পাওয়ার গেম থেকে ছিটকে পড়েছে বিএনপি !

আপডেট: জুন ১০, ২০১৮, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

স্বদেশ রায়


গত কয়েক বছর যাবৎ ঈদের আগে আগেই বিএনপির তরফ থেকে একটা বিবৃতি আসে, ঈদের পরেই বৃহত্তর আন্দোলন। এবার সে বিবৃতি এখনো যে আসার সময় নেই তা নয়। সময় আছে, ঈদের দু একদিন আগেও তারা বলতে পারেন। বিবৃতি তাদের পক্ষ থেকে যাই আসুক না কেন, দেশের রাজনীতিতে এখন একটি বড় প্রশ্ন ঈদের পরে বিএনপি কী করবে? কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, কেন ‘ঈদের পরে’ কথাটা যোগ করা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো দেশ এখন একটা ফেস্টিভ মুডে। ঈদের আনন্দের রঙ আকাশে বাতাসে লাগতে শুরু করেছে, মানুষ কেউ বা ছুটছে শপিং মলে কেউ বা বাড়ি ফেরার টিকেট কেনার জন্যে। এ সময়ে আর যাই হোক রাজনীতি কারো মাথায় নেই। তাই যা কিছু সব ঈদের পরেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি পাওয়ার গেমের একটি শক্তি ছিলো। ১৯৯১ থেকে বিএনপির একের পর এক ভুল পথ চলায়, ২০০৬ থেকে বিএনপি ক্রমান্বয়ে পাওয়ার গেমের সেই অবস্থান থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পরে বিএনপি নিজের চারপাশে একটা ধোয়াশা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিলো। প্রথমত শক্তিটি কি ডানপন্থী না মধ্যডান এটা পরিস্কার ছিলো না। তাই বিএনপি কিছু কিছু কাজে নিজেকে ডানপন্থী হিসেবে কাজে লাগাতে পারতো আবার সর্ব সাধারণের কাছে মধ্যডান হিসেবে থাকতে পারতো। এ ধরনের একটি দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মত একটি মধ্যপন্থী উদার বাম গণতান্ত্রিক দলের লড়াই করা বেশ কষ্টকর ছিলো। কারণ তারা জনগণকে বলতে পারতো না আসলে বিএনপি কী? ১৯৯১ এর নির্বাচনের পরে শেখ হাসিনা এটা উপলব্দি করেন। তাই তিনি ৯১ তে দুটি কাজ করেন, নিজ দলের বাম অর্থনৈতিক কর্মসূচিকে পরিত্যাগ করে বাজার অর্থনীতিকে গ্রহণ করেন। যা ছিলো রাজনৈতিক ভাবে ধোয়াশা সৃষ্টি করা বিএনপির জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ, বিএনপি বাজার অর্থনীতির একমাত্র প্রতিনিধি ছিলো এর আগে। আওয়ামী লীগকে অর্থনৈতিক ভাবে বাম ঘেষা বলে পুঁজিবাদী পৃথিবীতে কোণঠাসা করতে পারতো। অন্যদিকে ৯১ তে যেহেতু একক সংখ্যাগরিষ্টতা বিএনপি পায়নি, তাই শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে লিখিতভাবে জানান, সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্টতা না দেখাতে পারলে কেউ যেন সরকার গঠন না করে। সাহাবুদ্দিনও বিএনপিকে সংখ্যাগরিষ্টতা প্রমাণ করতে বলেন। এ সময়ে জামায়াতে ইসলামী লিখিতভাবে বিএনপিকে সমর্থন করে। বলা যেতে পারে বিএনপির ধোয়াশা চরিত্রের ধোয়াশা কাটাতে বা জনসমক্ষে বিএনপির চরিত্র উম্মোচনে শেখ হাসিনার এটা প্রথম সাফল্য। রাষ্ট্রপতির কাছে জামায়াতের ওই লিখিত দেবার ভেতর দিয়ে প্রমাণিত হয় বিএনপি ও জামায়াতের নৈকট্য বা একাত্মতা। যা পাওয়ার গেমে অনেকখানি হলেও বিএনপিকে একটা নতুন মাঠে খেলতে ফেলে দেন শেখ হাসিনা। আর তখন থেকেই বিএনপিকে ওই মাঠেই খেলতে হচ্ছে। অর্থাৎ মৌলবাদীদের মাঠে খেলতে হচ্ছে। অবশ্য এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো কলামে লেখা সম্ভব নয়, এর বিস্তারিত তুলে ধরতে হলে বই লেখার প্রয়োজন পড়ে।
যাহোক, ওই মাঠে খেলতে খেলতে ২০১২-১৩ তে এসে বিএনপি পাওয়ার গেম থেকে অনেকখানি ছিটকে পড়ে। বিএনপি বা বিএনপির অন্ধ সমর্থকরা স্বীকার করুণ আর নাই করুণ ভবিষ্যতে যারা নির্মোহভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আদিঅন্ত লিখবেন তারা ঠিকই লিখবেন, ২০১২-১৩ তে বিএনপির চরিত্র রাজনৈতিকভাবে পাওয়ার গেমের শক্তির বাইরে গিয়ে মৌলবাদী সন্ত্রসাীর দিকে বেশি অংশ ঝুঁকে যায়। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এর সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দলের খুব বেশি কোনো পার্থক্য থাকে না। ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা একথাও স্বীকার করবেন, যদিও নেতৃত্ব ছিলো খালেদার তারপরেও তারেক রহমানই বিএনপিকে এখানে নিয়ে আসার জন্যে সব থেকে বেশি ভূমিকা রাখেন। জিয়াউর রহমানের আমলেও ছাত্রদলকে , ইসলামী ছাত্রসেনা বা ইসলামী ছাত্র শিবিরের সঙ্গে এক করেননি জিয়াউর রহমান। ২০০১ এ ইসলামী মৌলবাদীদের নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে তারেক রহমান সরাসরি বলে দেন, শিবির ও ছাত্রদল একই মায়ের সন্তান। তাই এই ২০১৮তে এসে ছাত্রদলের কোনো আলাদা চরিত্র নেই। শিবিরের সঙ্গে তাদের পার্থক্য করার কোনো সুযোগ নেই। ২০১২ ও ১৩’র এই অবস্থানের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের পাওয়ার গেম থেকে আরো অনেকখানি ছিটকে পড়ে বিএনপি। কারণ, বাংলাদেশের মত একটি আর্গুমেনটেটিভ সোসাইটিতে কোনো মৌলবাদী বা সন্ত্রাসী কর্মকা-কারীরা কখনই পাওয়ার গেমের অংশ হতে পারবে না। এমনকি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নামেও কিন্তু সিরাজ শিকদার, কমরেড তোহা, হক- মতিন কেউ পারেননি। কোনো আর্গুমেনন্টেটিভ সোসাইটিতে কখনই মৌলবাদী বা সন্ত্রাসী চরিত্র নিয়ে পাওয়ার গেমের প্লেয়ার হওয়া যায় না।
তাই ২০১৪তে পাওয়ার গেমের মাঠ থেকে ছিটকে পড়ার পরে, বিএনপি এখন শেখ হাসিনার থাবার ভেতর। কারণ, ২০১৪তে বিএনপি পাওয়ার গেমের মাঠ থেকে ছিটকে পড়ার পরে বা তাদেরকে ফেলে দিতে সমর্থ হবার পরে শেখ হাসিনা এই মাঠটির দখল খুব ভালোভাবে নিয়ে নিয়েছেন। যার পরিণতি এসে দাঁড়িয়েছে, বিএনপি এখন কম বেশি মানববন্ধন ও প্রেসক্লাবে সেমিনারের ভেতর সীমাবদ্ধ একটি দলে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বেগম জিয়াকে ঘিরে যে মিথ ছিলো সেটা ভেঙে দিয়ে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, বেগম জিয়া আলাদা কেউ নন, রাজনীতির মাঠের অন্য দশ পাঁচ জনের মতই তাকে বিবেচনা করে শেখ হাসিনা তার নিজস্ব রাজনীতিতে এগুতে পারেন ও রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন। বেগম জিয়াকে নিয়ে তাঁর বাড়তি ভাবনার বা কারো কথায় কান দেবার কোনো প্রয়োজন নেই। বিএনপিও এ সত্য বুঝতে পেরেছে। তাই কুমিল্লায় বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার হুকুমের আসামী হিসেবে বেগম জিয়ার যে মামলা আছে -ওই মামলায় জামিন না হওয়ার পরে মীর্জা ফখরুল বলেছেন, তারা সব হারিয়ে ফেলেছেন। এখন তাদের আন্দোলন করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। তাদের আরেক নেতা মওদুদ আহমেদও প্রেসক্লাবে একটি সেমিনারে একই কথা বলেছেন।
তাদের এ কথার ভেতর দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে, বিএনপি মুখে বিচার বিভাগ নিয়ে যাই বলুক না কেন, তারা বুঝে গেছেন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এতদিন তারা প্রেসে বিভিন্ন সময়ে যে সব কথা বলেছেন এগুলো কথার কথা মাত্র। বেগম জিয়ার নাম করে শেষ অবধি বিচার বিভাগের কাছ থেকে বাড়তি কিছু পাবার কোনো সুযোগ নেই। তাই ঈদের ছুটির পরে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে জিয়া ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলা হাইকোর্টকে শেষ করতেই হবে- যেহেতু এটা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা। আগেও এ কলামে লিখেছি এখানেও লিখতে হচ্ছে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে বেগম জিয়ার দুর্নীতির এই মামলা শেষ হতে সেপ্টেম্বর অবধি বা আরো কয়েকদিন লাগতে পারে। আর এর ভেতর দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ে যাবেন বেগম জিয়া। অন্যদিকে ইতোমধ্যে বিএনপির তরফ থেকে বলা হয়েছে, তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী জোবায়াদা রহমান সহ তার পরিবারের সদস্যরা বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। রাজনৈতিক আশ্রয় পাবার স্বার্থে তারা তাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্রিটিশ সরকারের কাছে সমর্পণ করেছেন। এর থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে, একদিকে যেমন বেগম জিয়ার জেল থেকে বের হবার কোনো সুযোগ নেই, অন্যদিকে তারেক রহমানও জেল জুলুম মাথায় নিয়ে এসে বাংলাদেশে বিএনপির হাল ধরবেন না।
এ কারণে বিএনপি যদিও ঈদের পরে কী করবে তা কিছুই বলেনি, তবে তাদের জেনারেল সেক্রেটারি বলেছেন, আন্দোলন ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই। তাঁর ভাষায়, তারা সব কিছু হারিয়ে ফেলেছেন। এখন প্রশ্ন, ঈদের পরে বিএনপি যদি আন্দোলনে যায়, তাহলে তারা কাদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে যাবে? জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের জোটে যে সকল ইসলামিক মৌলবাদীরা আছে তাদের নিয়ে তারা আন্দোলনে যেতে পারে ঠিকই। কিন্তু বেগম জিয়াবিহীন বিএনপি জামায়াতে ইসলামী সহ অনান্য ইসলামিক মৌলবাদীদের নিয়ে আন্দোলনে গেলে সে আন্দোলন কি শেষ অবধি বিএনপির হাতে থাকবে? না, বিএনপির ওই মাপের কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা নেই, যিনি আন্দোলনের ফল তাদের ঘরে উঠাতে পারবেন। স্বাভাবিকভাবে এটা চলে যাবে সুচতুর জামায়াতে ইসলামীর হাতে। অনান্য ইসলামিক মৌলবাদী দলগুলো এটা তাদের জন্যে আরো এক ধাপ অগ্রগতি মনে করে, জামায়াতে ইসলামীকেই সমর্থন দেবে। এখানে মৌলবাদীদের ব্যালন্স করার জন্যে বিএনপি যুগপৎ হোক আর যেভাবে হোক কামাল হোসেন, বদরুদ্দোজা চৌধুরি এই গ্রুপটির সাহায্য চাইবে। নির্বাচন যতই কাছে আসবে ততই বদরুদ্দোজা চৌধুরি আওয়ামীলীগের জোট বা তার কাছাকাছি হবার চেষ্টা করবেন নিজের এলাকা ধরে রাখার স্বার্থে। কাদের সিদ্দিকীও সেটাই করবেন। থাকবেন শুধু ড. কামাল। তার পরামর্শে বিএনপি আরো জনবিচ্ছিন্ন হবে।
এই জনবিচ্ছিন্ন বিএনপি আবার দুটো গ্রুপে বিভক্ত হতে পারে। তরুণ একটি গ্রুপ চাইবে বেগম জিয়া ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, এদের মত নেতারা সে গ্রুপেই থাকবে। কারণ, বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতি এদের আনুগত্য অনেক বেশি। অন্যদিকে মওদুদ আহমদ, খোন্দকার মোশারফ, রহুল কবীর দুলু এ ধরনের নেতারা সহানুভূতি ভোট পাব এমন স্লোগান তুলে নির্বাচনে যেতে পারে। যাহোক, নির্বাচন কেন্দ্র করে যাই ঘটুক না কেন বিএনপির মধ্যে- সেটা হবে একটা দুর্বল প্রচেষ্টা। মূল পাওয়ার গেমে কোনো প্লেয়ার তাদের থাকবে না। সব মিলিয়ে এখন বলা যায় বাংলাদেশের পাওয়ার গেম থেকে ছিটকে পড়লো বিএনপি। এখন ভবিষ্যতে আরো পাঁচ দশ বছরের মধ্যে কোনো ডানপন্থী নতুন দল আসবে নাকি ডান ও মধ্যপন্থার সঙ্গে অধিক সমাজকল্যাণের মিশেল ঘটিয়ে শেখ হাসিনা যে-ভাবে এগুচ্ছেন সেটা দিয়েই সবটুকু মাঠ দখল করে রাখবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: সাংবাদিক
(বিডিনিউজটুয়েন্টিফরডটকম এর সৌজন্যে)