পহেলা বৈশাখের আবাহন সার্বজনীন থাকুক

আপডেট: April 14, 2020, 12:08 am

গোলাম কবির


সারা বিশ্বে আতঙ্ক ছড়ানোর নায়ক করোনাভাইরাসের বিভীষিকার মাঝে আমরা আমাদের প্রাণের পহেলা বৈশাখকে আবাহন করবো।
বছর ঘুরে নববর্ষ আসে। এই আসা যাওয়া অনাদিকালের। কালচক্রের ‘যাওয়া আসা’ ‘স্রোতেভাষা’ই নিয়ম। এই নিয়মকে মানুষ নানা প্রয়োজনে কাজে লাগিয়েছে। কাল পরিক্রমায় সবদিনই নতুন। তারই ভেতর বেছে নেয়া হয় একটি বিশেষ দিনকে। তাইকি নববর্ষ? আমাদের মনে হয়, তা নয়। সুদীর্ঘকালের অভিজ্ঞতায় মানুষ দেখেছে তাদের নিজস্ব অঞ্চলে জলবায়ুর পরিবর্তনে যে সময়টি প্রকৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনে, তাকে আবাহন করে নববর্ষের আনন্দ উপভোগ করে আসছেন। যাঁরা সৌরবর্ষ অনুসরণ করেন, তাঁদের বেলায় এ যুক্তি প্রযোজ্য। তবে চান্দ্রবর্ষ অনুসারীদের নয়। তাদেরও নতুন বছরের নতুন দিন নির্ধারণ করা আছে: কিন্তু তা বিশেষ ঋতুতে স্থির থাকে না। বছরের যে কোনো দিনই নববর্ষ উদ্যাপনের সম্ভাবনা থাকে। বাংলার মানুষ সৌরবর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে। ফলে নির্ধারিত দিনটিই ঘুরে ঘুরে আসে। কখনো হয়তো একদিনের হেরফের হয়: কিন্তু ঋতুর পরিবর্তন হয় না।
বৈশাখের মৌনীতাপসকে নানা উপচারে তুষ্ট করার প্রবণতা থেকেই কি নববর্ষ বরণের প্রবর্তনা! রবীন্দ্রনাথকেও বলতে শুনি: ‘হে ভৈরব, হে রুদ্রবৈশাখ!/ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল, /তপক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল/কারে দাও ডাক হে ভৈরব, হে রুদ্রবৈশাখ!’ কে জানে! হতেও পারে। কারণ কাল বৈশাখী যে ভাবে বঙ্গ প্রকৃতিকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায়, তাতে ভয়ে ভক্তির জন্ম নেয়ার কথা। তাহলে অনুভবটি অন্তরতর হবার যোগ্যতা শিথিল হয়। তবুও তার প্রতি সম্মান রেখে আমরা ধরে নিতে পারি বৈশাখের প্রলয়ের পর ঋতুচক্রের যে নমনীয় শ্যামল রূপ ফুটে উঠে তাকে আবাহন জানিয়ে বৈশাখের প্রথম প্রভাত উদ্যাপন বাংলার মানুষের জীবনে হয়ে ওঠে অর্থবহ। তাইতো কবি বলতে পারলেন: ‘হঠাৎ তোমার কণ্ঠে এযে আশার ভাষা উঠলো বেজে, /দিলে তরুণ শ্যামল রূপে করুণ সুধা ঢেলে ॥’
একদা এই বাংলায় সাড়ম্বরে চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপনের পর পহেলা বৈশাখে মেলা বসতো গ্রামে-গঞ্জে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশের মানুষ মেলায় কৃষিসরঞ্জাম ও পরিবারের সাংবাৎসরিক প্রয়োজনের দ্রব্যগুলো কেনার জন্য মেলায় যেত। তাতে বিনোদনের চেয়ে প্রয়োজনটাই মুখ্য হতো। ইতিহাস বলছে, মধ্য এশিয়ার তাতার মুঘলরা নববর্ষকে প্রথম বিনোদনের দিন হিসেবে উদ্যাপন শুরু করে। এটা অবশ্যই পারস্য সংস্কৃতির অনুসরণ। এখনো ইরানে নববর্ষ সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক মর্যাদা পায়।
আমরা হালখাতা ও পুন্যাহের কথা স্মরণে রেখে বলছি, নববর্ষ যে ইরানিদের মতো বাঙালির উৎসবে রূপান্তরিত হয়ে উঠেছে, তা সেখান থেকেই প্রাপ্ত। মহামতি আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ নির্ধারণ করেন। এতে নববর্ষ রাজকীয় সম্মান পায়। তবুও তা গ্রাম পর্যায়ে প্রয়োজনীয় বিষয়ের মেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিনোদনের আনন্দ তেমন রূপ ধরে না।
রবীন্দ্রনাথ ভুবনডাঙ্গায় শালবনবীথিতে প্রকৃতির কোলে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের অয়োজন করেন। তা ছিলো দীর্ঘসময়ের নববর্ষ উদযাপনের সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন। অবশ্য রাজনারায়ণ বসু ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নববর্ষকে নাগরিকিকরণে এগিয়ে আসেন। সেই ধারা কোলকাতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে নতুনত্বের পরশ লাগায়। মাঝখানে ইতিহাসের নানা ঘটনা বাঙালি চিত্তকে তিক্ত করে। যেমন বঙ্গভঙ্গ দেশভাগ ইত্যাদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সংস্কৃতি সচেতন শিখা গোষ্ঠী অসাম্প্রদায়িক বিনোদন অনুষ্ঠানের পন্থা খোঁজে। তাঁদের সার্থক উত্তরাধিকারীদের প্রচেষ্টায় রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের ভোরে নাগরিক নববর্ষ উদ্যাপনের প্রবর্তনা। এখন ঢাকা ছাড়িয়ে সারাদেশে তার সাড়ম্বর উপস্থিতি।
একটা সত্য স্বীকার্য যে, আমাদের অসাম্প্রদায়িক বিনোদন উপভোগের নির্ধারিত কোনো দিন ছিলো না। পহেলা বৈশাখকে বেছে নেয়ায় দিনটি উদযাপনের মাধ্যমে আমরা নির্মল আনন্দ উপভোগের সুবাতাস অনুভব করি। ভেদবুদ্ধি উপেক্ষা করার অনুষ্ঠান আমাদের বেশি নেই। শহিদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ছাড়াও কতনা দিবস খবরের কাগজের পাতায় বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অথবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়। তবে পহেলা বৈশাখ যেন নবীন পত্রপল্লবের মতো সবার প্রাণে সাড়া জাগায়। কিছু সময়ের জন্য হলেও আমরা বাঙালি হয়ে উঠি।
পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ নির্ধারণে একদা যেমন রাজাদেশ ছিলো, তেমনি বর্তমানে পাওয়া গেছে রাজানুকূল্য। বাঙালির সাংস্কৃতিক কর্মধারার ইতিহাসে তা অনন্য।
বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আয়োজন নিষ্কণ্টক ছিলো না। মাঝে মাঝে কেউ কেউ বিরোধিতা করেছে। খুনাখুনিও হয়েছে; কিন্তু ধারাবাহিকতা একেবারে ক্ষুণ্ন হয়নি। একটা সত্য মনে রাখা দরকার, সহনশীলতা আনন্দধারা উপভোগের পূর্বশর্ত। আর আনন্দ না থাকলে বিনোদন অনুষ্ঠানের আয়োজন ম্লান হয়ে যায়। স্বতঃস্ফূর্ত না হলে কী শক্তি প্রয়োগ করে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়। ইতিহাসে তার বহু নজির আছে। মানুষের মন একমুখি কম্পাসের কাটার মতো নয়। অনুকূল পরিবেশ পেলে এবং মানবসভ্যতার জন্য কল্যাণকর পরিবেশ পেলে তার প্রতি ধাবিত হয়।
লক্ষ্য করা গেছে, নববর্ষ উদযাপনের দিনটিতে অনেক মানুষ পারিপার্শ্বিক মাৎস্যন্যায় উপেক্ষা করে নিজের মতো আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি করে নেয়। এতে ব্যক্তির ঔদার্যের সাথে জাতির মাহাত্ম্য বৃদ্ধি পায়। উৎসবের সার্বজনীনতা সবার চেতনায় হয় প্রোথিত।
আজকের দিনে আমাদের সম্মিলিত প্রার্থনা হোক, করোনাভাইরাসমুক্ত স্নিগ্ধ-শ্যামল আনন্দময় সুন্দর ধরাতলের। সংকল্প হোক, আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গর্জে ওঠার।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।