নৈরাজ্য-অরাজগতার অবসান হোক

আপডেট: নভেম্বর ১৯, ২০১৯, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


দেশে কোন্ অতল অন্ধকারে ষড়যন্ত্র আর শঙ্কা-ত্রাসের ভয়ঙ্কর শার্দুল উঁকি দিচ্ছে। রাজনীতি ও সরকারেও তার আলামত পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুযোগের অপেক্ষায় ওরা সবখানেই ওঁৎ পেতে আছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার আগেরও এমন দমবন্ধ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিলো। কানাকানি-ভ্রুকুুটি এবং চোখাচোখি করে ষড়যন্ত্রকারীরা জনমনে সৃষ্টি করে আতঙ্ক। বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন হলে তারা পায় সোনার খনি, হীরের খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ আরো বলেছিলেন, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আট কোটি কম্বল, আমারটা কই!’ সে সময়ও দুর্নীতিবাজেরা একত্রিত হয়েছিলো এবং তারা অধিকাংশই ছিলো দলের নেতা-কর্মী। অবিকল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদক-ক্যাসিনো আর ঘুস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন, তখন তার দলের নেতা-পাতিনেতা ভীষণ মনখারাপ করে বসলেন। মনখারাপঅলারা দল পাকিয়ে সরকারের বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছেন। মোস্তাকের মতোই বসছেন তাঁর পাশে। প্রতিপক্ষরাও বসে নেই। ইতোমধ্যেই প্রচার করছেন অনেক নেতা-তথাকথিত সমাজকর্মীরা বলে বেড়াচ্ছেন, ক্যাসিনোঅলাদের ধরছেন, বৈতরণি পাড়ি দিতে পারবেন তো? ওরাই তো অর্থ ও জনবল দিয়ে জমায়েত সফল করেছে। ওরাই নির্বাচনে ভোটার সংগ্রহে নিরলস কাজ করেছে। কে বলেছিলো আপনাকে জুয়া খেলতে। আপনি সেখানে যাবেন, হারবেন। লুটবে কড়ি পর্দার অন্তরালে যারা আছে কুশীলব, তারা। তবে জিতবেন কেউ কেউ। আপনি যাবেন না, হারবেন না জিতবেনও না। ওদের শক্তিতে যদি সরকার টেকে তো ক্ষতি কি? এ ছাড়াও রয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, যার দুঃখজনক পরিণতির শিকার হয়েছিলেন নবাব সিরাজ। অন্যদিকে দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের বিরুদ্ধে দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগ, রেল দুর্ঘটনা, নারী নির্যাতন-ধর্ষণ, পুড়িয়ে মারা, দলীয় নেতাদের দুর্নীতি-ভূমিদস্যুগিরি, চাঁদাবাজি সরকারকে করেছে আরো বিভ্রান্ত। বিতর্কিত। নষ্ট করেছে ভাবমূর্তি। রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, অপরাধীর শাস্তির আয়োজনে ক্ষমতাধরেরা বিমুখ। একা হাসিনা লড়ছেন। তাঁর পাশে যাঁরা অবস্থান করছেন, তাদেরই বা ক্ষমতা কতোটা, সেটাই এখন প্রশ্ন। তবে কি ক্ষমতাবানেরা আরো ক্ষমতা, আরো অর্থ-বিত্ত-বিলাসের অধিকারী হতে চায়?
বাংলাদেশ কেবল নয়, উপমহাদেশের রাজনৈতিক খেলাই যেনো অভিন্ন। পাকিস্তানে ইমরান খানের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার বাজারে চালু রয়েছে। ভারতের মোদি বিরোধী কথাও তার সমান্তরালে চলছে। কাশ্মীর ইস্যু, রামমন্দির বিতর্ক, সবই একত্রিত হয়ে মোদির কৌশলকে অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করছে ভারতীয় উপমহাদেশ। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, দলীয় নেতা ও আমলাদের লাগামহীন দুর্নীতি, মূল্যবোধহীনতার রাজনীতিক সংস্কৃতির মিথ্যে অভিযোগ উত্থাপন করে সরকারের মূলোচ্ছেদের পথ সুগম করছে। সরকার প্রধানকে জ¦লন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করছে এই দুর্বৃত্তরা। তারা জনবিচ্ছিন্ন তৃতীয় শক্তির উত্থানকে তারা স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বলা যায়, যে দল ও সরকার প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলবে, তারাই হবে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিপক্ষ। দালাল-তাঁবেদার। অথচ তাদের সহযোগিতা ব্যতিত দেশ চলতে পারছে না। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে এ দেশে তার মূল্য আকাশচুম্বি হলো। মূল্য বৃদ্ধি এবং কমানোর সিন্ডিকেট তৈরি হলো। তারাই এখন নিয়ন্ত্রণ করে বাজার। মন্ত্রী হন ঠুটো জগন্নাথ। এ ভাবে আর কতোকাল চলবে? জনগণ সত্যি এই রকম ছোট ছোট ব্যর্থতার কারণে বিতৃষ্ণ-আস্থাহীন হয়ে উঠছে। সামনের দিনগুলো সরকার কীভাবে মোকাবেলা করবেন? কামাল আতাতুর্ক আর মহাথির মোহাম্মদ হওয়ার বিকল্প কি সামনে আছে? দেশবিরোধী অপরাধী দমনে জনগণকে নিয়ে এগোনোর বিকল্প নেই। সকল ষড়যন্ত্র, অন্যায় আর অনৈতিকতার বিরুদ্ধে একটি দল এবং দলের নেতৃবৃন্দের একমাত্র বিশ^াসভাজন জনগণ। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সরকার সাফল্য ও সাহসিকতা দেখিয়েছেন। শেষাব্দি গণ দাবির প্রেক্ষিতে কসাই কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুলতেই হয়েছে। দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সামনে আনতে হবে। তাদের হাতে তুলে দিতে হবে নেতৃত্ব। এর বিকল্প আছে কি? থাকলে প্রস্তাব আসুক। সবচেয়ে বড়ো বিষয়, এই মুহুর্তে ১৪ দলকে ডেকে আরো ক্রিয়াশীল করতে হবে। তাদেরও দায়িত্ব দিতে হবে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা এবং সম্প্রীতি রক্ষার লক্ষ্যেই তো ১৪ দলীয় ঐক্য গড়ে তোলা হয়। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে বাস্তবায়ন, চার দলীয় স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষা-বাণিজ্যে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সকলেই ছিলেন অঙ্গীকারাদ্ধ। দেশের সমৃদ্ধি-উন্নয়নে এবং জননিরাপত্তা নিয়ে আজকে যে প্রশ্ন জনমনে উঁকি দিচ্ছে, আমরা যারা সাধারণ তারা সামান্য হলেও অনুধাবন করছি, তা হলো সকল অপরাধের মূলে আছে সরকারের ভেতরে অবস্থানরত দুর্বৃত্তরা। এমন মন্ত্রী-এমপি নেই যারা ক্ষমতার অনৈতিক অনুশীলনের কারণে আজকে তাদের অবস্থা ফিরিয়েছেন। জিরো থেকে হিরো। রাতারাতি তাদের অনেকেই আঙুল ফুলে কলাগাছ। আমি লিখছি মাঠ পর্যায়ের রিডিং নিয়ে। এটা জনমত। লাঠি মেরে কোনো প্রতিবাদী মিছিল-আন্দোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করা যায়, কিন্তু মন বদল করা যায় না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে যা হচ্ছে, হচ্ছে রংপুর রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ে, তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা পরও সরকার তাদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন, বক্তব্যও দিচ্ছেন। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। যারা উপাচার্য তারা কি অনিবার্য? তারা ব্যতিত আর কেউ বিশ^বিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারবেন না? তারাই কেবল যোগ্য ও বিশ^স্ত নন, দেশে আরো অনেকেই আছেন, যারা শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ রক্ষা করে প্রতিষ্ঠান বিধিবদ্ধভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। একজন উপ-উপাচার্য, যার পরিবার চিহ্নিত স্বাধীনতা বিরোধী, তার নিয়োগ বাণিজ্যের তথ্যচিত্র ভাইরাল হলো, কিছু শিক্ষক তার প্রতিবাদও করলেন, সেই তথ্যচিত্র কতোটা যথার্থ তা প্রমাণের জন্যে সরকারও নন, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনও কোনো তদন্ত করলেন না। ফোনালাপ প্রকাশিত হলে অভিযুক্ত একটা সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি অন্যের ওপর সমুদয় দায় চাপিয়ে নিজেকে মুক্ত করার অপচেষ্টা করেছেন। সরকার ও বিশ^বিদ্যালয়ের দায়িত্ব ছিলো তদন্ত করে সত্যোদ্ঘাটন করা। করেন নি। বরং বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে এবং তার পরিবার কতোটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, সেটা বলতেই বেশি আনন্দবোধ করেন। অপরাধী এবং অপরাধীকে আড়াল করা সমঅপরাধ। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সেটা প্রমাণিত।
দেশের ব্যাংক-বিমা-শেয়ার বাজার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে লুটেরা শ্রেণি। লুটপাট করে তারা অর্থ বিদেশে পাচার করে। একজন পুলিশ অফিসার বিদেশে দেড়হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। জমি রেজিস্ট্রার ঘুসের টাকাসহ হাতেনাতে ধরা পড়ে। অসুধ ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ, মূল্য তার লাগামহীন। চিকিৎসা সেবাও ক্যাসিনোতুল্য। সেখানে যে রোগী যাবে, তার ঘটিবাটি সব বিক্রি করতে হবে। একজন চিকিৎসক নানা টেস্ট করে সাতদিন পর দেখা করার পরামর্শ দেন। সাতদিন পর রোগী গেলে আরো এগারো রকম টেস্টের নির্দেশ লিখেন। প্রতিদিন ভারতে রোগী যাচ্ছে, সঙ্গে যাচ্ছে দেশের শত শত কোটি টাকা। শিক্ষাঙ্গনেও বাণিজ্য। শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়তে কিংবা তার কোচিংয়ে না পড়লে শিক্ষার্থীকে ফেল করিয়ে দেয় বা কম নম্বর দেয়। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েই লাইব্রেরিতে যান না। অন লাইন থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। কিন্তু মূলটা পড়েন না। লাইব্রেরি শূন্য। পাঠক নেই। কিন্তু আড়ম্বর আছে। তাহলে মূল্যবোধ কী ভাবে অর্জিত হবে? ঘুসখোর-দুর্নীতিবাজ আর দুর্বৃত্তদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই সব চলছে দেশময়। সরকার তাদের শাস্তি দিতে পারছেন না। শাস্তি দিতে গেলেই বুদ্ধিজীবীরা বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বেজায় বকাবকি করছেন। বিদ্যুৎ চাই, কিন্তু কোথাও সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র করলেই পরিবেশ দুষণের অভিযোগ তুলে তা বন্ধ করার জন্যে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। তাহলে বিদ্যুৎ কি হাওয়া থেকে আসবে? সোলার কি সবাই ব্যবহার করার সামর্থ রাখে? আমাদের নেতারা যা বোঝেন না, তারও মুখরোচক বয়ান দেন। আঁতাত করেন দেশবিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে। ‘তেঁতুল হুজুর’-এর লক্ষ্য ও সাধ পূরণ করে দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির কি খুব উন্নয়ন হয়েছে? দুর্বৃত্তের সংখ্যা তাহলে বৃদ্ধি পাবে না কেনো? সরকার পারেন না এমন কাজ নেই কোনো দেশে। পিঁয়াজ-সিন্ডিকেটে কারা যুক্ত সরকার তা জানে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। কারণ সিন্ডিকেটে সরকারের রাঘব-বোয়াল যুক্ত থাকা অস্বাভাবিক নয়। ক্যাসিনো-দুর্নীতির সঙ্গে তারা যুক্ত ও সহায়ক শক্তি, তা আজকে অনেকটাই স্পষ্ট। এ দেশের উৎপাদিত চিনি গুদামে পচে, জনগণ তার ভোক্তা হওয়ার সুযোগ পায় না। এ দেশে পাট-খাদ্যপণ্যের উৎপাদন মূল্য কৃষিজীবীরা পান না। কারণ দুর্নীতি। কৌশল গ্রহণের ত্রুটি। অথবা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ। প্রত্যাশা ছিলো সরকার হবেন সকল নিয়ন্ত্রণের নিয়ামক। দেশবাসীর সুবিধার লক্ষে তাদের কর্মসূচি হবে তর্কাতীত। জনগণও সে সম্পর্কে অবহিত। একটা সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করতে এই দুর্বৃত্তরাই যথেষ্ট। ইতোমধ্যে তার আলামত মিলেছে। তারপরও আমরা বিশ^াস করি, যারাই সকল ভয়-সঙ্কোচ আর দ্বিধা পেছনে রেখে জনগণের উন্নয়ন-কল্যাণ আর নিরাপত্তাসহ শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিজ্ঞান ভিত্তিক করে এবং ধন বৈষম্য কমাতে পারলে শেখ হাসিনার সরকার এই টার্মে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হবে। সরকারকে সে উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানাই।