বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

পুলিশের সেবাতে আদিবাসীর হয়রানি

আপডেট: January 19, 2020, 12:27 am

মিথুশিলাক মুরমু


এবারের পুলিশ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিলোÑ ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলমান পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রশংসাসমেত বলেছেন, ‘…যার ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি পুলিশের মাঝেও গুণগত বিরাট পরিবর্তন এসেছে, মানুষের আস্থা ও বিশ^াস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা চাই, আমাদের পুলিশ বাহিনী জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী হবে।…পুলিশ বাহিনীকে জনগণের পুলিশ হিসেবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণের আস্থা ও বিশ^াস অর্জনের মধ্য দিয়ে যেকোনো ধরনের অপরাধ দমন করা সহজ এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আপনারা কাজ করবেন, সেটাই আমি আশা করি।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশার সাথে আমাদের আশা-আকাক্সক্ষারও প্রতিফলন ঘটেছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় বাহিনী কি সত্যিই জনতার বন্ধুতে পরিণত হতে পেরেছে! জনতার সংজ্ঞাতে কীÑ আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা কিংবা কোল, ভীলদের সম্পৃক্ততা রয়েছে! বাংলার ভূখণ্ডে ঐতিহাসিক এবং জন্মসূত্রেই এদের অবস্থান রয়েছে, সেক্ষেত্রে নিঃসন্দেহের জনতার কাতারে অর্ন্তভূক্তিতা রয়েছে।
বেশ কয়েকদিন পূর্বে রাজশাহীর স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় (রাজশাহী সময় ডট কম, জানুয়ারি ২, ২০২০) দেখলাম, তানোর থানার কর্তব্যরত পুলিশ পাঁচন্দর ইউনিয়ন পরিষদের বনকেশর ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের আদিবাসী বিশ^নাথ মুন্সির বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। এসআই আনোয়ারসহ দু’জন পুলিশ কন্সটেবল সন্দেহ করেছিলেন বিশ^নাথের বাড়িতে অবৈধ মাদক রয়েছে। ব্যাপক তল্লাশির পরও কোনো মাদকদ্রব্যের হদিস মেলেনি; মেলেছে শূকর বিক্রয়ের নগদ ৩০ হাজার টাকা। অর্থ লোভী, দাম্ভিক এবং চরম সাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার কর্মকর্তা আনোয়ার নিরীহ আদিবাসীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পকেটে পুরেছিলো; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বিশ^নাথ ঊর্ধ্বতন কমকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে এবং এসআই আনোয়ার কৃতকর্মের ফল ভোগ করছেন; বর্তমানে ক্লোজ করা হয়েছে। অপর দুইজনকে অবশ্য ছোঁয়া যায়নি। সত্যিকার নিরীহ মানুষের কাছেই পুলিশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
আমার বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ (সংশোধিত ২০০৪)- এর ১০. অ্যালকোহল উৎপাদন ইত্যাদি সম্পর্কে বিধান ২.ক-তে বলা হয়েছে, ‘মুচি, মেথর, ডোম, চা বাগানের কুলি ও উপজাতীয়গণ কর্তৃক তাড়ি ও পচুঁই পান করার ক্ষেত্রে এবং খ. রাংগামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাসমূহের উপজাতীয়গণ কর্তৃক ঐতিহ্যগতভাবে প্রস্তুতকৃত মদ উক্ত জেলাসমূহের উপজাতীয়গণ কর্তৃক পান করার ক্ষেত্রে, এই উপ-ধারা কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না।’ আমাদের দায়িত্ববান পুলিশ বাহিনী কোন জাতীয় মাদক তল্লাশির জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন! সন্দিহান হয়ে পড়ি, যখন জেনেছি যে, এই এসআইসহ কনস্টেবলরা মাদকদ্রব্য খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছেন, পেয়েছেন সযত্নে গোপনে রাখা শূকর বিক্রয়ের ‘অর্থ মাদক’। বোধকরি, এসআই আনোয়ারসহ সঙ্গী দু’জন পূর্বাহ্নেই জেনেছিলেন, আদিবাসী বিশ^নাথের কাছে রয়েছে নগদ অর্থ; আর এই অর্থ তাদের চাই চা-ই। আর তাইতো ছলে বলে কৌশলে বিশ^নাথকে ফাঁদে ফেলে ছিনিয়ে নিয়েছেন শূকর বিক্রয়ের ৩০ হাজার টাকা। অভিযুক্ত হবার পর এসআই আনোয়ার আট হাজার টাকা ফেরত দিলেও ২২ হাজার টাকা ফেরত দিতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় পোশাক পরিহিত হয়েই এসআই আনোয়ার এলাকার জনসাধারণের আতঙ্কের নামে পরিণত হয়েছে। ইতিপূর্বে এলাকার রিয়াজ আলী (৩০)কে মাদক খাওয়ার অপবাদে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জয়নাল।
আদিবাসীদের জন্য মাদক যদি বৈধ হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে আদিবাসী বিশ^নাথের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার, তল্লাশি করার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উত্থিত হতে পারে। একজন আদিবাসীর অধিকারকে ক্ষুণ্ন করাও আইনের দৃষ্টিতে অবশ্যই গর্হিত অপরাধ হিসেবে গণ্য। এক্ষেত্রে এসআই আনোয়ারসহ দু’জন পুলিশ কনস্টেবলকে দৃষ্টান্তমূলক শান্তির আওতায় এনে পুলিশের প্রতি আদিবাসীসহ জনসাধারণের আস্থা ও বিশ^াস ফিরিয়ে আনতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুলিশের প্রতি আস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন, আমরাও দেশের বৃহত্তম নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এক্ষেত্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার প্রতি যদি নিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেবা ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন, তাহলেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নটি এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
লেখক: সংবাদকর্মি