পাখির অভয়ারণ্য রাবির ‘পাখি কলোনি’

আপডেট: নভেম্বর ১৫, ২০১৯, ১:০০ পূর্বাহ্ণ

ওয়াসিফ রিয়াদ, রাবি


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি কলোনীর ছবি তুলেছেন রোকনুজ্জামান

পাখিদের কিচিরমিচির ডাকে প্রতিদিনই ঘুম ভাঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আবাসিক শিক্ষার্থীদের। ক্যাম্পাস জুড়ে প্রকৃতির দেয়া বড় বড় গাছ, ছোট-বড় বাগান আর অসংখ্য পুকুর যেন পাখিদের জন্য উপযোগী আবাসনের তৈরি করেছে। বিশেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপসী রাবেয়া ও বেগম খালেদা জিয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা কয়েক বছর ধরেই পাখিদের কলতানে মুখরিত। প্রতিদিন সকালে পাখির কণ্ঠে সু-মধুর গান শুনে ঘুম থেকে ওঠা এবং সন্ধ্যায় রুমে ফিরে পাখিদের কিচির-মিচিরে যেন তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এতক্ষণ বলেছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পাখি কলোনি’র কথা। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের আবাসিক হল ‘পশ্চিম পাড়ায়’ অবস্থিত। এই দুই হলের মাঝের ফাঁকা স্থানে যে গাছপালা ও ঝোপঝাঁড় বিস্তৃত জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে পাখির অভয়াশ্রম। এদের মধ্যে আছে পানকৌড়ি, বড় পানকৌড়ি, শালিক, বুলবুল, কালো বুলবুল, মাছরাঙ্গা, ডাহুক, কাঠ-ঠোকরা, শালিক, বামুন শালিক, গোবরে শালিক, পাতি কাক, টিয়াসহ অনেক প্রজাতির পাখি। পাখিগুলো যেন আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিবেশীর মতো হয়ে গেছে। আর শিক্ষার্থীরাও বেশ মিতালি গড়েছে পাখিদের সঙ্গে। এসব পাখির মধ্যে বেশির ভাগই বক। তবে বছরের মার্চ থেকে অক্টোবরে কলোনিতে আসে এবং প্রজনন সম্পন্ন করে পাখিরা। প্রজাতির দিক দিয়ে এ সব বকের মধ্যে রয়েছে বাজকা, নিশিবক, গো-বকসহ অনেক প্রজাতির বকের বাস এখানে।
সরেজমিনে পাখি কলোনি ঘুরে দেখা যায়- খালেদা জিয়া ও তাপসি রাবেয়া হলের মাঝখানে বেশ জায়গা জুড়ে অবস্থান এই কলোনির। সেখানে ৩০ থেকে ৩৫ ফিটের প্রায় ৫০টি বড় গাছ রয়েছে। এছাড়া ছোট ও মাঝারি গাছ মিলে প্রায় ১০০টি গাছ রয়েছে। কলোনির দুই ধারে দুইটি মাঝারি ধরনের পুকুরও রয়েছে। কলোনিতে ঢুকতেই পাখিদের কিচির-মিচির আর নানান ধরনের পাখি চোখে পড়ে। কলোনির ঠিক পেছন দিকে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে একটি সরু রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে দর্শনার্থীরা কলোনির সৌন্দর্য উপভোগ করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাবি ক্যাম্পাস ঘিরে পাখিদের বিচরণ অনেক আগে থেকেই। তবে ২০০৯ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেদা জিয়া ও তাপসী রাবেয়া হলের মধ্যবর্তী এলাকাকে ‘পাখি কলোনি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এখানে রয়েছে সুউচ্চ অর্ধশতাধিক গাছ। এসব গাছে গাছে পাখিরা গড়ে তুলেছে তাদের আবাসস্থল। এখানে অন্তত ৫০০-এর বেশি পাখির বাসা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই ‘পাখি কলোনি’। এখানকার পাখিরা এখন আর অতিথির তালিকায় পড়ে না। নিজেরাই গড়ে তুলেছে স্থায়ী আবাসস্থল। এখানেই নিজ বাসায় ডিম দিয়ে ফুটছে বাচ্চা। বড় হচ্ছে এখানেই নিজের পরিবেশে। আবাসিক হল দুইটির সামনে গেলেই দেখা যাবে পাখিদের ব্যস্ততা, কলতান, কিচির-মিচির শব্দ আর এ ডাল থেকে ও ডালে নাচানাচি। গাছের ডালে ডালে খড়-কুঠো দিয়ে নিজেদের বাসা বাঁধতে যেন সার্বক্ষণিক ব্যস্ত পাখিরা। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপসী রাবেয়া হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাবিনা সুলতানার উদ্যোগে এই পাখি কলোনি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পাখি কলোনিতে বিভিন্ন সময় দর্শনার্থীরা দেখতে আসেন। বিশেষ করে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক পড়াশোনা ও গবেষণার কাজে প্রায়ই এখানে আসেন। পাখিদের জন্য হুমকি হবে এমন কাজ যেন না হয় সে জন্য হল প্রশাসন সর্বদা সচেতন রয়েছে।
পাখিদের নিয়ে কাজ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষক। তাদের মধ্যে অধ্যাপক সেলিনা পারভীন, বিধান চদ্র দাস, এম. নজরুল ইসলাম, মো. মোশাররফ হোসেন ও আমিনুজ্জামান মো. সালেহ্ রেজার নাম না বললেই নয়। দীর্ঘ সময় ধরে পাখিদের নিয়ে গবেষণায় তাঁদের অবদান অসামান্য।
পাখি বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমিনুজ্জামান মো. সালেহ্ রেজা বলেন, ‘রাবি ক্যাম্পাস পাখিদের জন্য উপযুক্ত একটি আবাসন। এখানে পাখিদের কেউ বিরক্ত করে না। পাখিরা সময় হলেই চলে আসে ক্যাম্পাসে। বিশেষ করে তারা পাখি কলোনিতে বসবাস করতে খুবই স্বাচ্ছন্দবোধ করে। এছাড়াও এখানে তাদের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার ও প্রজনন ব্যবস্থা। কিছু পাখি গাছে প্রজনন করে, কিছু পানিতে।
তিনি আরও বলেন, পাখিদের বসবাসের সুবিধার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নানাভাবে সহায়তা করেছে। এ বছর প্রথমবারের মত ‘জল ময়ুর’-এর প্রজনন ঘটতে দেখা গেছে। এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। তবে দুঃখের বিষয় হলো- প্রতি বছর হবিবুর রহমান হল পুকুরে পানকৌড়িদের প্রজনন ঘটতে দেখা যায়, কিন্তু এবার আর সেটার দেখা মেলেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরগুলোকে প্রকল্পের আওতায় আনার কারণে এ সমস্যা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়াও গত কয়েক বছরের তুলনায় এখন ক্যাম্পাসে পাখির তেমন আগমন দেখা যায়না। এর অন্যতম কারণ হতে পারে বৃক্ষ নিধন। সম্প্রতি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গার বেশকিছু গাছ কেটে ফেলার কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। পাখি হলো প্রকৃতির একটি অংশ, প্রকৃতিই শিখিয়ে দেয় কিভাবে তাদের থাকতে হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ে পাখিদের থাকার জন্য পাখি কলোনি অন্যতম একটি স্থান। সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ও প্রজনন ব্যবস্থা থাকার কারণে বছরের বিভিন্ন সময় পাখিরা এখানে আসে। আগের থেকে যেন আরও বেশি পাখি আমাদের ক্যাম্পাসে আসে তাই আমরা দুই বছরে তিন হাজার বৃক্ষ রোপন করেছি। এ বিষয়ে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন সর্বদা সচেতন রয়েছে।