প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘন করেছে বিকাশ

আপডেট: অক্টোবর ২৯, ২০১৮, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


দেশে মোবাইল ব্যাংকিং বাজারের ৮০ শতাংশের বেশি এ খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠান বিকাশ লিমিটেডের দখলে। প্রায় ২০টি মোবাইল ব্যাংকিং সেবার উপস্থিতি থাকলেও বিকাশ রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে। বিকাশের বাজার অংশ দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটির তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ। বাজারে এমন কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানের সুযোগে বিকাশ পরিবেশকদের (ডিস্ট্রিবিউটর) সঙ্গে চুক্তি করেছে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না রাখার শর্তে। এতে সেবা পরিবেশনে বিকাশের একচেটিয়াত্ব বহাল থাকছে, যা বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর লঙ্ঘন।
অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না রাখার চুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করে সম্প্রতি পরিবেশকদের চিঠিও দিয়েছে বিকাশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চিফ কমার্শিয়াল অফিসার মিজানুর রশিদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে দায়িত্বরত অবস্থায় অন্য যেকোনো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যেকোনো প্রকার (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ) ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা বিকাশের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আপনার সঙ্গে সম্পাদিত ডিস্ট্রিবিউটরশিপ চুক্তির দফা ১৪-এর পরিপন্থী। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আপনাকে বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটর থাকা অবস্থায় অন্য কোনো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ) সম্পৃক্ত না হওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বিকাশের ব্যবসায়িক স্বার্থের পরিপন্থী যেকোনো কর্মকা-ে জড়িত (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে) থাকার কারণে বিকাশ তার যেকোনো ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করার অধিকার সংরক্ষণ করে।’
বিকাশের এ কার্যক্রমকে প্রতিযোগিতা আইনের লঙ্ঘন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। কারণ বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর ধারা ১৫ (১) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য বা সেবার উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ, গুদামজাত বা অধিগ্রহণসংক্রান্ত এমন কোনো চুক্তি কিংবা ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আবদ্ধ হতে পারবে না, যা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে অথবা বিস্তারের কারণ ঘটায় কিংবা বাজারে মনোপলি বা অলিগোপলি অবস্থা সৃষ্টি করে।
একই ধারার ৩ উপধারায় বলা হয়েছে, একচ্ছত্র পরিবেশন চুক্তি অর্থাৎ কোনো পণ্য সরবরাহ বা উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণকে সীমিত, সীমাবদ্ধ কিংবা স্থগিত করে বা কোনো এলাকা অথবা বাজারকে কোনো পণ্য বিক্রয় বা হস্তান্তরের জন্য নির্দিষ্ট করে এমন চুক্তি প্রতিযোগিতাবিরোধী চুক্তি হিসেবে গণ্য হবে, যদি তা প্রতিযোগিতায় বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে।
আইনে সুস্পষ্ট বিধান থাকার পরও কোনো যদি পরিবেশকদের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করে তাহলে তা প্রতিযোগিতা আইনের লঙ্ঘন বলে জানান বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন ইকবাল খান চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও সক্ষমতায় কোনো খাতের বাজার দখলে নেয়া যেতে পারে। প্রতিযোগিতা আইনেও বাজার দখলের সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। তবে বাজারে কর্তৃত্বময় অবস্থানের সুযোগ নিয়ে অন্যদের জন্য প্রতিযোগিতাবিরোধী পরিবেশ সৃষ্টি প্রতিযোগিতা আইনের লঙ্ঘন। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে কমিশন।
যদিও বাজারে আধিপত্যের সুযোগ নিয়ে বিকাশ প্রতিযোগিতাবিরোধী কোনো পরিবেশ সৃষ্টি করছে না বলে দাবি মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটির। অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডিস্ট্রিবিউটরদের সম্পর্ক না রাখতে বলার কথাও অস্বীকার করেন বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন্স শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমাদের এজেন্টরা বিকাশ ছাড়াও অন্যান্য প্রতিযোগী কোম্পানির হয়েও কাজ করছে। সেখানে কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেয়া হয়নি। আর ডিস্ট্রিবিউটরদেরও এমন কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের জুলাইয়ে কার্যক্রম শুরু করা বিকাশের গ্রাহক রয়েছে প্রায় তিন কোটি। আর লেনদেন সম্পন্ন হয় প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ। এর মাধ্যমে লেনদেনকৃত অর্থের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৮টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালালেও বাজারের ৮১ দশমিক ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। বাকি ১ দশমিক ৮০ শতাংশ বাজার অন্য ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে।