পাতা সংগ্রহ

আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৯, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি


খুব গরম পড়েছে। তাই গ্রানা জানালা খুলে মেঝের উপর শুয়ে আছে। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। গ্রানা মাজেদাকে বেশ কয়েকবার বলল কে এসেছে দেখো। কিন্তু মাজেদার কোনো সাড়াশব্দ না দেখে গ্রানা নিজেই গেলো দরজা খুলতে।
দরজা খুলার সাথে সাথে হাসি মুখে ক্লিওন বলল কেমন আছেন গ্রানা?
গ্রানা বলল জি ভালো আপনি কেমন আছেন?
ক্লিওন সবকটা দাঁত বার করে বলল আমি তো সব সময় ভালো থাকি। গ্রানা বলল তো আজকে কি দরকারে এসেছেন আপনি?
ক্লিওন বলল কেনো কোনো দরকার ছাড়া কি আসতে পারি না?
গ্রানা বলল পারেন কিন্তু কখনো তো দরকার ছাড়া আসেন না তাই বললাম। ক্লিওন বলল বাইরে দাঁড়িয়ে কি কথা বলবেন নাকি ভিতরে যেতে বলবেন?
গ্রানা এবার দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল দুঃখিত ভিতরে আসুন। ক্লিওন ভিতরে ঢুকে সোফাতে পা তুলে খুব আরাম করে বসল।
গ্রানার এটা দেখে খুব মেজাজ খারাপ হলো তবু কিছু না বলে বিরক্তির ছাপ মুখে নিয়ে বলল কি দরকার বলেন?
ক্লিওন বলল আসলে খুব ক্ষুধা লেগেছে। রাত থেকে কিছু খাইনি। আপনি যদি কিছু খেতে দিতেন তবে খুব ভালো হত। রহিমা খালার বাড়িতেই খেতে যেতাম। কিন্তু খালার বাড়িতে যাওয়ার মত রিকশা ভাড়া আমার কাছে নাই।
গ্রানা এবার আরো বিরক্ত হলো। কিন্তু ক্লিওনকে কিছু না বলে মাজেদাকে ডেকে ক্লিওনকে খেতে দিতে বলল গ্রানা।
মাজেদা ক্লিওনের জন্য খাবার আনতে গেছে। গ্রানার সামনে সোফাই পা তুলে বসে আছে ক্লিওন চুপচাপ। খাবার আসতে একটু দেরি হয়েছে বলে গ্রানা মাজেদার উপর খুব রেগে গেছে এবং কয়েক কথা শুনিয়ে দিয়েছে। ক্লিওন খুব মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে। মাঝে মাঝে গ্রানার দিকে তাকাচ্ছে।
ক্লিওন হঠাৎ বলে উঠল মিস গ্রানা আপনি এত বদমেজাজি কেনো? গ্রানা কি বলবে বুঝতে না পেরে চুপ রইল। ক্লিওন আবার বলল গ্রামের দিকে বলে ছোট বাচ্ছা জন্মানোর সময় মুখে মধু দিতে বলে এতে নাকি বাচ্চার মুখে সব সময় মধুর মত মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলে আপনার মুখে মনে হয় মধু দেওয়া হয়নি স্যালাইনের পানি দেওয়া হয়েছিলো। তাই সব সময় সবার সাথে নুনতা করে কথা বলেন।
গ্রানার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো। গ্রানা এবার বলে উঠল আমার মুখে কিসের পানি দিয়েছিলো সেটা আপনার না জানলেও চলবে। আপনি আপনার খাওয়া শেষ করুন।
গ্রানাকে রাগতে দেখে ক্লিওন বলল আপনার ড্রঈং রুমটা খুব সুন্দর করে সাজানো আমার মনে হয় আপনার বাড়িটাও খুব সুন্দর করে সাজানো। আমি কি আপনার পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখতে পারি খাওয়া শেষ করে?
গ্রানা মনে মনে বলল আমার বাড়ি তকে ঘুরে দেখতে হবে না। তুই খাওয়া শেষ করে বিদায় হো। কিন্তু মনের কথা মনে রেখে ক্লিওনকে বলল অবশ্যই।
ক্লিওন খাওয়া শেষ করে গ্রানার সাথে গ্রানার বাড়ি ঘুরে দেখতে লাগলো। ক্লিওন গ্রানাকে বলল এত বড় বাড়িতে আপনি একা থাকেন কি করে?
গ্রানা বলল একা থাকি না আমার সাথে মাজেদা থাকে। পুরো বাড়ি ঘুরতে ঘুরতে একটা ঘরের কাছে গিয়ে ক্লিওন দাঁড়িয়ে গিয়ে গ্রানাকে জিজ্ঞেস করলো এগুলো কি গ্রানা?
গ্রানা বলল এগুলো বিভিন্ন ধরনের পাতা। ক্লিওন বলল পাতা এমনভাবে রেখেছেন কেনো?
গ্রানা বলল সব মানুষের কিছু না কিছু সংগ্রহ করার ইচ্ছা থাকে আমার তেমনি পাতা সংগ্রহ করার ইচ্ছা। তাই আমি বিভিন্ন ধরনের পাতা সংগ্রহ করি আর এ ঘরে এভাবে সাজিয়ে রাখি। কারণ কোনো দেশের ডাক টিকিট যেমন সে দেশের পরিচয় বহন করে, গাছের পাতাও তেমনি গাছের পরিচয় বলে দেয়।
ক্লিওন অবাক হয়ে বলল গাছের সবুজ কচি পাতা কি করে বেশি ক্ষন রক্ষা করা সম্ভব? কিছুক্ষণের মধ্যেই তো সুন্দর পাতাগুলো দুমড়ে ও ছিড়ে শুকিয়ে কেমন বিশ্রি হয়ে যায়। তখনতো এগুলো দেখার মতোই থাকে না।
গ্রানা বলল কিন্তু একটু কৌশল খাটালেই আমরা এই অসুবিধাটুকু কাটিয়ে উঠতে পারি ক্লিওন।
ক্লিওন বলল কি ভাবে গ্রানা?
গ্রানা বলল আমাদের পছন্দসই বিভিন্ন ধরনের কচি পাতা ব্লেড দিয়ে বোঁটা থেকে কেটে নিতে হবে। যে সব পাতায় শিরা উপশিরা বেশি এবং পাতার গঠনগুলো একটু বিচিত্র সেগুলোই আমার সংগ্রহকে আকর্ষণীয় করবে। টেবিল বা শক্ত মসৃন সমতল কোনো জায়গাতে কয়েক স্তর খবরের কাগজ বিছাতে হবে। এর ওপরে কচি পাতাগুলোকে সারি করে সাজাতে হবে। পাতাগুলোর ওপরে আবার কয়েক স্তর খবরের কাগজ বিছিয়ে দিতে হবে। একটি সমতল কাচ বা বোর্ড এর ওপরে চাপা দিতে হবে এবং কয়েক টুকরো পাথর বা ইট এর ওপর চাপাতে হবে। কয়েকদিন এমনি ভাবে রাখলে পাতাগুলো সুন্দর শক্ত ও শুকনো হয়ে উঠবে। তার পর সেগুলোকে একদিকে আঠা লাগানো কাগজ দিয়ে সেঁটে দিতে হবে শক্ত বোর্ডে। প্রতিটি পাতার নাম ও অন্য পরিচয় নিচে লিখে রাখতে হবে।
সবার কি শখ জানি না। তবে আমার শখ পাতা সংগ্রহ করা, গ্রানা বলল।
ক্লিওন গ্রানার দিকে হা করে তাকিয়ে থেকে বলল এমন একটা জিনিস কি করে আবিষ্কার করলেন আপনি গ্রানা?
গ্রানা বলল ইচ্ছা থাকলে উপাই হয় ক্লিওন। চাইলে আপনিও এমনটা করতে পারেন।
ক্লিওন বলল আমার তো থাকা খাওয়ারি ঠিক নাই আমি আর কি করবো।
কিন্তু আপনার পাতা সংগ্রহ দেখে খুব ভালো লাগলো।
আমি তবে এখন আসি গ্রানা আপনাকে অনেক জ্বালালাম তার জন্য দুঃখীত। গ্রানা বলল না ঠিক আছে।
ক্লিওন চলে গেলো। গ্রানা দরজা বন্ধ করে এসে আবার তার ঘরে শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পরে আবার কলিংবেল বেজে উঠল। মাজেদা দরজা খুললো। দেখে আবার ক্লিওন এসেছে।
ক্লিওন আবার দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে বলল গ্রানাকে একটু ডেকে দিবেন?
মাজেদা ক্লিওনকে বলল আপা তো ঘরে শুয়ে আছে এখন ডাকলে খুব রাগারাগি করবে। ক্লিওন বলল ডাকেন না একটু দরকার আছে খুব।
মাজেদা গ্রানাকে ডেকে বলল আপা ওই লোকটা আবার এসেছে। গ্রানা বলল কোন লোকটা?
মাজেদা বলল ওই যে, যে লোকটা একটু আগে খেয়ে গেলো আর বকবক করে গেলো। গ্রানা ঘর থেকে বাইরে এসে ক্লিওনকে জিজ্ঞেস করল আবার কোনো দরকার নাকি? এবার কি দরকার শুনি?
ক্লিওন বলল আমকে ২০০ টাকা দেন তো রহিমা খালার বাড়ি যাবো কিন্তু রিকশা ভাড়া নাই। যখন পারবো শোধ করে দিবো।
গ্রানা বলল এর আগেও আপনি আমার কাছে টাকা ধার নিয়েছেন কিন্তু ফেরত দেননি।
ক্লিওন বলল দিয়ে দিবো এখন ২০০ টাকা দেন।
গ্রানা বলল আপনি দাঁড়ান আমি নিয়ে আসছি। গ্রানা ঘরে এসে তার ব্যাগ থেকে ২০০ টাকা বের করে ক্লিওনকে দিলো।টাকা নিয়ে ক্লিওন দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল, আপনাকে যতটা বদমেজাজি ভেবেছিলাম আপনি অতটা বদমেজাজি না। তার পর সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো। গ্রানা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ক্লিওনের যাওয়া দেখছিলো আর ভাবছিলো লোকটা মনে হয় সত্যি পাগল।