পাবনায় ‘বীরত্ব অবিনশ্বর’ নির্মাণ হলো পুলিশ সুপারের উদ্যোগে

আপডেট: মার্চ ৩১, ২০১৭, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ

পাবনা প্রতিনিধি



পাবনায় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শহিদদের স্মরণে নির্মিত হলো ‘বীরত্ব অবিনশ্বর’ স্মৃতিস্মারক। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এমন একটি মহৎ কাজ মুক্তিযোদ্ধা-জনতাকে আবেগাপ্লুত করেছে।
বালিয়াহালট কবরস্থানের অদূরে খোলা প্রান্তরে নির্মাণ করা হয়েছে ‘বীরত্ব অবিনশ্বর’। এটির মূল পরিকল্পনাকারী পাবনার বর্তমান পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির। তিনি তার স্বপ্নের কথা বলেন ভাগ্নে আর্কিটেকচার জায়েদী আমান অয়ন’কে। যিনি এটির নক্সা করেছেন। তিনি আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক।
‘বীরত্ব অবিনশ্বর’ এর নক্সা ও নির্মাণ শৈলী প্রশংসার দাবি রাখে। লাল ইটের তৈরি বেদীর উপর নির্মিত মধ্যখানে কালো দেয়াল এবং এর দুই পাশে স্টিল এর বার। কালো দেয়ালের ভেতরে বা মধ্য বরাবর সুরঙ্গ বা প্রকোষ্ঠ। অর্থাৎ “আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে যতই অন্ধকার দিয়ে ঘিরে ফেলা হোক না কেন, আমরা ঠিকই সেটা ভেদ করে আলো নিয়ে আসবোই।”
শিল্পী অয়ন কালো দেয়ালটিকে অন্ধকারের প্রতীক ও দুই পার্শ্বের স্টিলের বারকে ঐক্যবদ্ধ জনতাকে বুঝিয়েছেন এবং কালো দেয়ালের মধ্যবর্তী প্রকোষ্ঠ পথে যে আলো প্রবেশ করছে তাকে ‘বিজয়ের আলো’ প্রবেশের পথ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
স্বাধীনতা দিবসে ‘বীরত্ব অবিনশ্বর’ এর উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সময় এলাকাবাসী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আনন্দ ও ব্যথা দুটোই লক্ষ্যণীয় ছিল। ছিল অনেকের চোখে আনন্দাশ্রু। স্মারকটি নির্মাাণে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন পাবনা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম স্বপন চৌধুরী।
পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির পিপিএম পাবনায় যোগদান করেই পাবনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্বেষণ শুরু করেন। ৪৬ বছর পর তিনি পুলিশ লাইন লেনটির নামকরণ করেন একজন শহিদ পুলিশ সদস্যের নামে। সংবর্ধনা দেন শহিদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে এবং সম্মানিত করেন জীবিত পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের।
পাবনায় সর্বপ্রথম সকল পাক হানাদার সৈন্যদের পরাজিত করে পাবনার মুক্তিকামী জনতা। ২৬ মার্চ পাক হানাদার সৈন্যরা পাবনার নিরস্ত্র জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। জনতা দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুলিশ লাইনে হানাদার পাক সৈন্যরা আক্রমণ করলে পুলিশ বাহিনী প্রতিরোধ করে। শুরু হয় দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ। হানাদার সৈন্যরা পিছু হটে। পুলিশ-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ করে ২৮ মার্চ পর্যন্ত। হানাদার সৈন্যরা অবস্থান নেয় বিসিক শিল্প নগরীতে এবং টেলিফোন এক্সচেঞ্জে।
সাহসী যুবকদের হাতে পাবনা পুলিশ লাইনের ম্যাগজিন খুলে দিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দেন দেশ-প্রেমিক পুলিশ বাহিনী। অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ যুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে যোগ দেন মুক্তিযোদ্ধারা। ত্রিশ জন পাক হানাদারকে হত্যা করে পাবনা শহর প্রায় শত্রু মুক্ত করা হয়। পরাজিত পাক সেনারা বিসিক ক্যাম্পে আটকে পড়ে। পাক  সৈন্যরা শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মুক্তকামী জনতার প্রতিরোধের কারণে তারা অগ্রসর হতে ব্যর্থ হয়। কয়েকজন পাক সেনা ডাকবাংলো ক্যাম্প থেকে লস্করপুর বিসিক শিল্প নগরীর দিকে অগ্রসর হতে থাকলে জনতার প্রতিরোধের মুখে বালিয়াহালটে আটকে যায়। দেশীয় অস্ত্র হাতে জনতা ঘিরে ফেলে পাক সৈন্যদের। পাক হানাদার সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষ শহিদ হন। জনতার প্রতিরোধ আরও তীব্র হয়। চতুর্দিক থেকে হাজার হাজার জনতা ঘিরে ফেলে হানাদার সৈন্যদের।
উপায়ান্তর না দেখে পাক সেনারা বালিয়াহালট সড়কের পার্শ¦বর্তী খালে এবং বালিয়াহালট কবরস্থানে অবস্থান নেয়। নর্দমার মধ্যে এবং কবরস্থানের পাকা কবরের আড়ালে অবস্থান নিয়ে তারা গুলি চালায়। কয়েকজন পুলিশ থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। তাদের সঙ্গে দোনালা বন্দুক এবং টু টু বোর রাইফেল নিয়ে কয়েকজন যুবক মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেন। সারারাত থেমে থেমে চলে যুদ্ধ। ২৯ মার্চ সকালে পরাজিত হয় হানাদার সৈন্যরা। এই যুদ্ধে শহিদ হন চারজন পুলিশ জোয়ান : রুহুল আমীন, আব্বাস আলী, ঈমান আলী ও আবুল খায়ের।
এই ‘বীরত্ব অবিনশ্বর’ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে একটি যুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগকে স্বীকৃতি দেয়া হলো বলে মন্তব্য করেন, পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল। এর জন্য তিনি পুলিশ সুপারকে ধন্যবাদ জানান।
জেনারেল (অব.) শফিউল্লাহ বীর উত্তমের নেতৃত্বে সেক্টর কমান্ডার’স ফোরামের নেতৃবৃন্দ ২৮ মার্চ ‘বীরত্ব অবিনশ্বর’ এর বেদীতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ