পুঁজিবাজার নিয়ে সংসদীয় কমিটিকে বিএসইসি ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তিই মহৌষধ

আপডেট: মার্চ ৫, ২০১৮, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


২০১০ সালের ধস-পরবর্তী কার্যকর পুঁজিবাজার গড়তে প্রায় দুই ডজন আইনি ও বিধি-বিধানগত সংস্কার এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তারপরও কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা আসেনি পুঁজিবাজারে। মাঝে মধ্যে কিছু আশা জাগালেও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। মূলত ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের স্বল্পতার কারণেই সমস্যার বৃত্ত থেকে দেশের পুঁজিবাজার বেরোতে পারছে না বলে মনে করছে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
কার্যকর ও সুষ্ঠু পুঁজিবাজার গড়ে তোলার অগ্রগতি, বিদ্যমান সমস্যা এবং তা থেকে উত্তরণের কৌশল-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠায় বিএসইসি। ওই প্রতিবেদনেই এ অভিমত তুলে ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। গত ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে বিএসইসির প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনাও হয়।
পুঁজিবাজারের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর মধ্যে ভালো মৌলভিত্তির সিকিউরিটিজের অপ্রতুলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর স্বল্পতার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিএসইসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জনবল স্বল্পতা ও ডিজিটালাইজেশনের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবকেও সমস্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে তারা।
বিদ্যমান সমস্যা থেকে উত্তরণের কৌশলও অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপন করেছে বিএসইসি। পুঁজিবাজারে ভালো মৌলভিত্তির সিকিউরিটিজের সরবরাহ বাড়াতে উচ্চ মূলধনসম্পন্ন কোম্পানির সিকিউরিটিজ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ওপর জোর দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বিএসইসি বলেছে, লাভজনক সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির শেয়ার অফলোড করা হলে পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়বে। এতে পুঁজিবাজারের গতিশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাপ্তিও বাড়বে।
যদিও বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বড় মৌলভিত্তি ও বিদেশী কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছিল। ২০১৫ সালের ৩০ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানি ও তাদের জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ও তালিকাভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অব্যাহতি দেয়া হয়। আর পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপকে (পিপিপি) মূলধন উত্তোলনের ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন গ্রহণ ও তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় ২০১৬ সালের ২০ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপনে। তবে বাজারে গতিশীলতা আনতে এখন বৃহৎ আকারের কোম্পানিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ফান্ডের চাহিদা পূরণে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে বাধ্যবাধকতা আরোপের কথা বলছে বিএসইসি।
জানা গেছে, ২০০৮ সালে সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়। পরবর্তীতে সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে শেয়ার অফলোডের নির্দেশ দেয়া হয়। এর মধ্যে সরকারি কয়েকটি কোম্পানি শেয়ার অফলোড করলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে তালিকাভুক্তির বাইরে থেকে গেছে অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানি।
২০০৯ সালে গ্রামীণফোনের পর আর কোনো বহুজাতিক কোম্পানি দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। ইউনিলিভার, নেসলে বাংলাদেশ, এশিয়ান কনজিউমার, কোকা-কোলাসহ বড় বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্তিতে বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে চেষ্টা থাকলেও আইনি ছাড়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। ইউনিলিভারের সরকারি অংশের মালিকানা হাতছাড়া করায় অনীহা রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়েরও। ২০১০ সালপরবর্তী সময়ে ৩৭টি সরকারি কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির চেষ্টা থাকলেও এসেছে শুধু বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড।
পুঁজিবাজারের গতিশীলতায় ভালো মৌলভিত্তির সিকিউরিটিজের তালিকাভুক্তি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে যখনই বহুজাতিকসহ ভালো কোম্পানি এসেছে, তখনই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্যম ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে অল্প কয়েকটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেও তারাই শীর্ষে অবস্থান করছে। বিশ্বের অনেক দেশে বহুজাতিক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির নির্দেশনা রয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে শর্ত আরোপ করা না হলেও তাদেরকে আলোচনার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি ডেরিভেটিভস, অলটারনেটিভস ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডসহ নতুন নতুন প্রডাক্ট নিয়ে আসতে হবে।
দেশের পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর যে সংখ্যা, তাকে অপ্রতুল বলে মনে করছে বিএসইসি। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে পেনশন ফান্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির সঞ্চিত ফান্ডের একটি অংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুপারিশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তারা বলছে, এর ফলে পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করে বিএসইসি বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারের উল্লেখযোগ্য প্রসার ঘটছে। এর ফলে বিএসইসির কর্মপরিধিও বেড়েছে। সে তুলনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বিদ্যমান জনবল খুবই অপ্রতুল। ক্রমবর্ধমান কর্মপরিধির কারণে বিএসইসিতে নতুন জনবল সৃষ্টির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও অদ্যাবধি তা প্রক্রিয়াধীন। বিএসইসির কর্মপরিধি সুচারুরূপে সম্পাদনে নতুন জনবল নিয়োগ আবশ্যক।
বিএসইসিতে ডিজিটালাইজেশনের জন্য পর্যাপ্ত কম্পিউটারের অভাবের কথা বলেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বিএসইসি উল্লেখ করেছে, কম্পিউটার একটি টিওঅ্যান্ডই (টেবিল অব অর্গাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট) সামগ্রী। নতুন কম্পিউটার ক্রয়ের ক্ষেত্রে আগের সরকারের টিওঅ্যান্ডইতে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়, যা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। টিওঅ্যান্ডই থেকে কম্পিউটারকে অব্যাহতি দিলে বিএসইসির ডিজিটালাইজেশন বাস্তবায়ন সহজ হবে।

যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের জন্য কমিশন গত কয়েক বছরে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। চলমান উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে কমিশনের জনবল বৃদ্ধিসহ কিছু অবকাঠামোগত সহযোগিতা প্রয়োজন। পাশাপাশি গতিশীল বাজারের জন্য বহুজাতিকসহ ও স্থানীয় ভালো মৌলভিত্তির এবং সরকারি কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির সুপারিশ রয়েছে। সরকারের চলমান উন্নয়নমূলক কাজে পুঁজিবাজার থেকে অর্থসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগানোর কথাও বলেছে কমিশন। বিএসইসি নিজেও ভালো মৌলভিত্তির প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তিতে কাজ করছে। গত কয়েক বছরে শেয়ারবাজারের সংস্কার ও কমিশনের আইনি সংস্কারের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে বিএসইসি। এতে বলা হয়েছে, ২০১০ সাল-পরবর্তী সময়ে বিএসইসির সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর ডিমিউচুয়ালাইজেশন, পুঁজিবাজারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম) প্রতিষ্ঠা, ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা তহবিল গঠন, বাজার উন্নয়নের লক্ষ্যে ১০ বছর মেয়াদি (২০১২-২০২২) মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। বিএসইসিতে আন্তর্জাতিক মানের সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার স্থাপন, মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডে রূপান্তর পদ্ধতি প্রবর্তন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য উপযুক্ত নিরীক্ষকদের প্যানেল গঠন, বিএসইসির নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, নারী বিনিয়োগকারীদের জন্য পৃথকভাবে ইনভেস্টরস এডুকেশন প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। সংশোধন করা হয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩। এর বাইরে আলাদা একটি ক্লিয়ারিং ও সেটলমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা, স্টক এক্সচেঞ্জে স্মল ক্যাপ প্লাটফর্ম গঠন, অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড গঠন, সেকেন্ডারি বাজারে পুঁজি সরবরাহ ও তারল্য সরবরাহে মার্কেট মেকারদের সক্রিয় করার পাশাপাশি দেশব্যাপী ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তথ্যসূত্র; বণিক বার্তা