিক্ষাদান ও শিক্ষা সম্পর্কিত কাজে যুক্ত থাকা। দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে নিতান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায়কে অগ্রাধিকার দেয়ার ফলেই আজ শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র নেতাদের অন্যায় কাজকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না, শিক্ষার পরিবেশও ভাল রাখা যায় না।
ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে ভিন্নমত থাকতে পারে। ক্ষুব্ধ অভিভাবক মহল ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে। কেউ মনে করেন, স্থায়ীভাবে না হলেও অন্তত ৩/৪ বছরের জন্য ছাত্র রাজনীতিকে বন্ধ রাখা দরকার। অন্য একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের মতে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক বা সংশ্লিষ্টতা থাকা ঠিক না। কিন্তু অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি মনে করেন, সুস্থ ও গঠনমূলক রাজনীতি ছাত্রদের শিক্ষা সক্ষমতা ও মেধার বিকাশ ঘটায়। তাই ছাত্র রাজনীতি একেবারে নিষিদ্ধ করা হলে পরিণামে সমাজে মেধা সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
মূল কথা হলো- শিক্ষাঙ্গনে সকল শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা, ন্যায়নীতি, আদর্শ ও সুস্থ মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে শান্তি শৃংখলা ও নিয়ম নীতি বজায় রেখে ছাত্ররা শিক্ষা সমস্যা নিয়ে রাজনীতি করবে এটাই কাম্য। বিশেষ প্রয়োজনীয় সময়ে জাতীয় স্বার্থে ছাত্ররা মূল দলের সহযোগী শক্তি হিসেবে রাজনীতি করতে পারে। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতির নামে অরাজকতা ও সন্ত্রাস সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট ছাত্র বা ছাত্রদেরকে অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকবে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের ওপর। সেক্ষেত্রে মূল দলের কোনো রকম প্রভাব বা হস্তক্ষেপ থাকা সমীচীন হবে না। প্রয়োজনে ছাত্র রাজনীতির কাঠামো ও কার্যক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে তা স্থায়ীভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। বলা বাহুল্য, এভাবে ছাত্র রাজনীতিকে ঢেলে সাজানোর পক্ষে রাজনৈতিক দলসমূহের সদিচ্ছা থাকতে হবে।
নিবন্ধকার: প্রাক্তন চেয়ারম্যান, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড