পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তি : ছয় বছরে ২ হাজার কোটি ডলারের গরমিল

আপডেট: অক্টোবর ২২, ২০১৮, ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে পণ্য জাহাজীকরণ হয়েছে সাড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর বিপরীতে অর্থবছরটিতে দেশে অর্থ এসেছে সাড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে শুধু গত অর্থবছরই পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তিতে গরমিল হয়েছে ৪ বিলিয়ন ডলারের।
গত অর্থবছরই শুধু নয়, পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তির মধ্যে গরমিল থাকছে প্রতি বছরই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশে¬ষণে দেখা যায়, গত ছয় বছরে গরমিলের এ পরিমাণ ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে, দেশের জিডিপির (২০১৭-১৮ অর্থবছরের হিসাবে ২৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার) যা ৭ শতাংশের বেশি। আর গড় হিসাবে পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তিতে গরমিলের হার বছরে প্রায় ১০ দশমিক ৬ শতাংশ।
এনবিআর তার অধীনস্থ সংস্থার মাধ্যমে রফতানি পণ্যের জাহাজীকরণ বা শিপমেন্টের পরিসংখ্যান আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করে। সংস্থাটি থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে রফতানির পরিসংখ্যান জাতীয়ভাবে প্রকাশ করে ইপিবি। সংস্থাটির হিসাবে, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরে পণ্য রফতানি হয়েছে মোট ১৯ হাজার ৩৯৯ কোটি ডলারের।
জাতীয়করণকৃত এসব পণ্য বাবদ দেশে অর্থ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। সে তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, এ ছয় বছরে দেশে অর্থ এসেছে ১৭ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ ২০১২-১৩ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তির মধ্যে গরমিল প্রায় ২ হাজার ৫৩ কোটি ডলারের।
কেন এ গরমিল এবং জিডিপির হিসাবে এর প্রভাব পড়ছে কিনা, তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন এ প্রতিবেদক। এজন্য প্রথমেই যোগাযোগ করা হয় রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে। পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তিতে প্রতি বছর গড়ে ১০ শতাংশের এ গরমিলকে অনেক বেশি ও অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন তিনি। বণিক বার্তাকে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, যারা তথ্য সংগ্রহ করছেন, তাদের কোথাও না কোথাও অবশ্যই ভুল হচ্ছে। ব্যাংকের সরবরাহ করা তথ্যেও গ্যাপ থাকতে পারে। কিন্তু এত বড় পার্থক্য কোনোভাবেই হতে পারে না। বেশির ভাগ রফতানি আয় তো আমাদের পোশাক খাত থেকেই আসে। এত বড় গ্যাপ হওয়ার কোনো কারণ আমাদের খাতে ঘটেনি। ডিসকাউন্ট হলে ৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। এ পার্থক্যের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দেশের বাইরে সম্পদ গড়ে তোলার সম্পর্ক যদি থেকেও থাকে, তাহলেও ব্যবধানটা এত বেশি হওয়ার কথা নয়।
যদিও বিজিএমইএ সভাপতির এ দাবির উল্টোটাও দেখা যাচ্ছে। পণ্য জাহাজীকরণ হওয়ার পর অর্থ না আসার ঘটনাও ঘটছে। চামড়াজাত পণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রিসেন্ট গ্রুপ পণ্য রফতানি করলেও আয় বাবদ প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ফেরত আনেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাগজে-কলমে ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো চামড়াজাত পণ্য রফতানি করেছে হংকং ও ব্যাংককে। সেই রফতানি বিল ক্রয় করে গ্রুপটিকে নগদে টাকা দিয়েছে জনতা ব্যাংক। অথচ রফতানির টাকা ফেরত আসেনি। নগদে নেয়া টাকাও ফেরত দিচ্ছে না গ্রুপটি। ব্যাংক চাপ দিলে মাঝেমধ্যে কিছু অর্থ দুবাই থেকে আসছে। যদিও আমদানিকারক দেশ থেকেই টাকা আসার কথা। এসব তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এসব অর্থ পাচার করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
দেশে রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশের বেশি আসছে তৈরি পোশাক থেকে। রফতানির বিপরীতে অর্থ আটকে যাওয়ার কথা বলছেন এ শিল্পের মালিকরা। ২০১৭ সালে কোনো ঋণপত্র না খুলে ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে এক এক করে প্রায় ২০টি কারখানা যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওয়াইঅ্যান্ডএক্স লিমিটেডের পক্ষ থেকে ক্রয়াদেশ পায়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পোশাক তৈরি করতে চীন থেকে কাপড় আমদানি করা হয়। এ কাপড়ে তৈরি পোশাক রফতানি করা হয় যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বন্দর দিয়ে। কিন্তু সে পোশাক কেউ ছাড় করেনি। রফতানি করা পোশাকের বিপরীতে কারখানা মালিকরা কেউ অর্থও পাননি। এভাবে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার পোশাক রফতানি হলেও এর দাম না পেয়ে আইনের দ্বারস্থ হন সংশি¬ষ্ট মালিকরা। পণ্য রফতানির পরও অর্থ না পাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে আছে গিভেন্সি গার্মেন্টস লি., এএসটিএস অ্যাপারেলস লি., এটিএস পার্ল লি., ইউনাইটেড ট্রাউজার্স লি., পারফেক্ট ফ্যাশনস লি., আলিফ ক্যাজুয়াল ওয়্যার লি., ইন্ট্রাকো ডিজাইন লি., জ্যারিকো অ্যাপারেল, মিম অ্যাপারেলসসহ ২০-২৫টি কারখানা। এর মধ্যে সাতটি কারখানা এ ঘটনায় রাজধানীর বাড্ডা থানায় অভিযোগ দায়েরের মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
এনবিআর, ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ছয় অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশি গরমিল ছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছর, ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থবছরটিতে প্রায় ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হলেও দেশে এসেছে প্রায় ৩ হাজার ২৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছর পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তির মধ্যে গরমিলের পরিমাণ ৪৩৬ কোটি ডলার। এরপর সবচেয়ে বেশি গরমিল দেখা গেছে ২০১২-১৩ অর্থবছর, ১২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থবছরটিতে ২ হাজার ৭০২ কোটি ডলারের রফতানি হলেও দেশে এসেছে ২ হাজার ৩৭৫ কোটি ডলার। এছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছর এ ব্যবধান ছিল ৯ দশমিক শূন্য ২, ২০১৪-১৫ অর্থবছর ৬ দশমিক ৫৭, ২০১৫-১৬ অর্থবছর ১১ দশমিক ৬৮ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছর ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ।

ডিসকাউন্টকেই পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তির মধ্যকার এ ব্যবধানের বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ ব্যাংকসংশি¬ষ্টরা। এছাড়া অনেক সময় মানহীন পণ্য ফেরত আসার কথাও বলছেন তারা। তবে এ ব্যবধান প্রতি বছর গড়ে ১০ শতাংশের বেশি হতে পারে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রেতা ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট নেন। পণ্যের মানের ওপরও নির্ভর করে অনেক কিছু। অনেক সময় দেখা যায়, ক্রেতা পণ্য একেবারেই নিতে চাইছেন না। তখন দেখা যায়, ৩০ শতাংশ ডিসকাউন্টেও রফতানিকারক পণ্য বিক্রি করছেন। এতে রফতানি আয় ও প্রকৃত আয়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
এর আড়ালে কোনো ধরনের অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে সিরাজুল ইসলাম বলেন, রফতানি নিয়ে আমাদের নিয়ম-নীতি আছে, আমদানি-রফতানিকারক যেন কোনো ধরনের মিস কন্ডাক্ট না করেন, নিয়ম-নীতি ভঙ্গ যেন না হয়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময়ই সতর্ক। রফতানিকারক অর্থ আনতে না পারলে তার নতুন ঋণপত্র আর খোলা হয় না। এ বিষয়গুলোয় বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ছাড় দিচ্ছে না। তবে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের অনেকে দেশের বাইরে সম্পদ গড়ছেন। কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে নিজেদের সম্পদ গড়ে তুলছেন তারা।
বহির্বিশ্বে ব্যবসায়ীদের এ সম্পদ গড়ার সঙ্গে পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তির গরমিলের সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, সুযোগ তো আছে। ধরুন, একজন রফতানিকারক বললেন তার ক্রেতা পণ্যের মান নিয়ে সন্তুষ্ট হননি। প্রতি ১০০ ডলারে ১০ ডলার ডিসকাউন্ট চাইছেন ক্রেতা। এটা তো রফতানিকারক ও ক্রেতার সমঝোতাও হতে পারে। ক্রেতা যেন সন্তুষ্ট না হন, এ সমঝোতাও হতে পারে।
যদিও যে পরিমাণ পণ্য রফতানি হলো, তার সমপরিমাণ অর্থ দেশে আসতে হবে বলে মনে করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, যদি রফতানির সমপরিমাণ অর্থ না আসে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। এটা নির্ভর করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থার ওপর। তারা যদি নিয়ম-নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ আনার বিষয়ে কঠোর হয়, তাহলে এ পার্থক্য কমে আসবে।পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তির এ গরমিল জিডিপির হিসাবে কোনো প্রভাব ফেলছে কিনা, সে উত্তর খোঁজারও চেষ্টা করেছেন এ প্রতিবেদক। এজন্য কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, কিছুটা প্রভাব থাকতে পারে, তবে কোয়ান্টিফাই করা কঠিন। আমাদের জিডিপির হিসাব সেক্টরাল আউটপুট দিয়ে ক্যালকুলেট করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় কনজাম্পশন, ইনভেস্টমেন্ট, এক্সপোর্ট, ইমপোর্ট বিবেচনায় নেয়া হয়, সেখানে হয়তো এ পার্থক্যের বিষয়গুলো সমন্বয় করা হয়। এ পার্থক্য শুধু রফতানিতে নয়, রাজস্ব আহরণের তথ্যেও থাকে। ধারাবাহিকভাবেই এ পার্থক্য থাকে। আমাদের পরিসংখ্যানে সমস্যা তো আছেই। নিঃসন্দেহে পরিসংখ্যানগত এ সীমাবদ্ধতা সংশোধন হওয়া উচিত। ব্যাংকাররা বলছেন, পণ্য জাহাজীকরণ ও অর্থ প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান হতে পারে, তবে তা এত বেশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। যেকোনো রফতানি হয়ে যাওয়ার পর নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অর্থ আসছে কিনা, তা নিশ্চিত করার জন্য রফতানিগুলো ট্র্যাক করা প্রয়োজন। ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, পণ্য জাহাজীকরণ মানেই অর্থ আসা নয়। জাহাজীকরণ হওয়ার পরও অনেক সময় ক্রেতারা দামে ডিসকাউন্ট দেন। অনেক সময় আংশিক জাহাজীকরণ হয়, দেখা গেল ঋণপত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ১০ শতাংশ খুব বড় কিনা, তা বলা সম্ভব পরিমাণ হিসাব করে। গত অর্থবছরের ৪ বিলিয়ন ডলার যদি বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলে সেটা অনেক টাকা। ৪ বিলিয়ন ডলারে একটা পদ্মা সেতু সম্ভব। ছয় অর্থবছরের মোট পার্থক্যটি অনেক, এজন্যই এর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ এখানে কোনো ঘটনা ঘটছে। পার্থক্য কেন এত বেশি হবে। প্রত্যেকটি ব্যাংকে তাই বিষয়গুলো দেখা উচিত।