বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

পাকিস্তানিরা বাঙালিদের দাসত্বের নিগড়ে বাঁধতে চেয়েছিল

আপডেট: December 14, 2019, 1:10 am

নিজস্ব প্রতিবেদক


১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালিরা পৃথক জাতিসত্তায় বিশ্ব মানচিত্রে সগৌরবে স্থান করে নেয়। বিজয়ের এ পথ-পরিক্রমা যেমন রক্তাক্ত ছিল, তেমনি বিশ্ব মানচিত্রে আলাদা একটি অবস্থান তৈরিও সহজ ছিল না। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জাতিকে একটি জনযুদ্ধের সূচনা করতে হয়েছে। অনেক মূল্য দিয়ে প্রিয় স্বাধীনতাকে অর্জন করতে হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনে তো বটেই তৎকালীন বিশ্ব প্রেক্ষাপটেই একটি তাৎপর্যময় ঘটনা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি সংগ্রামে-ঐতিহ্যে বিশ্ব দরবারে আজ দীপ্যমান। মুক্তিযুদ্ধ যুগ যুগ ধরে জাতিকে সাহস যোগাবে, ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি লড়্ইা-সংগ্রামে দেশ জাতি নির্বিশেষে সকলকে অনুপ্রাণিত করবে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির রাজনৈতিক স্বাধীনতার, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের সুদীর্ঘ সংগ্রামের সূচনাপর্ব। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। আর এই জাতীয়তাবাদী চেতনা ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ’৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফার আন্দোলন, ৬৯-এর ১১ দফার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান এবং ’৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনসহ বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে প্রথমে স্বাধিকার সংগ্রাম এবং পরে ১৯৭১ সালে চূড়ান্ত স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল এক নজিরবিহীন ব্যালটের বিপ্লব। শোষিত-বঞ্চিত বাঙালিদের পরিবর্তনের পক্ষে নীরব বিপ্লব। ওই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। নির্বাচনের এই ফলাফল ছিল বাংলার স্বাধিকারের পক্ষে দ্ব্যর্থহীন গণরায়। বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের আইনি বৈধতার গণরায়।
সন্দেহ নেই, পাকিস্তান ছিল একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র। ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দুটি অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়। ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত চারটি প্রদেশ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান এবং প্রায় এক হাজার মাইল দূরে পূর্ব বাংলা ছিল অপর প্রদেশ। দুই অঞ্চলের দুই জনগোষ্ঠির মধ্যে একমাত্র বন্ধন ছিল ধর্ম। ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রথা, খাদ্য, বেষভূষা প্রভৃতি সব দিক থেকেই দুই জনগোষ্ঠি ছিল পৃথক। তদুপরি পাকিস্তান জাতি গঠনের জন্য দুই অঞ্চলের স্বার্থ ও পরস্পর সমঝোতার ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থাই কাম্য ছিল কিন্তু তা না করে পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব বাংলার প্রতি উপনিবেশসুলভ সাংস্কৃতিক একীকরণ, অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনীতির আধিপত্যের নীতি অনুসরণ করে। ফলে পাকিস্তানে বাঙালিরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিষয়টি পরিস্কার করা যায়, আর তা হলো- ১৯৫১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী পাকিস্তানের জনসংখ্যার প্রায় ৫৫ শতাংশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠি মাত্র ৭ শতাংশ লোকের মাতৃভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। স্বাভাবিকভাবেই বাঙালিরা এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বায়ান্নর ২১ ফেব্রƒয়ারিতে বুকের রক্ত দিয়ে জাতি প্রথমবারের মত ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ-সংগ্রাম গড়ে তোলে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি ক্রমন্বয়ে বাঙালিদের দাসত্বের নিগড়ে বেধে ফেলতে সবধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। জাতীয় আয়ের ৫২ শতাংশই আসতো পূর্ব বাংলা থেকে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার পূর্ব বাংলারে তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে। এতে দুই অঞ্চলের মধ্যে বিরাট অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। এই বৈষম্য রাজনীতিতে, লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যাপকতর হয়। তার সাথে ছিল বাঙালিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন-নীপিড়ন ও সহিংসতা। আর এসব কিছ্ ুকরা হয়েছে ধর্মের নামে। বাঙালি জাতি তাদের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্যেই উপলব্ধি করেছে একটি অসাম্প্রদায়িক, শোষণ-বঞ্চনাহীন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার। এই চেতনাই জাতিকে স্বাধিকার আন্দোলনের ধারা থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে। তিলে তিলে সংগঠিত করে জাতিকে চূড়ান্ত জনযুদ্ধে সম্পৃক্ত করেছিলেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালে ৭ মার্চে স্মরণকালের এক সেরা ভাষণে তিনি বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
ওই ঘোষণার মর্মবাণী এবং এই নির্দেশের তাৎপর্য বাঙালি জাতির কাছে অস্পষ্ট ছিল না। সে কারণেই ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর হামলার সাথে সাথেই সমগ্র জাতি একযোগে দুর্জয় প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনা করে। তারই ফলশ্রুতিতে জাতি ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করে। এর জন্য ৩০ লক্ষ লোককে জীবন দিতে হয়েছে। সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে অসংখ্য মা-বোনদের।