পেন্সিলপুরাণ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

নওশিন ইয়াসমিন


কার্বন প্রকৃতিতে দুই অবস্থায় পাওয়া যায়। গ্রাফাইট আর ডায়মন্ড । ডায়মন্ডের অনেক দাম তাই ছোট মানুষ গ্রাফাইটের সুন্দর একটি ব্যবহার নিয়েই বলি। গ্রাফাইট ধূসর, পিচ্ছিল এবং একমাত্র অধাতু যা বিদ্যুৎ পরিবহনে সক্ষম। আর এর মুক্ত ইলেকট্রন দুই জোড়া।
গ্রাফাইটের সাথে খানিক কাদামাটি মিশিয়ে কাঠের আবরণ দিয়ে দিলেই একটা সুন্দর পেন্সিল। ‘চবহপরষ’ শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন ‘চবহরপরষষঁং’ শব্দ থেকে। মজার ব্যাপার হলো এর অর্থ ‘ছোট্ট লেজ’। একটা কাঠখোট্টা জিনিসের অর্থ কি না ছোট্ট ল্যাঞ্জা! অদ্ভুত না? কিন্তু প্রাচীনকালে পেন্সিল হিসেবে বা লেখার কাজে ব্যবহার করা হতো উটের লেজ। তাই এই নামকরণ। তবে বর্তমানে কাঠের ভেতর গ্রাফাইট দেয়ার বুদ্ধি কিন্তু প্রথম কাদের তা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা যায়। প্যাপিরাসে লেখার জন্য লেডের পেন্সিল ব্যাবহার করতো রোমানরা। নাম দিয়েছিলো ‘স্টাইলাস’। পরে ইংল্যান্ডে গ্রাফাইট খনি আবিষ্কারের পরে লেডের তুুুলনায় ঔজ্জ্বল্য, গাঢ়ত্ব,স্থায়িত্বগুণ বেশি দেখে লেডের পরিবর্তে এর ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে বিভিন্ন গ্রেডের পেন্সিল পাওয়া যায়।

বিখ্যাত আঁকিয়ে ভিনসেন্ট ভ্যানগগ ‘ফেবার’ ব্র্যান্ডের পেনসিল ব্যবহার করতেন। টমাস আলভা এডিসন ‘ঈগল’ আর আমাদের প্রিয় ‘মাতিলদা’ লেখক জড়ধষফ উধযষ তো আরও এক কাঠি সরেস! হলদে কেসের পেন্সিল ছাড়া অন্যটা ব্যবহারই করতেন না। প্রতি সকালে ৬টা শার্পড পেন্সিল দিয়ে তার নতুন দিন শুরু হতো – ঘসঘসিয়ে লিখে যেতেন নতুন গপ্প।

ছোটবেলায় চকে এলার্জি ছিলো বলে শ্লেটে লেখার জন্য একটা লম্বা কাঠির মতো পেন্সিল ব্যবহার করতাম তার অবশ্য কোনো কাঠের আবরণ ছিলো না। কিন্তু শ্লেটে সেই পেন্সিলের নতুন অবস্থায় কিচকিচ শব্দ আরও বিরক্তকর। তাই পাওয়া মাত্রই কয়েক টুকরো করে ফেলতাম। এরপরে অন্যকিছু। তাই শেষমেশ বাবা বেগুনিরঙা ম্যাজিক শ্লেট কিনে দিলো। যার সাথে ছিলো হলুদ দড়ি বাঁধা হলুদ পেন্সিল। কিন্তু আমার ততদিনে মনে ধরেছে বুবুর টেবিলের কলমদানিতে রাখা মস্ত লম্বা পেন্সিল যার মাথায় একটা পাপেটের মাথা লাগানো। বুবু যখন স্কুলে, মা রান্নায় ব্যস্ত সেই পেন্সিলের একমাত্র উত্তরসূরী এই আমি পেন্সিল নিয়ে ফেলে দেয়া কাগজে আঁকাআঁকিতে মশগুল। লেখার খাতা তখনও আমার ছিলোনা। বর্ণমালা যখন দিব্যি ভুল ছাড়াই লিখে ফেলতে শিখলাম এইবার ত্যাড়াব্যাড়া আকৃতি থেকে লাইনে আনার জন্য কিনে দেয়া হলো রুলটানা খাতা আর ডজনখানেক পেন্সিল। কিন্তু পৃথিবীতে তখন আমার একটাই দুঃখ আমাকে ডজন থেকে পেন্সিল দেয়া হতো মাত্র দুটো! এরপরে একটা ছোট হয়ে এলে অন্যটা। আমিও নতুন পেন্সিলের লোভে সারা বাড়ির সাদা দেয়াল, মেঝে, কাঠের চৌকি আঁক এঁকে, লিখে ভরিয়ে দিতাম। শেষ করতে হবে তো! (আম্মার পিটুনিও একটা মাটিতে পড়তোনা) তারপরে স্কুলে ভর্তি হবার পরে একদিন স্টেশনারি দোকানে গিয়ে দেখি শাকালাকা বুম বুম!! ভাবা যায়! আম্মাকে পটিয়ে কিনে আনলাম। আমাকে আর পায় কে? পেন্সিল দিয়ে দুনিয়া আঁকিয়ে ফেলবো! সব আমার! রাত্তিরে একটা সুন্দর ফুটবল এঁকে পেন্সিল সুন্দর করে শার্প করে বালিশের নিচে লুকিয়ে খোসা পানিতে চুবিয়ে দিলাম। আলো জ্বলবে সকালে উঠে দেখি কিসের কি! সব ভুয়া! জালিম দুনিয়া।
কিন্তু সে যাই হোক। পেন্সিলপ্রীতি আমার এখনো বিদ্যমান। হবে নাই বা কেনো? কী সুন্দর রঙিন রঙিন কাঠের মাঝে গ্রাফাইট আর আঁকার সময় দলছুট মন কাগজে টেনে আনা খসখস শব্দ!
পেন্সিলের আরেকখানা এবং মস্ত সুবিধে হলো, ভুল হলো? অপ্রয়োজনীয় আঁক? তো হয়েছেটা কি? ইরেজার নাও। টুপ করে মুছে ফেলা যায়। কী সুন্দর দুনিয়া উল্টায়ে ফেলাটাইপ শান্তি!

আর রঙগুলোই বা বাদ যায় কেনো? সুন্দর বাহারি রঙ,নকশা,পেছনের ইরেজার। হাতে নিলেই আঁকতে ইচ্ছে হয় মন যা চায়। প্রিয় মানুষের মুখ আঁকা তো যাইই বোনাস হিসেবে খসখস শব্দ তুলে পাড়ি দেয়া যায় তেপান্তরের মাঠ, ধূসর নদী, সাত সমুদ্দুর, আকাশ ছোঁয়া বিন্ধ্যাচল, মেঘেদের রাজ্য সমস্তকিছু।
ক্লাসে,কিংবা পড়ার টেবিলে চুল এলোমেলো হয়ে আছে তো একটা এলোখোঁপা বানিয়ে পেনসিল গুজে দিলেই বাউ-ুলে চুলের কারবারি শেষ। চাইনিজ কাঁটা সবসময় ব্যাগে রাখতে,সাথে নিয়ে ঘুরতে থোড়াই মনে থাকে।

আবার কারো সাথে কথা কাটাকাটি হলো, এক্কেবারে ফাটাফাটি অবস্থা। তার একটা গোল্লা,ভ্যাবলামার্কা চেহারা এঁকে বিশাল এক ঢ্যারা দিয়ে ইরেজার নিয়ে ঘসঘস করে মুছে ফেলো। দ্যাট পার্সন ইজ গন। খাতায় আঁকের চাপ দাগ হয়তো থাকবে কিন্তু সেই দুষ্ট রাক্ষসগুলো তো আর নেই! শত্রুমুক্ত স্বপ্নরাজ্যে এইবার রাজপুত্র/রাজকন্যে নতুন স্বপ্ন বুনো।